- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৫
বিদ্যাসাগরের জন্মতিথিতে বঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ, মুখোমুখি তরজায় তৃণমূল-বিজেপি
২ শতকেরও আগে, আজকের দিনে জন্মেছিলেন বাঙালির ইতিহাসে কু-সংস্কারভেদী এক আলোকবর্তিকা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, নারী-অধিকার আর মানবিকতার অবিস্মরণীয় নাম। শুধু অতীত নয়, সমকালের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার ফিরে এসেছেন তিনি, কখনো প্রেরণা, কখনো শক্তি কখনো বা বিতর্কের স্বরূপ নিয়ে। বিদ্যাসাগরের ২০৫তম জন্মবার্ষিকীকে কেন্দ্র করেই আবারও উত্তাল বাংলার রাজনীতি। মূর্তি ভাঙার পুরনো ক্ষত মনে করিয়ে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ তৃণমূল কংগ্রেসের। অন্যদিকে, জন্মদিনে বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করে ‘পাপক্ষয়’-এর আভাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কথায়। ৬ বছর আগের একটি বিতর্কিত ঘটনার প্রেক্ষাপটেই আজকের এই রাজনৈতিক তর্জা। ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনের মুখে কলকাতায় বিজেপির রোডশো চলাকালীন বিদ্যাসাগর কলেজের ভেতরে তাঁর মূর্তি ভেঙে ফেলার ঘটনা রীতিমতো শোরগোল ফেলে দিয়েছিল রাজ্য-রাজনীতিতে। সে বিতর্কই এ বার পুজোর আবহে আবার ফিরে এল নতুন করে।
ঔপনিবেশিক শাসনের ভারতে বাংলার বীরসিংহ গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবার থেকে উঠে এসে যিনি গোটা সমাজকে আলো দেখিয়েছিলেন, আজ তাঁর নামেই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দান। এদিন সকালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মহান মনিষীকে স্মরণ করে বলেন, ‘বাংলার সৌভাগ্য যে এমন একজন মনীষীকে আমরা পেয়েছিলাম। যাঁর থেকে আমরা বাংলা ভাষার বর্ণপরিচয়ের পাঠ পেয়েছি, এবং শিখেছি কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়।’ তিনি বলেন, বিদ্যাসাগর শুধু সমাজ সংস্কারক নন, মানবতাবাদের প্রতীক। যাঁর মতাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের আধুনিক বাংলা গড়ে উঠেছে। এই প্রসঙ্গে বিজেপিকে খোঁচা দিতে ভোলেননি মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর কটাক্ষ, ‘যাঁরা বিদ্যাসাগরের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবিকতায় বিশ্বাস করেন না, যাঁরা তাঁর মূর্তি ভেঙে অপমান করেছেন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে, তাঁদের বাংলায় কোনো স্থান নেই।’
বিদ্যাসাগর কলেজে মূর্তি পুনঃস্থাপন থেকে শুরু করে রাজ্য জুড়ে বিদ্যাসাগরের স্মৃতিকে সংরক্ষণের নানা কাজের খতিয়ানও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছেন, কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজে ভাঙা মূর্তিটি রাজ্য সরকারই পুনঃস্থাপন করেছে। সারা রাজ্যজুড়ে পালিত হয়েছে বিদ্যাসাগরের দ্বিশতবার্ষিকী। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘাটাল-চন্দ্রকোণা সড়কের সিংহডাঙ্গা মোড়ে ‘বর্ণপরিচয়’ নামে একটি তোরণ তৈরি করা হয়েছে, যার নকশা তিনিই তৈরি করে দিয়েছেন। তোরণ নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় এক কোটি ৮৩ লক্ষ টাকা। আলো দিয়ে সাজানো হয়েছে সেই তোরণ। সংলগ্ন এলাকায় হাই-মাস্ট আলো বসানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে রাজ্যের পূর্ত দফতর। তাছাড়াও বীরসিংহ গ্রামে নির্মাণ করা হয়েছে ‘বিদ্যাসাগর শিশু উদ্যান’, সেখানে অবস্থিত ‘ঈশ্বরচন্দ্র স্মৃতি মন্দির’-এর সৌন্দর্যায়নও করা হয়েছে। দুটি প্রকল্পে খরচ হয়েছে যথাক্রমে ২ কোটি ৫০ লক্ষ এবং ৩০ লক্ষ টাকা। রাজ্য সরকার গঠিত বীরসিংহ উন্নয়ন পর্ষদ কাজের দায়িত্বে ছিল। পাশাপাশি বিদ্যাসাগরের বীরসিংহের পৈতৃক ভিটে সংস্কার ও সার্বিক উন্নয়নের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে। বাদুড়বাগানে তাঁর কলকাতার বাসভবনের মিউজিয়ামও নতুন করে সাজানো হয়েছে। বিদ্যাসাগর কলেজে তাঁর নামে একটি আর্কাইভ গড়ে তোলা হয়েছে, সেই কলেজকে হেরিটেজ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাঁর প্রতিষ্ঠিত কলকাতার মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউশনকে দেওয়া হয়েছে সরকারি অনুদান।
With the scent of elections in the air, Helicopter Mantri @AmitShah has returned to Bengal, flaunting his grandiose speeches invoking Pandit Ishwar Chandra Vidyasagar.
