- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৭, ২০২৫
শিশুর চোখের জলেই নরম সুপ্রিমকোর্ট, বদল হেফাজতের রায়। ‘মায়ের কোলেই নিরাপদ ১২ বছরের ছেলে’, জানাল সর্বোচ্চ আদালত
এক বছরের শিশুকে মা-র কোলে। বিয়ে ভেঙে যায়। তারপর কেটে গেছে প্রায় এক যুগ। ছেলেটি বড়ো হয় নতুন পরিবারে—সৎ বাবা, সৎ ভাই-বোনের সঙ্গে। হঠাৎই সে চেনা পরিবেশ থেকে তাঁকে টেনে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ আসে আদালতের— ছেলের দায়িত্বভার যাবে বাবার কাছে। কিশোর মন বিধ্বস্ত হয় এই আকস্মিক মানসিক বিপর্যয়ে। নিশ্চুপ হয়ে যায় সে। রোজকার খাওয়া-ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে থাকে। চোখে উদ্বেগ, মনে ভয়। সকরুণ ছবি দেখে শেষ পর্যন্ত নরম হল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ছেলেটিকে ফের মায়ের কাছে থাকার অনুমতি দিলেন বিচারক। এদিন বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি বরালের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিল, ‘শিশুর স্বার্থই সর্বোচ্চ বিবেচ্য। হেফাজতের রায় কোনোভাবেই অনড়, কঠিন বা চূড়ান্ত হতে পারে না।’ বিচারকরা জানালেন, ‘শিশুর মানসিক অবস্থার উপরে যে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে, তা বিবেচনা করেই কোর্টের আগের আদেশ বদলানো হল।’
ঘটনার সূত্রপাত ২০১১ সালে। ওই বছর বিয়ে হয় শিশুটির বাবা-মার। ২০১২ সালে জন্ম হয় তাদের সন্তানের। কিন্তু ১১ মাস যেতে না যেতেই বিচ্ছেদ। শিশুটির হেফাজত যায় মায়ের হাতে। এরপর ২০১৬ সালে ফের বিয়ে করেন মা। ওই দম্পতির আরো এক সন্তান রয়েছে। সৎ বাবার আগের সংসারেরও রয়েছে ২ সন্তান। ২০১৯ সালে হঠাৎই পরিস্থিতি জটিল হয়। কারণ, ছেলেটির মা ও তাঁর নতুন পরিবার মালয়েশিয়া যেতে চান, কিছু সরকারি নথিপত্রের প্রয়োজন। সে সময়েই হঠাৎ ছেলের খোঁজ পান বাবা। জানতে পারেন, সন্তানের ধর্মপরিচয়ও বদলে গিয়েছে, ছেলে এখন হিন্দু থেকে খ্রিস্টান। একথা জানতে পেরেই ফ্যামিলি কোর্টে ছেলের হেফাজতের মামলা ঠোকেন তিনি। প্রথমে হেরে যান। পরে হাইকোর্টে গিয়ে পান ছেলের হেফাজত। মা সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলে তা নাকচ হয়। কিন্তু এরপর ঘটে নাটকীয় মোড়। মা ফের নতুন করে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টে। আদালতে চিকিৎসকদের মতামত পেশ করে তিনি জানান, ছেলেটি সেপারেশন অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারে ভুগছে। ভেলোরের সিএমসি-র মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ‘চেনা পরিবেশ থেকে হঠাৎ সরে গেলে শিশুর মানসিক বিকাশ চরমভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।’
সেই রিপোর্টগুলি খতিয়ে দেখে এদিন সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ‘ছেলেটি তাঁর মা ও বর্তমান পরিবারকে কেন্দ্র করেই বেড়ে উঠেছে। সৎ বাবা, সৎ ভাইকে নিয়েই তার পরিবারবোধ গড়ে উঠেছে। ছোটবেলা থেকে মা-ই তাঁর একমাত্র ভরসা ও নিরাপত্তার আশ্রয়।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ‘এই পরিবার কাঠামো হয়তো প্রচলিত রীতি থেকে আলাদা। কিন্তু তাতে কোননো নেতিবাচকতা নেই। বরং সৎ বাবার স্নেহ, শিক্ষাগত দায়িত্ব নেওয়ার অঙ্গীকার—সব মিলিয়ে এটি একটি পরিপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশ।’ তবে বিচারপতিরা সন্তানের জীবনে পিতার উপস্থিতির গুরুত্বও স্বীকার করে জানান, ‘একজন বাবা শিশুর জীবনে ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে সম্পর্ক তৈরি হয় ধৈর্য, সময়, দায়িত্ব ও ভালবাসার মাধ্যমে।’ সে সূত্রেই মা-কে পরামর্শ, ছেলের সঙ্গে বাবার নিয়মিত সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে হবে। আদালত এও বলেছে, ‘সন্তানের কল্যাণে অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে মা-বাবাকে সম্মানের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে হবে। তাঁদের মূল দায়িত্ব, সন্তান যেন পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ পায়।’ আদালতের মায়ের অভিযোগ—ছেলেটিকে ভয় দেখিয়েছিলেন তাঁর বাবা, বলেছিলেন, মায়ের থেকে আলাদা করে দেবেন। যদিও বাবার তরফে সে অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। শেষমেশ সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ‘একটি শিশুর জীবন তাঁর মানসিক স্থিতি ও পরিচিত আবহে গঠিত হয়। একধাক্কায় সে ভিত্তি কেড়ে নেওয়া যায় না। আমরা কেবল আইন নয়, মানবিকতা ও যুক্তিবোধ দিয়েই বিচার করি।’
❤ Support Us







