- এই মুহূর্তে দে । শ
- এপ্রিল ৮, ২০২৬
১৩ বছরের কারাবাসের পর সব মামলায় জামিন। ভোটের মুখে মুক্তির পথে সারদাকর্তা
প্রায় ১৩ বছরের দীর্ঘ কারাবাসের পর, জেলমুক্তির দোরগোড়ায় সারদা কেলেঙ্কারির মূল অভিযুক্ত সুদীপ্ত সেন। বুধবার কলকাতা হাইকোর্ট-এর বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ-এর ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর বিরুদ্ধে থাকা শেষ ২ টি মামলাতেও জামিন মঞ্জুর করায় প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের গারদ ছাড়তে আর কোনো আইনি বাধা রইল না। আদালত সূত্রে ইঙ্গিত, সমস্ত শর্তপূরণ সাপেক্ষে বৃহস্পতিবারই মুক্তি পেতে পারেন তিনি। ঘটনাচক্রে, আর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্যে ভোট। ফলে বিতর্কিত চরিত্রের এই মুক্তি ঘিরে রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
এ দিন হাই কোর্ট জানিয়ে দেয়, রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা বারাসাত থানার ২ টি মামলায় জামিন দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আইনি জট সম্পূর্ণ কেটে গেল। এর আগে সিবিআই-এর তদন্তাধীন সমস্ত মামলাতেই জামিন পেয়েছিলেন সুদীপ্ত। ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থার মামলায় মুক্তির পথে আর কোনো বাধা ছিল না। কিন্তু রাজ্য পুলিশের হাতে থাকা বিপুল সংখ্যক মামলার মধ্যে শেষ পর্যন্ত ২টি মামলা তাঁর মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
আদালতে মামলাকারীর আইনজীবী জানান, সারদা কাণ্ডে মোট ৩৮৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল। তার মধ্যে ৭৬টি মামলা নেয় সিবিআই। তারা সব মিলিয়ে ৪ টি প্রধান মামলা দায়ের করে। বাকি মামলাগুলিতে চার্জশিট দেয় রাজ্য পুলিশ। সেই ৪টি সিবিআই মামলায় আগেই জামিন পেয়েছিলেন সুদীপ্ত, জামিন বন্ডও জমা দেন। কিন্তু রাজ্যের করা প্রায় ৩০৮টি মামলার মধ্যে অধিকাংশে জামিন মিললেও বারাসাত থানার মামলা দুটি এতদিন ঝুলে ছিল। বুধবার, হাইকোর্টে ওই দুই মামলাতেও জামিন মঞ্জুর হওয়ায় জামিন পাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হলো।
এদিন, মামলার শুনানিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ডিভিশন বেঞ্চ। রাজ্য পুলিশ এবং সিবিআই—উভয় পক্ষকেই কড়া ভাষায় ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি। বিরাচকের পর্যবেক্ষণ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ এবং প্রশ্নবিদ্ধও বটে। ২০১৪ সালে চার্জশিট জমা পড়ার পরও, কেন এক দশক পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়া শুরু বা সম্পন্ন করা গেল না, তা নিয়ে তীর্যক প্রশ্ন তোলেন তিনি। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিচার না করে অনির্দিষ্টকাল কোনো অভিযুক্তকে জেলবন্দি করে রাখা আইনের পরিপন্থী। বরং অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত থাকলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর প্রক্রিয়া এগোনো আরও সহজ হতে পারে বলেও মন্তব্য করে বেঞ্চ।
সিবিআইয়ের ভূমিকাতেও অসন্তোষ প্রকাশ করে আদালত। কেন্দ্রীয় সংস্থার আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, শুধুমাত্র জামিন পাওয়া বা না-পাওয়া নয়, ট্রায়াল শেষ করার দায়ও যে তদন্তকারী সংস্থার, তা কি তারা ভুলে যাচ্ছে? আদালতের এই কড়া অবস্থানের পরই কার্যত সুদীপ্ত সেনের জামিনের পথ প্রশস্ত হয়। যদিও জামিনের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত আরোপ করা হয়েছে বলেই আদালত সূত্রে জানা গিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৭ এপ্রিল, বিধাননগর থানার একটি মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই গারদের অন্তরালে দিন কাটছে সুদীপ্তর। তার আগে সারদা কাণ্ড প্রকাশ্যে আসতেই ঘনিষ্ঠ সহকর্মী দেবযানী মুখোপাধ্যায়-কে সঙ্গে নিয়ে কাশ্মীরের সোনমার্গে আত্মগোপন করেছিলেন তিনি। পরে সেখান থেকেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়। সেই থেকে টানা কারাবাস। মাঝে ২০২৩ সালে দেবযানী কয়েক ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেলেও সুদীপ্তর ক্ষেত্রে তেমন সুযোগ আসেনি। দীর্ঘ সময়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতারিত আমানতকারীরা সারদা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। পরে তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং সেবি-ও পৃথকভাবে মামলা রুজু করে। ফলে একের পর এক মামলার জালে জড়িয়ে পড়েন সুদীপ্ত।
সম্প্রতি সংশোধনাগার থেকেই ‘প্রিজনার্স পিটিশন’ দাখিল করে সুদীপ্ত অভিযোগ করেন, দেড় বছর ধরে তাঁর মামলাগুলির শুনানি হচ্ছে না। বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সব ক্ষেত্রে হাজির করানো হচ্ছে না— না ভার্চুয়ালি, না শারীরিকভাবে। একই সঙ্গে জামিনের আবেদনও জানান তিনি। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই আদালত সিবিআইয়ের কাছে রিপোর্ট তলব করে। রিপোর্টে জানানো হয়, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অধিকাংশ মামলাতেই ইতিমধ্যে জামিন মঞ্জুর হয়েছে, কেবল শুধুমাত্র ২ টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মঙ্গলবার দীর্ঘ শুনানির শেষে রায়দান স্থগিত রাখে আদালত। একই সঙ্গে সারদা ও তালুকদার কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয় বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির হিসাব, বাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের বিবরণ এবং আমানতকারীদের বকেয়ার পরিমাণ জমা দিতে। বুধবার চূড়ান্ত রায়ে সব মামলাতেই জামিন মঞ্জুর করে ডিভিশন বেঞ্চ। এ ঘটনায়, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে এসেছে। সারদা কেলেঙ্কারিতে নাম জড়ানো তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, ‘জামিন পাওয়া বা না-পাওয়া সম্পূর্ণ আইনি বিষয়। আদালত যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটাই মান্য। এর বাইরে আলাদা করে মন্তব্যের কিছু নেই।’
আইনি প্রক্রিয়ার মাঝে নাগরিক মহলে প্রশ্ন উঠছে সারদা কাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার আমানতকারীর টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া আদৌ গতি পাবে? না কি অন্যন্য কেলেঙ্কারির মতো এটিও ধামাচাপা পড়ে যাবে আইনি জটে। ফলে, দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে যে কেলেঙ্কারি রাজ্য রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে, তার আর্থ-সামাজিক অভিঘাত যে এখনো অম্লান, তা নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে উচ্চ আদালতের রায়।
❤ Support Us






