- মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
- আগস্ট ৪, ২০২৬
কারফিউয়ের উঠোন থেকে ভারতের ড্রেসিংরুম! অবশেষে জাতীয় দলে জম্মু-কাশ্মীরের আকিব নবি
গত মরশুমে রনজি ট্রফিতে দুরন্ত পারফরমেন্স। তুলে নিয়েছিলেন ৬০ উইকেট। মূলত তাঁর দুরন্ত বোলিংয়ের ওপর ভর করেই প্রথমবার রনজি চ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস গড়েছিল জম্মু ও কাশ্মীর। তবুও ভারতীয় দলে ব্রাত্য ছিলেন আকিব নবি দার। ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে দলে জায়গা হয়নি। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজের দল ঘোষণার সময়ও ছিলেন উপেক্ষিত। এই নিয়ে দেখা দিয়েছিল তুমুল বিতর্ক। অবশেষে জাতীয় দলে দরজা খুলল আকিব নবির। চোটের জন্য যশপ্রীত বুমরা ছিটকে যাওয়ায় পরিবর্ত হিসেবে তাঁকে দলে নেওয়া হয়েছে।
আকিব শুধু দুর্দান্ত জোরে বোলারই নন, একজন কার্যকরী লোয়ার অর্ডার ব্যাটারও। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তাঁর টেস্ট অভিষেকের সম্ভাবনা প্রবল। আকিব নবির গল্পটা শুধু দল নির্বাচনের নয়, এটা এমন এক ক্রিকেটারের গল্প, যিনি কারফিউ চলাকালীন বাড়ির উঠোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটা চেয়ারকে ব্যাটার হিসেবে ব্যবহার করে বোলিং করতেন। সেই কঠোর পরিশ্রমই আজ তাঁর সামনে জাতীয় দলের দরজা খুলে দিয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের বারামুল্লায় বেড়ে ওঠার সময় আকিব নবির কাছে ক্রিকেট খেলাই কঠিন ছিল। অনুশীলনের জন্য ভাল পিচ বা পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধা কিছুই ছিল না। কখনো কখনও কারফিউয়ের কারণে মাঠে পৌঁছনোও অসম্ভব হয়ে পড়ত। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে হাতের কাছে যা ছিল তা দিয়েই নিজের স্বপ্নকে গড়ে তুলেছিলেন আকিব। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমি ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সমস্যাটা ছিল পর্যাপ্ত সুযোগ–সুবিধার অভাব। জম্মু ও কাশ্মীরে অনুশীলনের জন্য ভাল উইকেট ছিল না। আমার কাছে ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামও ছিল না। যা কিছু হাতের কাছে পেয়েছি, তাই দিয়েই অনুশীলন করেছি।’
আকিবের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি বারামুল্লায় কারফিউ জারি থাকার দিনগুলি। খেলার মাঠগুলি বন্ধ ছিল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন থেমে থাকেনি। আকিবের বাবা বাড়ির উঠোনে একটা অস্থায়ী নেট তৈরি করেন। একটা চেয়ারকে ব্যাটসম্যান বানিয়ে আকিব ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল করতেন। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি তাঁর লেংথ ও লাইন উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। স্মৃতিচারণ করে আকিব বলেন, ‘সেই দিনগুলিতে খেলার মাঠ বন্ধ ছিল। বারামুল্লায় ক্রিকেটের পরিকাঠামো ছিল না। যা ছিল তা দিয়েই আমাদের কাজ চালাতে হত। আরও ভাল সুযোগ–সুবিধার জন্য অনুশীলনের জন্য প্রতিদিন প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে শ্রীনগরে যেতে হত।’
আকিবের বাবা চেয়েছিলেন ছেলে ডাক্তার হোক। কারণ এর মধ্যে তিনি সুরক্ষিত ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু ক্রিকেটই ছিল আকিবের ধ্যানজ্ঞান। সকাল–সন্ধ্যা কাটত ব্যাট আর বলের মাঝেই। অবশেষে ক্রিকেটের প্রতি তাঁর আবেগের কাছে হার মানে পরিবার। কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন আকিব। তিনি কঠোর পরিশ্রমের ফল পান ২০১৫ সালে। এই বছর জম্মু ও কাশ্মীর অনূর্ধ্ব ১৯ দলে সুযোগ পান আকিব। এরপর অনূর্ধ্ব ২৩ দলে। এই সময় কর্ণেল সিকে নাইডু ট্রফিতে কেরলের বিরুদ্ধে ৫ উইকেট নিয়ে প্রতিভার পরিচয় দেন।
এরপর ২০১৮ সালে লিস্ট এ ম্যাচে অভিষেক হয় আকিবের। ২ বছর পর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। প্রথম দুটি লিস্ট এ মরশুমে ১৮ ম্যাচে ২২.৫৫ গড়ে ৩৪টি উইকেট নেন আকিব। আর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে প্রথম দুই মরশুমে ১৮.৫০ গড়ে ২৪টি উইকেট তুলে নেন। গত বছর রনজি ট্রফিতে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ আকিবকে পাদ–প্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। রোহিত শর্মা, যশস্বী জয়সওয়াল, অজিঙ্ক রাহানে, শ্রেয়স আয়ার এবং শিবম দুবের মতো তারকাখচিত দলের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরকে ঐতিহাসিক জয় এনে দেন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আকিব নবিকে। মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে জয় শুধু দলেরই ছিল না, আকিবের কেরিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়। ২০২৫–২৬ মরশুমে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রথমবার রনজি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১০ ম্যাচে তুলে নেন ৬০ উইকেট। আগের মরশুমেও ৪৪ উইকেট নিয়েছিলেন আকিব নবি। দলীপ ট্রফিতে পরপর ৪ বলে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে ইতিহাস গড়েন। আকিবের দাপট শুধু লাল বলের ক্রিকেটেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গত মরশুমে সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে ১৫ উইকেট নেন। বিজয় হাজারে ট্রফিতে ১৪ উইকেট নিয়ে তুলে নিয়ে সব ধরনের ফরম্যাটেই নিজের দক্ষতা প্রমাণ। এরপরেও জাতীয় দলে সুযোগ না দেওয়াটা অবিচারই হত আকিবের সঙ্গে।
❤ Support Us








