- এই মুহূর্তে দে । শ
- ডিসেম্বর ২, ২০২৫
‘ধর্ম নয়, ব্যক্তিগত যাচাইয়ের ভিত্তিতেই নাগরিকত্ব নির্ধারণ’— ‘এসআইআর’ মামলায় কঠোর বার্তা সুপ্রিম কোর্টের
‘এসআইআর’ নিয়ে প্রবল বিতর্কের মাঝেই মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিল সুপ্রিম কোর্ট। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে শুনানির আবেদনকে স্পষ্টতই নাকচ করে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত জানিয়ে দিলেন— নাগরিকত্ব খতিয়ে দেখা হবে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত নথি ও তথ্যের ভিত্তিতেই, ধর্মকে কোনও উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। মূল মামলাই সব পক্ষকে নিয়ে একসঙ্গে শুনবে শীর্ষ আদালত; আলাদা তালিকা বা পৃথক বেঞ্চ, কোনোটাই হবে না আর।
বাংলাদেশ থেকে বহু বছর আগে ভারতে এসে আজও নাগরিকত্ব-স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের কয়েক জনের তরফে আইনজীবী করুণা নন্দী এদিন সওয়াল করেন, ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করলেও তাঁরা সিসিএ-র আওতায় পড়ছেন না। এই যুক্তিতেই তিনি ধর্মভিত্তিক পৃথক শুনানির আবেদন জানান। কিন্তু আদালত সাফ জানিয়ে দেয়— প্রত্যেক দাবি আলাদাভাবে পরীক্ষা করেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে, ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো আলাদা সুবিধা চলবে না। সে সঙ্গে এ সংক্রান্ত সব পক্ষকেই নোটিস পাঠিয়েছে আদালত।
এসআইআর-এর জেরে রাজ্যে ইতিমধ্যেই চলছে অস্থিরতা। নির্বাচন কমিশন এদিন জানায়, বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া এখন শেষ ধাপে, চলছে এনুমারেশন ফর্ম ডিজিটাইজেশন, ম্যাপিং এবং তথ্য-তুলনা। এই পর্বেই কমিশন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তারিখে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এনুমারেশন ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ দিন ৪ ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে ১১ ডিসেম্বর করা হয়েছে। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখও ৯ ডিসেম্বর থেকে বদলে ১৬ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের তারিখ ৭ ফেব্রুয়ারির বদলে ১৪ ফেব্রুয়ারি। কমিশনের প্রাথমিক তথ্য মতে, রাজ্যে এ পর্যন্ত চিহ্নিত হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ মৃত ভোটারের নাম। কলকাতায়ই মিলেছে ১ লাখেরও বেশি ডবল এন্ট্রি। ম্যাপিংয়ে দেখা গেছে, বাংলার ২৬ লাখ ভোটারের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলে না। যদিও কমিশনের এক কর্তা জানাচ্ছেন, অমিল মানে যে নাম বাদ যাবে তা নয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ম্যাপিং শেষ হলে এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এদিন বিকেলে, নতুন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের এজলাসে শুরু হয় এসআইআর মামলার শুনানি। আবেদনকারীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আইনজীবী এএম সিঙ্ঘভির যুক্তি দেন, নির্বাচন কমিশনের নতুন করে নিয়ম তৈরি করার অধিকার নেই। তাঁর কথায়, ‘যদি আজ এসআইআর-এর নামে নতুন নিয়ম আনা যায়, তা হলে পরে আবারও অন্য কোনো সংশোধন প্রক্রিয়ায় নতুন নথি চাওয়া থেকে ইসিকে আটকাবে কে! তা হলে তো জাতিগত পরিচয় থেকে পূর্বপুরুষের সম্পর্ক— সবকিছুর প্রমাণই দাবি করা যেতে পারে।’ রোপা আইনের ২১(৩) ধারার ব্যাখ্যায়ও আপত্তি জানান সিঙ্ঘভি। তাঁর বক্তব্য, আইনে ‘কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকা’-র উল্লেখ আছে, তাকে ‘সকল নির্বাচনী এলাকা’ বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। ফলে সারাদেশে বা সারারাজ্যে বিশেষ সংশোধন চালানোকে আইনি বৈধতা মিলছে না বলেই দাবি তাঁর। মানুষ স্বভাবগত ভাবেই পরিযায়ী— শহর বদলায়, ঠিকানা বদলায়, কর্মসূত্রে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যায়। সিঙ্ঘভির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন এই স্বাভাবিক গতি-মানবিকতাকেই ভুল ব্যাখ্যা করে এসআইআর-এর ভিত্তি করতে চাইছে।
শুনানিতে, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন তোলেন, ১৯৬০ সালের নির্বাচক নিবন্ধন বিধির ধারা ২৫ কি নির্বাচন কমিশনকে কোনও কঠোর প্রক্রিয়া মেনে চলতে বাধ্য করে, নাকি পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মে পরিবর্তনের স্বাধীনতা দেয়? উত্তরে সিঙ্ঘভির বলেন, এসআইআর-এর মাধ্যমে ইসি কার্যত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। তাঁর দাবি, ‘এটা অভূত এক অনুমানিক নাগরিক তালিকা, যেখানে প্রত্যেক নাগরিককেই আবার প্রমাণ দিতে হচ্ছে তিনি ভারতীয়।’ পক্ষে নামেন আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভারও। তাঁর বক্তব্য, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের, কমিশনের নয়। ইসি কেবল সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠাতে পারে, তার বেশি নয়। তাঁর প্রশ্ন, ‘১৯৬০-এর বিধি অনুযায়ী যেভাবেই হোক নিয়মিত সংশোধনের সময় মৃত্যু, নাম বদল, ঠিকানা পরিবর্তন নথিভুক্ত হওয়ার কথা। তাহলে পুরোপুরি নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন কেন?’
আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের সওয়াল আরও তীক্ষ্ণ। তাঁর অভিযোগ, ১৯৫০ সাল থেকে নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছভাবেই ভোটার তালিকা তৈরি করেছে। কিন্তু এসআইআর-এর নামে এখন কার্যত এক নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি। ভূষণ প্রশ্ন তোলেন, ‘এত তাড়াহুড়ো কেন? কেন এনুমারেশন ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য এত চাপ? কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে, এত জন বিএলও-কে আত্মহত্যা করতে হল?’ তাঁর আরো অভিযোগ, গোটা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব স্পষ্ট। কমিশনের কাছে তিনি জানতে চান, ‘কেন ভোটার তালিকা এমন ফরম্যাটে দেওয়া হচ্ছে না যা মেশিন পড়তে পারে?’ পরিশেষে মামলাকারী আইনজীবিরা একজোটে বলেন, তাআজ যদি ইসি-র হাতে পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়, তা হলে তাদের ব্যবহার স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে। এখানেই প্রধান বিচারপতি তাঁকে থামিয়ে দেন, বলেন, মামলার সীমারেখার মধ্যেই যুক্তি রাখতে অনুরোধ জানান। কিন্তু ভূষণ পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, ‘তালিকা মেশিন-পাঠযোগ্য আকারে প্রকাশে আপত্তি কোথায়?’ দীর্ঘ শুনানির পর আদালত জানিয়ে দেয়, আগামী ৪ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে। এসআইআর-কে ঘিরে রাজ্যজুড়ে যেভাবে বিতর্ক, আতঙ্ক এবং প্রশাসনিক চাপ বাড়ছে, তাকেই এবার বিচারবিভাগীয় পর্যবেক্ষণের সামনে আনবে পরবর্তী পর্বের শুনানি।
❤ Support Us







