- প্রচ্ছদ রচনা বি। দে । শ
- জানুয়ারি ৭, ২০২৬
মাদুরোর ভেনেজুয়েলা কি সত্যিই আমেরিকার মাদক-সঙ্কটের উৎস ? ট্রাম্পের অভিযোগ নস্যাৎ করে, মার্কিন পরিসংখ্যানই বলছে অন্য কথা
লাতিন আমেরিকার ঘুমন্ত শহরকে জাগিয়ে তুলেছিল ধারাবাহিক বিস্ফোরণের শব্দ। ঘুম ভেঙে আতঙ্কিত মানুষ ঘরের আলো জ্বালানোর আগেই, আকাশ কাঁপিয়ে গর্জে উঠেছিল গুলির শব্দ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী আর দেশে নেই। মার্কিন বিশেষ বাহিনী তাঁদের আটক করে নিয়ে গিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। পর দিনই খবর, নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধানকে। অভিযোগ, মাদক পাচার ও আমেরিকার বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, মাদুরো শুধু এক জন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি আসলে একটি আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের অন্যতম মাথা। তাঁর নির্দেশেই নাকি বিপুল পরিমাণ মাদক ঢুকছে আমেরিকায়। সে মাদকই গ্রাস করেছে প্রজন্মকে, প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে প্রতিদিন শত শত মানুষের। কিন্তু আমেরিকার নাটকীয় ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের দাবির ভিত কতটা মজবুত? নাকি মাদক-যুদ্ধের গল্পের আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো হিসেব ? এই মুহূর্তে আমেরিকা যে এক গভীর মাদক-সঙ্কটে, তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। সরকারি সমীক্ষা বলছে, মারিজুয়ানা বাদ দিলেও অন্তত ২ কোটিরও বেশি আমেরিকান নিয়মিত অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন। কিশোর বয়স পেরোনোর আগেই অনেকের হাতেই পৌঁছে যাচ্ছে নিষিদ্ধ নেশার বস্তু। ফেন্টানিল নামের সিন্থেটিক মাদক এখন কার্যত মৃত্যুর প্রতিশব্দ। প্রতিদিন গড়ে দুশোরও বেশি মানুষের প্রাণ ঝরছে এই বিষে। যুবসমাজের মধ্যে মাদক অতিমাত্রায় সেবনই এখন মৃত্যুর প্রধান কারণ। ভয়াবহ বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে হোয়াইট হাউস বলছে, কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া উপায় ছিল না। আর সে পদক্ষেপের নিশানায় ভেনেজুয়েলা থাকতে বাধ্য।
এতকিছুর মধ্যে পরিসংখ্যান কিন্তু অন্য কথা বলছে। মার্কিন মাদক দমন সংস্থা এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের তথ্য খতিয়ে দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়, আমেরিকায় ঢোকা মাদকের প্রধান উৎস ভেনেজুয়েলা নয়। বরং মেক্সিকো সীমান্তই হয়ে উঠেছে নিষিদ্ধ নেশার প্রধান প্রবেশদ্বার। দক্ষিণের এই সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ঢুকে পড়ছে ফেন্টানিল, মেথামফেটামিন, হেরোইন ও নানা ধরনের সিন্থেটিক মাদক। মেক্সিকোর সিনালোয়া ও জালিস্কো নুয়েভা জেনারাসিওন, দুই ভয়ংকর অপরাধচক্র কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে আমেরিকার মাদক বাজার। চিন ও ভারত থেকে আনা রাসায়নিক উপাদান দিয়ে মেক্সিকোর দুর্গম পাহাড় ও জঙ্গলে গড়ে ওঠা গোপন পরীক্ষাগারে তৈরি হচ্ছে নেশাদ্রব্য। তার পর গাড়ির তলা, ট্রাকের গোপন চেম্বার, কখনো ড্রোন, কখনো আবার সীমান্তের নীচে খোঁড়া সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে মাদক ঢুকে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে। একবার সীমান্ত পেরোলেই, রাজ্য থেকে রাজ্যে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে দীর্ঘ আন্তঃরাজ্য মহাসড়ক। কোকেনের ক্ষেত্রেও ছবিটা ভিন্ন নয়। বিশ্বের কোকেন রাজধানী হিসেবে বহু দিন ধরেই পরিচিত কলম্বিয়া। সেখানকার বিস্তীর্ণ জমিতে কোকা চাষ হয়, গোপন কারখানায় তা রূপ নেয় সাদা পাউডারে। সে কোকেনের সিংহভাগই পৌঁছয় উত্তর আমেরিকার বাজারে। কলম্বিয়ার সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীগুলি মেক্সিকোর কার্টেলদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এ ব্যবসা চালায়।
এসবে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা মূলত একটি যাতায়াতের পথ। কলম্বিয়া থেকে আসা কোকেনের একটি অংশ ভেনেজুয়েলার আকাশপথ ও সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ক্যারিবীয় অঞ্চল ও ইউরোপের দিকে যায়। ইউরোপমুখী মাদক পাচারেই ভেনেজুয়েলার উপস্থিতি তুলনায় বেশি। যুক্তরাষ্ট্রগামী মাদকের ক্ষেত্রে দেশটির ভূমিকা গৌণ। উপরন্তু, মেক্সিকোর মতো উন্নত সিন্থেটিক মাদক তৈরির পরিকাঠামো ভেনেজুয়েলায় নেই। প্রশ্ন ওঠছে, তাহলে মেক্সিকো বা কলম্বিয়া নয়, কেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টই গ্রেপ্তার করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে চোখ ফেরাতে হয় ভূ-রাজনীতির দিকে। ভেনেজুয়েলা এই মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদকারী দেশ। শুধু তেল নয়, ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বহু মূল্যবান খনিজেরও ভাণ্ডার রয়েছে সেখানে। রয়েছে বিপুল পরিমানে সোনা। পাশাপাশি, মাদুরো সরকারের রাশিয়া ও চিনের সঙ্গে ঘনিষ্টতা ওয়াশিংটনের কাছে বরাবরই অস্বস্তির।
২০২০ সাল থেকেই মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ তুলে আসছে আমেরিকা। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর তাঁকে বৈধ রাষ্ট্রনায়ক বলেই মানেনি ওয়াশিংটন। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ, গোপন অভিযান, সবই চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। শেষ পর্যন্ত নেওয়া হলো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ, যার পোশাকি নাম দেওয়া হলো ‘আইনের শাসন’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা’। সমালোচকদের মতে, এটি আদতে মাদক-বিরোধী অভিযান নয়, বরং সম্পদ ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই। এটি গণতন্ত্রের যুদ্ধ নয়, এটি আধিপত্যের যুদ্ধ। ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমের একাংশ একে আখ্যা দিয়েছে সম্পদকেন্দ্রিক নয়া সাম্রাজ্যবাদ। প্রশ্ন উঠছে, মাদক-যুদ্ধের নামে কি তবে লেখা হলো ক্ষমতার রাজনীতির আর এক অধ্যায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন বিশ্বরাজনীতির দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।
❤ Support Us






