- বি। দে । শ
- জুন ২৭, ২০২৬
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিতে মার্কিন হামলা, ভাঙনের মুখে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ?
পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবার উত্তেজনা বাড়ছে। হরমুজ প্রণালীতে পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। পাল্টা জবাব দিয়েছে ইরানও। হামলার প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। শনিবার সে দেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ফের অশান্তি সম্ভাবনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ঘাঁটিগুলি ইজরায়েলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হয়েছিল। সুইৎজারল্যান্ডে বসেছিল আমেরিকা ও ইরানের প্রতিনিধিদের বৈঠকও। উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘ কয়েক মাসের সংঘাতের ইতি টেনে হরমুজ় প্রণালীকে আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য স্বাভাবিক করে তোলা। কিন্তু সে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাঝেই নতুন করে সামরিক সংঘর্ষে জড়াল দু-দেশ। ফলে সদ্য স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (মউ)-এর ভবিষ্যৎ নিয়েই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
মার্কিন প্রশাসনের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার ওমান উপকূল ঘেঁষে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ ‘এভার লাভলি’-কে লক্ষ্য করে ড্রোন ছোড়ে ইরান। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, চারটি ড্রোন হামলার চেষ্টা হয়েছিল। তার মধ্যে একটি জাহাজের উপরের ডেকে আঘাত হানে, বাকি তিনটি মার্কিন বাহিনী ভূপাতিত করে। জাহাজ সংস্থা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো নাবিক আহত হননি। মূল ইঞ্জিন ও নেভিগেশন ব্যবস্থাও সচল। এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বলেন, ‘গতকাল তারা গুলি চালিয়েছে। চার বার হামলা করেছে। বিষয়টি আমার মোটেই পছন্দ হয়নি।’ তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, আমেরিকা পাল্টা আঘাত হানবে কি না, তখন তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর ছিল, ‘সময় হলেই জানতে পারবেন।’ এ ইঙ্গিতের কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় মার্কিন সামরিক অভিযান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ কেন্দ্র, ড্রোনের গুদাম এবং উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলিকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, অভিযানে এফ-৩৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার অভিযানে চারটি সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়। এর মধ্যে তিনটি ইরানের মূল ভূখণ্ডে এবং একটি পারস্য উপসাগরের কেশম দ্বীপে অবস্থিত। সেন্টকমের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের উপর হামলা করে ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত ভেঙেছে, আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। সে কারণেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
হামলার পরেই ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন করেছে। আমরা চুক্তি মেনে চলেছি। কিন্তু ওরা মানছে না। সহিংসতার জবাব সহিংসতার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।’ আলোচনার পথ খোলা থাকলেও বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মতো ঘটনাকে কোনো ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।’ অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের অভিযোগ পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান। ইরানের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে ওই পণ্যবাহী জাহাজে তারা কোনো হামলা চালায়নি। বরং অতীতে এই জলপথে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি ও অবরোধের সময় ওমান উপকূল সংলগ্ন অঞ্চলে একাধিক জাহাজে হামলার নজির রয়েছে। ইরানের বক্তব্য, এবারও আমেরিকাই শর্ত ভেঙে উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তেহরানের আরও দাবি, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ তাদের সার্বভৌম অধিকারের অংশ। তারা আবার ওই জলপথের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিকে আমেরিকার পাশে না দাঁড়ানোরও বার্তা দিয়েছে ইরান। ফলে গোটা অঞ্চলে নতুন করে কূটনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে। আমরা আমাদের জলসীমা পরিচালনার অধিকার প্রয়োগ করছি। এটিকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বলা যায় না।’ পরে মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় তিনি আরও অভিযোগ করেন, আলোচনা চলাকালীন আবারও ইরানে হামলা চালিয়ে আমেরিকা প্রমাণ করল, তারা আলোচনার নীতিতে বিশ্বাস করে না। মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে,। উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। যদিও সে হামলায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও মুখ খোলেনি মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর।
বিশ্লেষকদের মতে, দু-দেশের মধ্যে উত্তেজনার নেপথ্যে শুধু ড্রোন হামলাই নয়, রয়েছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনও। গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফার অন্তর্বর্তী সমঝোতা অনুযায়ী ৬০ দিনের জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের কাছ থেকে কোনো টোল বা অতিরিক্ত অর্থ না নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইরান ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, ওই সময়সীমা শেষ হলে আবারও শুল্ক আদায় শুরু হবে। তাঁর দাবি, সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র সমঝোতায় পৌঁছনোর স্বার্থে। অন্য দিকে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান তাঁকে আশ্বাস দিয়েছিল যে কোনো টোল, বিমার অতিরিক্ত খরচ বা অন্য কোনো চার্জ নেওয়া হবে না। সে প্রতিশ্রুতি ভাঙলে আলোচনাও ভেঙে যাবে বলে সতর্ক করেছিলেন তিনি।
হরমুজে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যও চাপে পড়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) ওই অঞ্চলে আটকে থাকা জাহাজগুলিকে সরিয়ে আনার অভিযান আপাতত স্থগিত রেখেছে। সংস্থার মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত অভিযান পুনরায় শুরু হবে না। এখনো প্রায় পাঁচশো জাহাজ ওই এলাকায় আটকে রয়েছে। গত কয়েক দিনে মাত্র ১১৫টি জাহাজ নিরাপদে সরে যেতে পেরেছে। সামুদ্রিক বিশ্লেষক সংস্থাগুলির মতে, যুদ্ধবিরতির পরে যে আস্থা ফিরছিল, সাম্প্রতিক হামলা তার উপর বড়ো ধাক্কা।
অন্যদিকে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটি ইজরায়েলে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বাহরিনে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন নৌঘাঁটি সংস্কারের পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে কুয়েত ও সৌদি আরবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি কমিয়ে আনা হতে পারে। সেগুলি ইজরায়েলে স্থানান্তর করা হবে।’
❤ Support Us








