- স্মৃ | তি | প | ট
- ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫
প্রয়াত স্বপ্না দেব
বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতার এক সমুজ্জ্বল প্রভা, ‘প্রতিক্ষণ’-এর সম্পাদক স্বপ্না দেব প্রয়াত। যাঁর ব্যতিক্রমী সত্তা ও সাংবাদিকতার ছাপ বাংলা ভাষা ও পত্রিকার পৃষ্ঠায় চিরস্থায়ী, অক্ষয় হয়ে থাকবে। সোমবার দুপুরে কলকাতায় বার্ধক্যজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি, প্রয়াণকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তাঁর প্রয়ানে বাংলার সংবাদ ও সাহিত্য মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শুধু পরিবার নয়, অগুনতি পাঠক, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী প্রিয়জনেরা তাঁর চলে যাওয়া অনুভব করছেন ব্যক্তিগত গভীর ক্ষতি হিসেবে।
প্রতিক্ষণ পত্রিকার পেছনে স্বপ্না দেবের নামটি পাথরের মতো স্থির ও অমলিন। বাংলার সংবাদজগতে যখন ব্যতিক্রমী মহিলা সাংবাদিকের সংখ্যা যখন আঙুলে গোনা; তখনই তিনি অভাবনীয় দৃঢ়তা, অকুতোভয় সাহস, সত্যের প্রতি আনুগত্য আর কাগজের প্রতি নিষ্ঠার এক অদম্য উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ‘প্রতিক্ষণ’ তাঁর তত্ত্বাবধানে বাংলা ভাষায় জাতীয় মানের একটি পাক্ষিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল, যা পাঠক সমাজে নিয়মিত পাঠকগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। স্বপ্না দেব কেবল সম্পাদক ছিলেন না, বরং তিনি এক শক্তিমান সাংবাদিক, বামপন্থী রাজনীতির অনুগামী ও জীবনের বহু সংগ্রাম, সাংস্কৃতিক দিকনির্দেশনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজ ভূমিকায় অটল থেকেছিলেন। ‘প্রতিক্ষণ’ তাই আজও বাংলা সংবাদ সংস্কৃতির কাছে একটি মূল্যবান ঐতিহ্য। তাঁর হাতে তৈরি প্রতিটি সংখ্যা ছিল তাঁর নিবেদিতচেতনাইয় নির্মিত এক অনন্য ধারাবাহিক পটভূমি, যেখানে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলিকে তিনি যেমন নির্ভিকতার সাথে তুলে ধরতেন, তেমনি পাঠকের কাছে সে সব খবরের নৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করতেন।
১৯৪১ সালের ১৪ মার্চ, অবিভক্ত ভারতের বরিশাল জেলার দেহেরগতি গ্রামে জন্ম নেওয়া স্বপ্না দেবের পিতা সুধীররঞ্জন চক্রবর্তী ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ স্বাধীনতা সংগ্রামী। ফলে শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে দেশপ্রেম ও সমাজচেতনার বীজ বোনা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় স্বপ্না দেবও আজীবন বামপন্থী রাজনীতির প্রতি বিশ্বাস রাখতেন এবং ১৯৬৭ সালে তিনি অবিভক্ত সিপিআই-এর আজীবন সদস্যপদ লাভ করেন। মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠেছেন বারবার। তাই তো ‘প্রতিক্ষণ’-এর অফিসে তাঁর বসবার চেয়ারের ঠিক পেছনের দেওয়ালে তিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন ইয়াসির আরাফাতের সঙ্গে।
স্বপ্না দেবের সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয়েছিল দৈনিক বসুমতী পত্রিকায়, যেখানে তিনি সাংবাদিকতার শিখন-দিনলিপি রচনা করেছিলেন প্রথাগত শিক্ষানবিশ হিসেবে। তিনি একসময় প্রখ্যাত সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে কাজ শুরু করেন ও খেলাধুলা-সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে শুরু করে রাজনীতি-সমাজ বহুমাত্রিক আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন বাংলার পাঠককূলকে। পরবর্তীকালে তাঁর স্বামী ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশনার কর্ণধার প্রিয়ব্রত দেবের সঙ্গে জুড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শব্দ আর চেতনার মহাসমুদ্রে। সংবাদ সংগ্রহ করা তাঁর কেবল পেশা নয়, তিনি সংবাদকে পাঠকের মনে পৌঁছানোর উপযোগী ভাষায় গড়ে তোলেন, তথ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গগুলিকে যুক্তিতর্কে সাজিয়ে তুলতেন। এই কারণেই প্রতিক্ষণ পত্রিকা কলকাতার ও বঙ্গের পাঠকের কাছে কেবল খবরের শিলালিপি নয়, বরঞ্চ সমাজচিন্তার এক দর্পণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মেয়েদের জন্য আলাদা পৃষ্ঠা ‘বৌঠাকুরাণীর হাট’ তৈরি করে বাংলা সাংবাদিকতায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তাঁর সাংবাদিকতা ছিল সাহসিকতাপূর্ণ ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন। ১৯৮০-এর দশকে উত্তাল পাঞ্জাব থেকে ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, আরারিয়া গণধর্ষণসহ বহু দেশজুড়ে শোক ও বিতর্ক সৃষ্টি করা খবর তিনি নিজস্ব ধৈর্য, সাহস ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। খালিস্তানি আন্দোলনের সময় জার্নেল সিং ভিন্দ্রানওয়ালের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। স্বপ্না দেবের চলে যাওয়া স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের দুনিয়ায় এক অপূরণীয় ক্ষতি, বিশেষ করে আজকের এই ফাঁপা সময়ে। স্বপ্না দেবের পুত্র, লেখক শুদ্ধব্রত দেব জানিয়েছেন, ‘আমার মা, আজ দুপুর ৩:২০-তে বাড়িতে কোনো কষ্ট ছাড়া প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর মরণোত্তর শরীর দান করার জন্য কল্যাণী এইমস-এর উদ্দেশে সন্ধ্যা সাড়ে ছ-টায় বাড়ি থেকে আমরা রওনা দেব।’
❤ Support Us








