- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- ডিসেম্বর ২৪, ২০২৩
ধারাবাহিক: পাহাড়িয়া পথে পথে।পর্ব ৩
নানান জীবনমুখী শিক্ষা একজন শখের পথিককে কিভাবে পাহাড়িয়া করে তোলে তা অন্তত হাত বা কপালের রেখায় লেখা থাকে না। মেঘের আড়াল থেকে কেউ তাকে নিশির মতো 'because it is there' বলে ডেকে নিয়ে যায়
অলঙ্করণ: দেব সরকার
ভুবন পাহাড় আর গিরিশৃঙ্গের প্রতি তাঁর দুর্ভেদ্য আকর্ষণ উৎসবমুখর করে তোলে ভূগোলের বিদ্যাযাপন । পেশা আর নেশা যখন একাকার হয়ে ওঠে, তখনই তাঁর অনুভূতিকে অন্যভাবে জাগিয়ে তোলে— ‘শেষের কবিতার’ শোভনলালের পাহাড়ের পথে পথে ঘুরে বেড়ানোর বেহিসেবিয়ানা । গন্তব্য জগতের এক শৃঙ্গ থেকে আরেক শৃঙ্গ
পর্ব ৩
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার সুদূর মফঃস্বল শহর আমতলার কে ঈ কারমেল স্কুলে চাকরি নিয়ে আমার শিক্ষকতা জীবন শুরু। এই প্রতিষ্ঠান আমার জীবনে একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। বালিগঞ্জ থেকে তখন আমি সকাল সন্ধ্যের নিত্য অফিস যাত্রী। অর্ধেক জীবন পথেই কেটে যায়। আর ফেরার রাস্তা নেই কারণ ওদিকে বাড়িতে বাবার কাছে হাত পাতার দিন শেষ হয়েছে। তাই ভালো ইংরেজি বলতে না জেনেও শুধুমাত্র মনের জোরে এই চাকরি ছিল আমার জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। মিশনারি স্কুলের আদব কায়দা চাল চলন নিয়মানুবর্তিতা সব আমাকে নতুন করে শিখতে হয়েছে। যেতে হয়েছে নানান সাহেবি অনুষ্ঠানে। ক্লাসে যেমন ছেলেমেয়েদের তৈরি করেছি তেমনি নিজেও সবার অলক্ষ্যে প্রস্তুতি নিয়েছি আরও বৃহত্তর মঞ্চের লক্ষ্যে। নেশা আর পেশাকে টেনে নিয়ে গেছি সমান্তরাল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে আমাকে যেতে হবে বহুদূর। বুঝেছি নিজে ছাত্র অবস্থায় যতটা শিখেছি শিক্ষক হিসাবে পড়াতে এসে শিখেছি ঢের বেশি। আজও আমি একবাক্যে স্বীকার করি, ছাত্রছাত্রীদের এমন অকাতর ভালোবাসা আজ পর্যন্ত আমি অন্য কোথাও পাইনি। এ আমার আজন্মের সঞ্চয়। যাইহোক, আমাদের স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি সারা বছর নানান কর্মকাণ্ড লেগেই থাকতো। আমাদের প্রিন্সিপ্যাল ফাদার পল ছিলেন এইসব বিষয়ে ভীষণ সচেষ্ট এবং উদ্যমী।
সেবছর হাওড়ার সাঁতরাগাছি থেকে শৈলসাথী নামের একটি পর্বতারোহণের ক্লাব থেকে আমাদের স্কুলে এসে ফাদারের কাছে দরবার করল। এই অঞ্চলে তাদের অনেক সদস্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এঁরা পুরুলিয়া বাঁকুড়ার বিভিন্ন পাহাড়ে শীতকালীন শিবির আয়োজন করে। রক ক্লাইম্বিং, রিভার ক্রসিং, ওয়াইল্ড ক্যাম্পিং, জঙ্গল ট্রেক, বার্ড ওয়াচিং ইত্যাদি নানান রোমহর্ষক কাণ্ড কারখানা। গল্পকথা ছবি ভিডিও ইত্যাদি দেখে ভীষণ সন্তুষ্ট হয়ে ছাত্রছাত্রীদের পাঠাতে ফাদার এক পায়ে রাজি। কিন্তু সঙ্গে যাবে কে ? মূলত