- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মে ২১, ২০২৫
জল জীবন মিশনে অনিয়মের ঢল, প্রায় ১৬ হাজার কোটি অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ। দেশের ১৩৫ জেলায় কেন্দ্রের পরিদর্শন দল
নরেন্দ্র মোদি সরকারের অন্যতম উচ্চপ্রচারিত প্রকল্প ‘জল জীবন মিশন’ নিয়ে উঠছে একের পর এক প্রশ্ন। বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার এই প্রকল্পে খরচের হিসেব ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে একাধিক রাজ্যে। অর্থ মন্ত্রকের সচিবের নথিতে ধরা পড়েছে সেই অনিয়মের প্রমাণ। কেন্দ্রীয় জলশক্তি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই রাজ্য পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে । মোট ৭টি রাজ্যে অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫টিই বিজেপি শাসিত।
জল জীবন মিশনের অধীনে গ্রামীণ পরিবারে নলবাহিত বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই ২০১৯ সালে প্রকল্পের সূচনা হয়। কেন্দ্র সরকারে তথ্য অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত প্রায় ৯০ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার ট্যাপ সংযোগ পেয়েছে। লক্ষ্য, ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০ শতাংশ পরিবারকে এই পরিষেবার আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তব চিত্র উদ্বেগজনক। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অফিস-এর সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, এখনো মাত্র ৩৯ শতাংশ গ্রামীণ পরিবার নলের জলকে প্রাথমিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। বিশেষত, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশার মতো রাজ্যগুলিতে এই হার ৬ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে আরো বড়ো চ্যালেঞ্জ খরচ ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায়। ব্যয়ের পরিমাণ অনুমানিক খরচের অনেক বেশি হবার ঘটনা ঘটেছে বহু প্রকল্পে। জলশক্তি মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, খরচের তদন্তে ১৩৫টি জেলায় ১০০টি পরিদর্শক দল পাঠানো হচ্ছে। পরিদর্শনের আওতায় রয়েছে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশা, কর্নাটক, কেরল ও তামিলনাড়ু। মধ্যপ্রদেশে প্রায় ২৮ টি প্রকল্প খতিয়ে দেখা হবে।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধান বলছে, ২০২২ সালের ২১ জুন থেকে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ১ লক্ষেরও বেশি প্রকল্প তৈরি হয়েছে। দেখা গিয়েছে, এই সময়কালে ১৪,৫৮৬টি প্রকল্পে অনুমানিত খরচের তুলনায় ১৬,৮৩৯ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হয়েছে। যা প্রায় বরাদ্দের ১৪.৫৮ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে বেশি বাড়তি খরচ হয়েছে মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র ও ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যগুলিতে। প্রকল্প খরচ বৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ২০২২ সালে জারি হওয়া একটি সংশোধিত নির্দেশিকা, যাতে ‘টেন্ডার প্রিমিয়াম’ অর্থাৎ আনুমানিক খরচের তুলনায় বেশি দর হাঁকা হলে তা ‘অগ্রহণযোগ্য খরচ’ বলে গণ্য করার নিয়ম তুলে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পগুলিতে খরচ বেড়েছে লাগামছাড়া হারে। ২০১৯ সালের মূল গাইডলাইনে বলা হয়েছিল, অনুমোদিত খরচের অতিরিক্ত কোনো ব্যয় হলে তা রাজ্য সরকারকে বহন করতে হবে। কিন্তু ২০২২ সালের নির্দেশিকায় বলা হয়, প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত ‘ডিসকভার কস্ট’-ই অনুমোদিত খরচ হিসেবে ধরা হবে।
এই নির্দেশিকার পর ১৪,৫৮৬টি প্রকল্পে খরচ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে ২৪টি প্রকল্পের খরচ ১,০০০ কোটির বেশি, ৩৩টি প্রকল্প ৫০০–৯৯৯ কোটির মধ্যে আর ১৩৩টি প্রকল্প ১০০–৪৯৯ কোটি টাকার মধ্যে। মধ্যপ্রদেশেই একটি প্রকল্পে অনুমানিত খরচের চেয়ে ৫০০ কোটির বেশি খরচ হয়েছে। এই অনিয়মের জেরে কেন্দ্রের ব্যয় সংক্রান্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি জলশক্তি মন্ত্রকের অতিরিক্ত ২.৭৯ লক্ষ কোটি টাকার অনুরোধ খারিজ করে ১.৫১ লক্ষ কোটির সুপারিশ করেছে। কেন্দ্রীয় স্তরে প্রকল্পের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে স্পষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু খরচ নয়, ব্যবস্থারও। এখনো পর্যন্ত পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয়ভাবে প্রযুক্তিগত নির্দেশে পরিচালিত হয়। বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় ব্যবস্থার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। অভিযোগ ব্যবস্থাও দুর্বল। স্থানীয় স্তরে সমস্যা সমাধানের নির্দিষ্ট পরিকাঠামো না থাকায় বহু অভিযোগ সংশ্লিষ্ট দফতরের বা সরকারের অজানাই থেকে যায়। তার উপর প্রকল্পের অগ্রগতি ঘটাতে যে পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়, তা বহু ক্ষেত্রেই পুরনো আদমশুমারির উপর নির্ভরশীল। যার ফলে প্রকৃত ছবির সঙ্গে প্রশাসনিক তথ্যের ফারাক থেকেই যাচ্ছে। জল জীবন মিশন চালু হয়েছিল ২০১৯ সালে ৩.৬০ লক্ষ কোটি টাকার ব্যয়ে। এপর্যন্ত অনুমোদিত প্রকল্পের মোট খরচ ৮.২৯ লক্ষ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে স্বচ্ছতা, পরিকাঠামো নির্মাণের গতি আর খরচের জবাবদিহিতার উপর।
❤ Support Us






