- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৩
মালদ্বীপে ‘মহাসমর’ , উত্তেজনা চিন-ভারতে
আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ‘মালদ্বীপ ঘিরে মহাসমর’। দেশটির নির্বাচন ঘিরে চিন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ এখন তীব্র।
এই ‘মহাসমর’ এখন চূড়ান্ত লগ্নে এসে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে চিন ও ভারত সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত কোনো প্রার্থী ৫০ ভাগের বেশি ভোট পাননি। ফলে ভোট গড়িয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে। ৩০ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফার সেই ভোট হতে চলেছে। তবে ইতিমধ্যে দ্বীপরাষ্ট্রটির ওই দ্বিতীয় দফা নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বেড়ে গেছে আরেক দফা।
অতীতে মালদ্বীপের রাজনীতি-অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় সামান্যই গুরুত্ব পেত। কিন্তু মালদ্বীপকে ঘিরে ভারত-চিন ছায়াযুদ্ধের কারণে দেশটির চলতি মাসের নির্বাচন নিয়ে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিকেরা অভূতপূর্ব আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে নিয়ে নয়াদিল্লি বিশেষভাবে অসুখী। বছরের শুরুতে ভারতীয় প্রচারমাধ্যমগুলো মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য সরকারকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। কিন্তু কূটনীতিক যুদ্ধাবস্থা বজায় আছে এখনও। সর্বশেষ আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে, নিজ ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সামরিক হেলিকপ্টার ও সামরিক ব্যক্তিদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে মালদ্বীপ। দেশটিতে ভারতের প্রায় ৩০ জন সামরিক ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের ভিসার মেয়াদ জুনে শেষ হলেও তাঁরা স্বদেশে ফিরছেন না। মালদ্বীপ বলছে, এসব হেলিকপ্টার ও সামরিক কর্মীদের আর দরকার নেই তাদের। কিন্তু এঁদের ফেরতের দাবির জবাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মালদ্বীপে অধিকতর গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য অনুরোধ করেছেন। তিনি মালদ্বীপ পরিস্থিতিকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগ’-এর বিষয় বলেও উল্লেখ করেন।
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আকুতি সহজেই অনুমেয়। মালদ্বীপের ভারত সমর্থক হিসেবে বিবেচিত ডেমোক্রেটিক পার্টির গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের চরম কোণঠাসা করে রেখেছেন প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা ইয়ামিন। এই রকম রাজনীতিবিদদের কেউ নির্বাসনে, কেউবা কারাগারে এখন।
নয়াদিল্লির জন্য এর চেয়েও উদ্বেগজনক দিক হলো মালদ্বীপ ক্রমাগত এমন আচরণ করছে, যা ভারতের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। বছরের শুরুতে সন্নিহিত সাগরে ভারতের নৌমহড়ায় অংশ নিতে অস্বীকার করে মালদ্বীপ। সম্প্রতি দ্বীপরাষ্ট্রটিতে অসামরিক কাজে যাওয়া ভারতীয়দের ভিসার মেয়াদ বাড়ানোও অনেক কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজের সুযোগ পেলেও গত ছয় মাসে ওয়ার্ক পারমিটের অভাবে অন্তত দুই হাজার ভারতীয় মালদ্বীপে ঢুকতে পারেননি। মালদ্বীপের বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও উদীয়মান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে কর্মী নিয়োগে ভারতীয়দের বাদ দিচ্ছে।
ভারতের মালদ্বীপ সংকটের শুরু গত ফেব্রুয়ারি থেকে। তখন প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, দেশটির উচ্চ আদালত তা অবৈধ হিসেবে রায় দেন। নির্বাহী বিভাগ বনাম বিচার বিভাগের ওই শক্তি পরীক্ষায় ইয়ামিন খোদ প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ শহীদকেই আটক করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাউমুন আবদুল গাইয়ুমও এ মুহূর্তে কারাগারে আছেন। ইয়ামিনের ৮০ বছর বয়সী সৎভাই গাইয়ুম ১৯৭৮ সাল থেকে প্রায় ৩০ বছর দেশটি শাসন করেছিলেন। তাঁকে মালদ্বীপের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ মনে করা হতো।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের ভারতবিরোধী ভূমিকার শক্তি-ভিত হলো চীনের সমর্থন। ভারতের প্রচারমাধ্যম প্রতিনিয়ত এ রকম ধারণা প্রচার করছে।
ভৌগোলিকভাবে ভারতের আয়তন প্রায় ৩৩ লাখ বর্গ কিলোমিটার। চিনের আয়তন তার চেয়েও প্রায় তিন গুণ বেশি। অথচ এই দুই দেশই এখন ৩০০ বর্গ কিলোমিটারের চেয়েও ছোট মালদ্বীপে গোপন এক শক্তি পরীক্ষায় লিপ্ত।