খ্রিস্টান এবং বিবাহিত সহকর্মীরা বড়দিনের ছুটিতে এসব অকাজের অপব্যয়ে সময় নষ্ট করতে নারাজ। অব্যর্থভাবে সব দায়িত্ব এসে পড়ল পরিবারিক দায়মুক্ত নব্য নিযুক্ত গোবেচারা ভূগোল শিক্ষকটির উপরে। অবশেষে হৈ হৈ করে ট্রেনে চড়ে সদলবলে যখন পুরুলিয়ার জয়চন্ডী পাহাড়ের শিবিরে এসে পৌঁছালাম কে ছাত্র আর কে শিক্ষক বোঝা দায় ! ব্যাপার স্যাপার দেখে শিং ভেঙ্গে বাছুরের দলে ঢুকে আমিও শুরু করে দিলাম আমার হাতে কলমে শেখা পাহাড়ের প্রথম সহজপাঠ।
১৯৬০ সালে প্রথম কলকাতার ‘পর্বত অভিযাত্রী সংঘ’ কর্তৃক আয়োজিত নন্দাঘুন্টি (৬৩০৯ মিটার) অভিযানের মধ্য দিয়ে বাঙালি পর্বতারোহণের যে পরম্পরা শুরু হয়েছিল সেই ধারা অক্ষুন্ন রেখে ২০১০ সালে অর্ধ শতাব্দির মধ্যেই প্রথম অসামরিক বাঙালি হিসেবে এভারেস্ট শৃঙ্গ (৮৮৪৮ মিটার) জয় করে বসন্ত এবং দেবাশীষ ছড়িয়ে পড়লেন বাংলার ঘরে ঘরে
শৃঙ্খলাই পাহাড়ের প্রথম ও একমাত্র শর্ত এবং পরিবেশের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা এই সময়ের অন্যতম বহুচর্চিত আচরণ। পাহাড় পথের যাবতীয় খুঁটিনাটি যেমন, দড়িতে গিঁট কেমন করে বাঁধতে হয়, কেমন করে বিলে দিতে হয়, কেমন করে হার্নেস পরতে হয়, কেমন করে রাফেল ডাউন করতে হয়, বিভিন্ন ঢালের পাহাড়ে কেমন করে হাঁটতে হয়, খাড়া ঢালে কেমন করে হোল ধরতে হয়, কেমন করে দড়ি থেকে বাদুড়ের মত ঝুলে নদী পেরোতে হয়, ট্রেক রুটে কেমন করে পথনির্দেশ ছেড়ে যেতে হয়, পাহাড় জঙ্গলে কিভাবে নীরবতা বজায় রাখতে হয়, দল বেঁধে বিশ্রাম নেবার উপযুক্ত জায়গা কোনটি, কেমন করে রুকস্যাক গোছাতে হয়, নূন্যতম প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে পাহাড়ে কিভাবে বেঁচে থাকতে হয়, বিপদের সময় সজাগ থেকে কিভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়, অজানা পথে রাত্রিবেলা কেমন করে হাঁটতে হয়, যাত্রাপথে পরস্পরকে কেমন করে মানসিক এবং শারীরিকভাবে চাঙ্গা রাখতে হয়, পাহাড় পথে খাবার পানীয় জল এবং অক্সিজেনের গুরুত্ব কতটা, কেমন করে টেন্ট পিচ করতে হয়, কেমন করে কৃচ্ছসাধন করতে হয়, পাহাড়ে কিভাবে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হয় ইত্যাদি নানান জীবনমুখী শিক্ষা একজন শখের পথিককে কিভাবে পাহাড়িয়া করে তোলে তা অন্তত হাত বা কপালের রেখায় লেখা থাকে না। মেঘের আড়াল থেকে কেউ তাকে নিশির মতো because it is there বলে ডেকে নিয়ে যায়। এই শিবিরে রাত জেগে আয়োজকদের দেখানো ‘ক্লিফ হ্যাঙ্গার’ এবং ‘ভার্টিক্যাল লিমিট’ নামক দুটি সিনেমা আমাকে বহু রাত ঘুমাতে দেয়নি।
