Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৫

চতুর্থীতে অন্যরকম মণ্ডপ পরিক্রমা: কলকাতা পুলিশের হাত ধরে ৬৫০ মুখে ফুটল হাসি

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
চতুর্থীতে অন্যরকম মণ্ডপ পরিক্রমা: কলকাতা পুলিশের হাত ধরে ৬৫০ মুখে ফুটল হাসি

বাঙালির দুর্গোৎসব মানেই জনস্রোতের উচ্ছ্বাস, আলোর রোশনাই, উৎসবের ঢক্কানিনাদ। তবে সেই ভিড়ের মাঝে কোথাও কি হারিয়ে যান কিছু মানুষ? যাদের হাঁটার শক্তি নেই, চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা, পায়ের গতি মন্থর হয়েছে বয়সের ভারে কিংবা দেহের সীমাবদ্ধতায়। সেসব মানুষগুলোর মুখে হাসি ফোটাতে চতুর্থীর সকালে শহরের বুকে অন্যরকম এক পুজো পরিক্রমার সাক্ষী রইল কলকাতা। পুলিশের তত্ত্বাবধানে, শহরের নানা প্রান্ত থেকে বিশেষ বাসে করে পুজো মণ্ডপ ঘুরলেন ৬৫০ জন মানুষ, যাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষভাবে সক্ষম ছেলেমেয়েরা।

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই শহরের বিভিন্ন থানা চত্বর থেকে একে একে রওনা দেয় ২২টি বাস। প্রতিটি বাসে উঠে পড়েন যাঁরা ভিড়ের জন্য এতদিন ঘর ছেড়ে বেরোতে পারেননি। কারো বয়স আশির কোঠায়, কেউ হুইলচেয়ারে চেপে আসা বালিকা। তাঁদের একে একে তুলে নেওয়া হয় বাসে, হাতে তুলে দেওয়া হয় ফুল। নিজে উপস্থিত থেকে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মা। মিষ্টি হেসে বলেন, ‘ওঁরা আমাদের পরিবারেরই অংশ। তাই এই উৎসবে ওঁদের যেন কিছুই না কম পড়ে।’

বাস ছুটেছে এক পুজো থেকে অন্য পুজো মণ্ডপে। শিয়ালদহ থেকে শুরু করে বাগবাজার, সিঁথি থেকে টালা, কলেজ স্কোয়ার থেকে সুরুচি, শহরের খ্যাতনামা প্যান্ডেলগুলির সুনিপুণ কারুকার্য দেখে চোখ জুড়িয়েছেন প্রবীণ নাগরিক ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা। কেউ চোখের চশমা খুলে ঠাকুর দেখছেন, কেউ আবার মোবাইল ফোনে ছবি তুলছেন ঠাকুরের মুখ। কারও মুখে বিস্ময়, কারও মুখে শান্তি, আবার কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছছেন। পুজোর দিনে এমন অনাবিল সুন্দর ‘অভিজ্ঞতার’ও যে তাদের হতে পারে, বিশ্বাসই করতে পারছেন না অনেকে। তবে শুধু ঠাকুর দর্শনেই থেমে থাকেনি আয়োজন। কলকাতা পুলিশের তত্ত্বাবধানে সকালে পরিবেশন করা হয় জলখাবার। দুপুরে নিরামিষ ভোজ — খিচুড়ি, বেগুনি, চাটনি, পায়েস। কোনো কিছুতেই ছিল না কোনো ঘাটতি। নিরাপত্তা থেকে শুরু করে সেবা, সবখানেই চোখে পড়েছে পুলিশের যত্ন। গাড়ি থেকে নামিয়ে হুইলচেয়ারে চাপিয়ে ঠাকুর দেখানোর ব্যবস্থা, প্যান্ডেলে ওঠার র‌্যাম্প, মাঝেমাঝে বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত স্থান — প্রতিটি পরিকাঠামোয় মিশে ছিল মানবিক স্পর্শ। চোখে জল নিয়ে এক প্রবীণ বললেন, ‘এই বয়সে এভাবে ঠাকুর দেখা হবে ভাবিনি। পুলিশ আমাদের ঘোরাল, আগলে রাখল। মনে হচ্ছে আজ আবার জীবনের স্বাদ পেলাম।’ এক বিশেষভাবে সক্ষম কিশোরীর কথায়, ‘ভিড়ের জন্য আমরা কখনো ঠাকুর দেখতে পারি না। এবার মা দুর্গার কাছে একটাই প্রার্থনা, পুলিশ যেন প্রতিবছর আমাদের এভাবেই সঙ্গে থাকে।’

কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই আয়োজনের লক্ষ্য শুধুই সামাজিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং একটি বার্তা দেওয়া — পুজো সকলের জন্য, কোনো শ্রেণির জন্য আলাদা করে নয়। যাঁরা নিজেরা ভিড়ের চাপে হারিয়ে যান, তাঁরা যেন অন্তত একদিন শহরের সেরা পুজোগুলি শান্তিতে দেখতে পান, তা নিশ্চিত করাই ছিল উদ্দেশ্য। প্রতি বছরই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়, তবে এবারে পরিধি ও আয়োজনে এক অন্য মাত্রা যুক্ত হয়েছে। চতুর্থীর দিন তাই শহরজুড়ে ছিল এক অন্য রকম উষ্ণতা। যখন আলো-রোশনাইয়ে ভরে উঠছে শহরের প্রতিটি গলি, ঠিক তখন পুলিশের হাত ধরে উৎসবের রঙে রাঙিয়ে উঠলেন একদল মানুষ — যাঁরা হয়তো সারাবছরই একটু স্পর্শ, একটু যত্নের অপেক্ষায় থাকেন। আজ তাঁদের জীবনে সেই আশার আলোই যেন নামল দেবীর আশীর্বাদ হয়ে। এ শহর বারবার প্রমাণ করেছে, উৎসব শুধু আনন্দের নয়, সহমর্মিতারও। কলকাতা পুলিশের এমন আন্তরিক উদ্যোগে তাই উচ্ছ্বসিত, আনন্দিত নাগরিগ সমাজ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!