গাইয়ুমসহ অতীতের সব শাসকই ক্ষমতায় থাকাকালে সামরিক ও বেসামরিক সাহায্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৯৮৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা থেকেও গাইয়ুমকে রক্ষা করে ভারত। সেই থেকে মালদ্বীপের ভারতবলয়ভুক্তি কূটনীতিক পরিমণ্ডলে স্বীকৃত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইয়ামিন প্রেসিডেন্ট হয়ে সে ধারা বদলে নিয়েছেন। তাঁর পাশে বেশ শক্ত অবস্থানেই দেখা যাচ্ছে চিনকে। অথচ মালদ্বীপে চিনের দূতাবাস প্রতিষ্ঠার ইতিহাস মাত্র সাত বছরের। গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের শঙ্কার মুখে চীন খোলামেলাভাবে তার বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছিল। ভারতীয় ‘জিএমআর’ কোম্পানির কাছ থেকে রাজধানীসংলগ্ন প্রধান বিমানবন্দর সম্প্রসারণের ঠিকাদারিও চিন কেড়ে নিয়েছে ইয়ামিনের সহায়তায়। এই প্রকল্পের ব্যবসায়িক মূল্য ৫১১ মিলিয়ন ডলার হলেও প্রতীকী মূল্য অনেক বেশি। ছোট ছোট দ্বীপের অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকারও পেয়েছে চিন। একাধিক দ্বীপের সঙ্গে রাজধানী মালের সেতু তৈরি করছে চিনের বিভিন্ন কোম্পানি। এসব সেতু নির্মাণে প্রায় ২২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। পাশাপাশি সাত হাজার ফ্ল্যাটের ১৬টি ভবন বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প দেশটির অর্থনীতিতে বাড়তি গতি এনে দেবে বলে অনুমান করছে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ উভয়ে। তবে মালদ্বীপ চিনের ঋণ-জালে বাঁধা পড়ছে বলেও তাদের শঙ্কা আছে।
এই আবহে মালদ্বীপে নির্বাচন বা ‘মহাসমর’ হতে চলেছে ৩০ সেপ্টেম্বর। ভোটারদের সংখ্যার হিসাবে মালদ্বীপের নির্বাচনকে বাংলাদেশের যেকোনো একটা সংসদীয় আসনের চেয়ে ছোট ভোট বললে অতুক্তি হবে না। মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডে ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বিরোধী দল পিপলস ন্যাশনাল কংগ্রেসের বা পিএনএস প্রার্থী ভোট পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এমডিপি-র ইব্রাহিম মোহাম্মদ সলিহ পেয়েছেন ৩৯ শতাংশ ভোট। নির্বাচনে আরও ছয়জন প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা সবাই মিলে বাকি ১৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। প্রথম দফার এই ফল থেকে বোঝা যাচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে মূলত পিএনএসের মোহাম্মদ মুইজজু ও এমডিপির সলিহের মধ্যে। কিন্তু যে ছয়জন তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি, দ্বিতীয় দফা ভোটে তাঁদের ভোটাররা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
প্রার্থী বাঁচিয়ে সময় মালদ্বীপের চলতি নির্বাচনের মূল আকর্ষণ তৈরি হয়। বিরোধী দল থেকে এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিনের। তিনি প্রগ্রেসিভ পার্টি অব মালদ্বীপের বা পিপিএম-র নেতা। আর সরকারি দল এমডিপি থেকে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন আরেক প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ। তিনি মজলিশ নামে পরিচিত সর্বশেষ পার্লামেন্টের স্পিকার।
কিন্তু আদালতের দণ্ডের কারণে আবদুল্লাহ ইয়ামিন যেমন প্রার্থী হতে পারেননি, তেমনি এমডিপি থেকে নাশিদকে প্রার্থী হতে দেননি বর্তমান প্রেসিডেন্ট সলিহ। এর ফল হয়েছে দুটি। নাশিদ এমডিপি ছেড়ে দিয়েছেন। আর বিরোধী পক্ষ ইয়ামিনের বিকল্প হিসেবে মুইজজুকে প্রার্থী করে। মুইজজু প্রার্থী হয়েছেন দুটি বিরোধী দলের জোট প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স থেকে। এই জোটে আছে দুটি বিরোধী দল পিপিএম এবং পিএনসি। এর মধ্যে প্রথমটি দেশের মূল বিরোধী দল।
মুইজজু প্রথম রাউন্ডে সলিথের চেয়ে প্রায় সাত ভাগ বেশি ভোট পাওয়ায় আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলো কিছুটা বিস্মিত হয়েছে। এটা ঘটেছে ছোট-বড় কয়েকটি কারণে। প্রথমত, নাশিদ বেরিয়ে আসায় এমডিপির ভোট কমে গেছে। নাশিদ নতুন একটি দল করেছেন ডেমোক্র্যাটস নামে। এই দলের প্রার্থী নির্বাচনে ভাগ ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছেন। এই ভোটগুলো সম্ভবত সলিথের শিবির থেকেই গেছে। দ্বিতীয়ত এমডিপির প্রার্থী, বর্তমান প্রেসিডেন্টকে মানুষ ভারত-সমর্থক হিসেবে দেখছিলেন। আর মুইজজুকে বিবেচনা করা হয়েছে ভারতবিরোধী হিসেবে। রাজধানী মালের মেয়র হিসেবে দেশব্যাপী আগে থেকেই তাঁর পরিচিতিও রয়েছে।
❤ Support Us