Let him be reminded that six years ago, in 2019, his Bangla-Birodhi rally saw the vandalisation of Vidyasagar’s… pic.twitter.com/SnrPR1vtdg
— All India Trinamool Congress (@AITCofficial) September 26, 2025
শ্রদ্ধার এ আবহেই আজ পুজো উদ্বোধনের মঞ্চ থেকে বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের মণ্ডপ থেকে তিনি বলেন, ‘শুধু বাংলার নয়, গোটা দেশের শিক্ষার প্রগতিতে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। নারীশিক্ষার প্রসারে, সংস্কার আন্দোলনে, সংস্কৃতির উন্নয়নে বিদ্যাসাগর তাঁর গোটা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।’ শাহের কথায়, ‘আজ আমি আমার পক্ষ থেকে এবং বিজেপির কোটি কোটি কর্মীর পক্ষ থেকে বিদ্যাসাগরকে সবিনয় শ্রদ্ধার্ঘ্য জানাচ্ছি।’ তবে তাঁর এই মন্তব্যকে নিছক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন হিসেবে মানতে নারাজ তৃণমূল নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তাঁদের মতে, ৬ বছর আগের সেই মূর্তি ভাঙার বিতর্ক এখনো রাজ্য রাজনীতির পটভূমিতে জ্বলন্ত। বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে বিজেপি নেতার মুখে প্রশংসার সুর আসলে সে ঘটনার ক্ষত মুছতে ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর প্রয়াস বলেই ব্যাখ্যা করছেন অনেকে। এছাড়াও এদিন অমিত শাহ মঞ্চ থেকে ফের একবার বাংলায় বিজেপি সরকার গড়ার ডাক দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি, যাতে বাংলায় এমন সরকার গঠন হয়, যা সোনার বাংলা গড়তে পারে। ’একইসঙ্গে বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ইতিহাসকে পুনরুদ্ধারের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলা হোক শান্ত, সুরক্ষিত, সুজলা-সুফলা। কবিগুরুর স্বপ্নের বাংলাকে আমরা ফের গড়ে তুলতে চাই।’

বৃহস্পতিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর বেলা ১১টা ২০ মিনিট নাগাদ উত্তর কলকাতার এই ঐতিহ্যবাহী পুজো মণ্ডপে পৌঁছন তিনি। এবারের থিম ‘অপারেশন সিঁদুর’—পহেলগামে জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় সেনার সন্ত্রাসদমন অভিযানের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই মণ্ডপ ইতিমধ্যেই দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রে।উদ্বোধনের পরে অমিত শাহ বলেন, “মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছি, এই নির্বাচনের পর বাংলায় এমন সরকার তৈরি হবে, যা সোনার বাংলা নির্মাণ করবে। বাংলা আবার সুজলা, সুফলা, সুরক্ষিত ও শান্ত হবে।” সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারের এই পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা কলকাতা পুরসভার বিজেপি কাউন্সিলর ও সজল ঘোষ। প্রসঙ্গত, এটি অমিত শাহের প্রথম উদ্বোধন নয়—২০২৩ সালেও তিনি এই মণ্ডপের উদ্বোধন করেছিলেন, সে বার থিম ছিল অযোধ্যার রামমন্দির।
তৃণমূল-বিজেপির এই তরজায় বিদ্যাসাগরের জন্মতিথি পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দানে। যেখানে একদিকে রাজ্য সরকার তাঁদের উন্নয়নমূলক কাজের ফিরিস্তি দিচ্ছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতারা বাংলার সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে সামনে রেখে ভবিষ্যতের রাজনীতির রূপরেখা তৈরি করছেন। তবে রাজনীতি যাই বলুক, বিদ্যাসাগর নিজে ছিলেন নির্বিকার, নির্ভীক। মানবতাবাদ, যুক্তিবাদ এবং শিক্ষার আলোয় যিনি পথ দেখিয়েছিলেন গোটা জাতিকে, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বঙ্গমানসে এখনো অমলিন।
❤ Support Us