ওই যে শুরু হলো আর কোনদিন থামলো না। প্রতিবছরের শেষ সপ্তাহটি পুরুলিয়া বাঁকুড়া এবং পঞ্চলিঙ্গেশ্বর-এর পাহাড়ে এক অন্য ‘আমি কে’ আবিষ্কারের নেশা আমাকে পেয়ে বসলো তীব্র আফিমের মতো। একে একে দক্ষিণবঙ্গের প্রায় সব পাহাড়ের চূড়ায় উঠবার ঘটনা আমার জীবনে ঘটে গেল। রাকেশ শর্মাকে ‘চাঁদ থেকে পৃথিবী কেমন দেখতে’ ইন্দিরা গান্ধীর সেই প্রশ্নের উত্তরের মতো আমিও উঁচু পাহাড় থেকে বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলাম কিভাবে ফিনিক্স পাখি উড়ে যায় আগুনের ডানা মেলে।
ভূগোল আমাকে ঘরে বাইরে সমাদর এনে দিল। স্কুলে স্টাফরুম থেকে ক্লাসরুম পর্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠলাম দ্রুত। অন্যদিকে শৈলসাথী ক্লাবে আমার ভৌগলিক পরিচিতি যেন সোনায় সোহাগা, কেকের উপর চেরি অথবা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি বয়ে আনলো। খুব দ্রুত ক্লাবের সদস্যপদ গ্রহণ করতে অনুরোধ জানালেন সম্পাদক সোমেশ লাহিড়ী এবং শিবিরে আমার একটি বিশেষ ভূগোলের ক্লাস নিয়মিত অধ্যায় হিসেবে জুড়ে দিলেন। অতিরিক্ত চাপিয়ে দিলেন পুরুলিয়া থেকে কলকাতা সর্বত্র ক্লাবের নানান সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার গুরু দায়িত্ব। মিটিং-এ নিয়মিত যাতায়াতের কারণে ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠলো। শিক্ষার্থীদের তাঁবু থেকে আমার প্রমোশন হলো অফিসিয়াল টেন্টে। শীতের রাতে কিচেন টেন্টে কাঠের আগুনে হাত পা সেঁকতে সেঁকতে হিমালয়ের অফুরন্ত গল্পকথা, পাহাড়ের লোকজ মিথ, শেরপাদের কঠোর পরিশ্রমের জীবন কাহিনী, পথের ভয়াবহতা, পর্বতারোহীদের অমর কীর্তি, পর্বতারোহণের রাজনীতি, ক্ষমাহীন মৃত্যুর অপারগতা, অ্যাডভেঞ্চার ক্লাবের খুঁটিনাটি, বাঙালির হিমালয় ইতিহাস, বিশ্ব রেকর্ডের তথ্য পরিসংখ্যান ইত্যাদি নানান অভিজ্ঞতার কাহিনি খরস্রোতা নদীর মতো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো স্রোতের উজানে।
শৈলসাথীর বার্ষিক অনুষ্ঠানে একে একে আলাপ হলো মহান বাঙালি পর্বতারোহী বসন্ত সিংহ রায়, দেবাশীষ বিশ্বাস, বনভূষণ নায়েক, অমূল্য সেন, গৌতম দত্ত, কঙ্কন কুমার রায়, ছন্দা গায়েন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, রতনলাল বিশ্বাস, তপন পণ্ডিত, ঊষা পণ্ডিত, উজ্জ্বল রায়, দীপঙ্কর ঘোষ, রাজীব ভট্টাচার্য, রুদ্রপ্রসাদ হালদার, মলয় মুখোপাধ্যায়, দেবদাস নন্দী, উজ্জ্বল পাল, অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, টুসি দাস, পিয়ালি বসাক, সত্যরূপ সিদ্ধান্ত প্রমূখ প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে। ১৯৬০ সালে প্রথম কলকাতার ‘পর্বত অভিযাত্রী সংঘ’ কর্তৃক আয়োজিত নন্দাঘুন্টি (৬৩০৯ মিটার) অভিযানের মধ্য দিয়ে বাঙালি পর্বতারোহণের যে পরম্পরা শুরু হয়েছিল সেই ধারা অক্ষুন্ন রেখে ২০১০ সালে অর্ধ শতাব্দির মধ্যেই প্রথম অসামরিক বাঙালি হিসেবে এভারেস্ট শৃঙ্গ (৮৮৪৮ মিটার) জয় করে বসন্ত এবং দেবাশীষ ছড়িয়ে পড়লেন বাংলার ঘরে ঘরে।
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন:
❤ Support Us









