- মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- জুন ১৫, ২০২৬
ফুটবল বিশ্বকাপে ভারত, স্বপ্ন অধরাই
পাড়ায়-পাড়ায়, রাস্তার মোড়ে-মোড়ে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, জার্মানি, পর্তুগালের পতাকায় ঢেকে গিয়েছে দূরের সীমানা। হাজার হাজার কিমির ব্যবধান ঘুচে গিয়েছে মুহূর্তে, নিবিড় আত্মীয়তা আর উন্মাদনায় মিশে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠেছে ফুটবল প্রেমীরা। তর্ক-বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা, বাদ-বিবাদ ছুটে চলছে দুর্দাম গতিতে। প্রিয় দল জিতলে, প্রিয় খেলোয়ার গোল করলে হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ছে মহল্লার পর মহল্লা। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই একই প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসে। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ ভারত কেন এখনো ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে জায়গা করে নিতে পারল না ? কেন বিশ্বকাপের মূল পর্বে ভারতীয় দলের নামই থাকে না প্রতিযোগিতার তালিকায়? প্রশ্নটা নতুন নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের আসর যখন ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ দলে সম্প্রসারিত হয়েছে, স্বল্প জনসংখ্যা-অর্থনীতির বহু দেশ ফুটবলের বিশ্বমাঠে জায়গা করে নিয়েছে, তখন ভারতীয় ফুটবলকে ঘিরে আশা ও হতাশা; দুইই আরও জড়িয়ে ধরে বৈকি।
বাস্তবতা বলছে, খেলার সুযোগ বাড়লেও, দেশের প্রস্তুতি এখনো অনেক পিছিয়ে। ভারতীয় ফুটবল দলের বিশ্বকাপে খেলবার অধরা স্বপ্নের কারণ খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় ইতিহাসের দিকে। কারণ, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, ভারত বিশ্বকাপের দরজায় একবার পৌঁছে গিয়েও শেষ মুহূর্তে ফিরে এসেছিল। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আয়োজিত ফিফা বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পেয়েছিল ভারত। তবে সে সুযোগ এসেছিল এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে। এশীয় বাছাইপর্বে ভারতের সঙ্গে একই গ্রুপে থাকা বার্মা, বর্তমানে মায়ানমার, ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপিন্স একে একে প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে কোনো বাছাই ম্যাচ না খেলেই বিশ্বকাপের টিকিট পেয়ে যায় ভারত। ফাইনাল পর্বে ভারতের গ্রুপে ছিল সুইডেন, ইতালি এবং প্যারাগুয়ের মতো শক্তিশালী দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল সফরে যায়নি ভারতীয় দল। এ সিদ্ধান্ত আজও ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বড়ো ‘যদি’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘদিন ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা প্রচলিত ছিল যে, খালি পায়ে খেলতে চাওয়ায় ফিফার আপত্তির কারণেই ভারত বিশ্বকাপে অংশ নেয়নি। কারণ, সে সময় ভারতীয় ফুটবলারদের অনেকেই বুট ছাড়াই খেলতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের মতে, এ ব্যাখ্যা আসলে অনেকাংশে ‘মিথ’, রোমাঞ্চকর হলেও তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আসলে স্বাধীনতার মাত্র ৩ বছর পর সদ্য গঠিত দেশের পক্ষে ব্রাজিলে দল পাঠানোর খরচ ছিল অত্যন্ত বেশি। দীর্ঘ যাত্রা, সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, বিশ্বকাপের তুলনায় অলিম্পিককে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত— সব মিলিয়েই পিছিয়ে আসে ভারতীয় ফুটবল প্রশাসন। তৎকালীন ‘অল ইন্ডিয়া ইন্ডিয়ান ফুটবল ফেডারেশন’-এর সরকারি ব্যাখ্যাতেও প্রস্তুতির স্বল্পতা এবং সময়ের অভাবের কথাই উল্লেখ করা হয়েছিল।
এর পর কেটে গিয়েছে সাড়ে সাত দশক। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারতীয় ফুটবলের প্রত্যাবর্তন আর হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকে একাধিকবার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে অংশ নিয়েছে ভারত। কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো পর্যায়ে থমকে গিয়েছে যাত্রা। বিগত বছরগুলিতে সুনীল ছেত্রী-র নেতৃত্বে ভারতীয় ফুটবল নতুন করে আশার আলো দেখেছিল। ‘এশিয়ান কাপ’-এ যোগ্যতা অর্জন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য এবং ‘ফিফা র্যাঙ্কিং’য়ে উন্নতি অনেককেই আশাবাদী করেছিল। কিন্তু সে উত্থানও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সর্বশেষ ‘ফিফা র্যাঙ্কিং’য়ে ভারত নেমে এসেছে ১৩৯ নম্বরে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং ছিল ৯৪। আর সর্বনিম্ন অবস্থান ছিল ২০১৫ সালের মার্চ মাসে, ১৭৩ নম্বরে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইউনিটি কাপ’-এ পরপর ব্যর্থতা, তাজিকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩-১ ব্যবধানে পরাজয় ভারতীয় ফুটবলের সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
জাতীয় দলের বর্তমান কোচ খালিদ জামিল দায়িত্ব নেওয়ার সময় ভারতের র্যাঙ্কিং ছিল ১৩৩। কিন্তু সিঙ্গাপুর, বাংলাদেশ, জামাইকা, জিম্বাবোয়ের মতো তুলনামূলক ‘কম শক্তিশালী’ বা ‘সমমান’-এর দলের বিরুদ্ধে হতাশাজনক ফল ভারতের অবস্থানকে আরও দুর্বল করেছে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ‘এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন’-এর শীর্ষ ২৬ দেশের তালিকা থেকে ভারত ছিটকে গেলে ২০৩০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে। কারণ, এশিয়ার সেরা ২৬টি দল সরাসরি দ্বিতীয় পর্বে খেলার সুযোগ পায়। বাকি দেশগুলিকে অতিরিক্ত প্লে-অফ পর্বের বাধা পেরোতে হয়, যেখানে একটি খারাপ ফলই বিশ্বকাপের স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে।
যদিও, বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয় ফুটবলের সমস্যার শিকড় আরও গভীরে প্রোথিত। প্রথম এবং সবচেয়ে বড়ো সমস্যা তৃণমূল স্তরে সুসংহত কাঠামোর অভাব। বিশ্বের প্রথম সারির ফুটবল শক্তিগুলির মতো ভারতে এখনো দেশজুড়ে বিস্তৃত ফুটবল অ্যাকাডেমি, স্কুল লিগ, ক্লাব নেই। প্রতিভা খোঁজার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ‘এআইএফএফ বেবি লিগ’-এর মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভারতের মতো বিশাল দেশের তুলনায় এখনো অপ্রতুল। প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার মেহতাব হোসেনের বলেছেন, সমস্যার তালিকা এত দীর্ঘ যে, তা লিখতে একটি গোটা পাতাও যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, ভারতীয় ফুটবলের পুনরুত্থানের একমাত্র পথ দীর্ঘমেয়াদি তৃণমূল বিনিয়োগ। প্রাক্তন ক্রিকেটার দীপ দাশগুপ্তও একই মত পোষণ করেন। তাঁর বক্তব্য, ফুটবলে সাফল্য পেতে হলে উপর থেকে নিচে নয়, নিচ থেকে উপরে ওঠার কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
তবে ভারতীয় ফুটবলের সমস্যাকে শুধুমাত্র ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার উপর চাপিয়ে দিতে নারাজ অনেকেই। কারণ, কলকাতার মতো শহরে ফুটবল এখনো আবেগের নাম। এখানে ক্লাব সমর্থন অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। কিন্তু সে আবেগকে পেশাদার কাঠামোয় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে ভারতীয় ফুটবল। ২০১৪ সালে ‘ইন্ডিয়ান সুপার লিগ’ চালু হওয়ার পর ভারতীয় ফুটবলে নতুন বিনিয়োগ এসেছে, দর্শক বেড়েছে, পরিকাঠামোর কিছু উন্নতি হয়েছে এবং খেলোয়াড়দের আর্থিক নিরাপত্তাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে উঠে এসেছে নতুন প্রশ্ন। অনেকের মতে, ‘আইএসএল’-নির্ভর ফুটবল কাঠামোয় খেলোয়াড়দের ম্যাচ খেলার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে গিয়েছে। প্রাক্তন জাতীয় কোচ ইগর স্তিমাচ এই পরিস্থিতিকে ‘কমফোর্ট ফুটবল’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ক্লাব ও জাতীয় দলের সংঘাতও ভারতীয় ফুটবলের গুরুতর সমস্যা। অতীতে জাতীয় দলের শিবির থেকে ফুটবলারদের ফিরিয়ে নেওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে একাধিকবার। ২০০৬ সালে জাতীয় দলের কোচ বব হটন এ বিষয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। ২০২৩ সালের ‘এশিয়ান গেমস’-এর সময়ও অনেক ‘আইএসএল’ ক্লাব জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় ছাড়তে অনীহা দেখায়। সম্প্রতি ‘ইউনিটি কাপ’-এর সময়েও একই অভিযোগ উঠেছিল। এর ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ম্যাচ অনুশীলন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভারতীয় ফুটবলাররা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতীয় দলের উন্নতি না হলে গোটা ফুটবল ব্যবস্থার উপরই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আলোচনায় খেলোয়ারদের ‘ফিটনেস’ ও শারীরিক সক্ষমতার প্রসঙ্গও বারবার উঠে আসছে। এশিয়ার শীর্ষ দলগুলির সঙ্গে তুলনা করলে ভারতীয় ফুটবলারদের শক্তি, গতি আর সহনশীলতার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই অভিজ্ঞদের মত, প্রাথমিক স্তর থেকেই বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ, পুষ্টিবিদ, স্ট্রেংথ অ্যান্ড কন্ডিশনিং কোচ এবং আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানকে গুরুত্ব দেওয়া অনিবার্য।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ভারত অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন-সহ দেশের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করেছিল, দেশে ফুটবলের প্রতি আগ্রহের কোনো অভাব নেই। সে প্রতিযোগিতায় ভারতের হয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন জিকসন সিং। কিন্তু যে প্রতিযোগিতায় স্পেনের হয়ে খেলেছিলেন ফেরান তোরেস এবং ইংল্যান্ডের হয়ে গোল করেছিলেন মার্ক গেহি, তাঁদের অনেকেই আজ নিজেদের জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। এদিকে জিকসনকে এখনো সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছে ভারতীয় ফুটবলের অনিশ্চিত বাস্তবতায়।
❤ Support Us








