Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জানুয়ারি ৮, ২০২৬

‘পশ্চিমঘাটে সূর্যাস্ত’! প্রয়াত খ্যাতিমান পরিবেশকর্মী, জীববিজ্ঞানী মাধব গাডগিল

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘পশ্চিমঘাটে সূর্যাস্ত’! প্রয়াত খ্যাতিমান পরিবেশকর্মী, জীববিজ্ঞানী মাধব গাডগিল

ভারতের পরিবেশ বিজ্ঞান ও সংরক্ষণ আন্দোলনের অগ্রদূত, পরিবেশকর্মী, জীববিজ্ঞানী মাধব গাডগিল প্রয়াত। বুধবার রাতে, পুণের তার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। দীর্ঘদিন বয়সজনিত নানা অসুখে ভুগে আসছিলেন তিনি। দীর্ঘ জীবনকালে পরিশ্রম এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে দেশের প্রকৃতি ও মানুষের জন্য অনন্য অবদান রেখেছেন তিনি। পরিবেশবিদ্যার জগতে তাঁর শূন্যতা কখনো পূরণ করা যাবে না। তাঁর অসামান্য গবেষণা, সতর্ক বার্তা এবং ‘গডগিল রিপোর্ট’-এর জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

১৯৪২ সালের ২৪ মে পুণেতে জন্ম গাডগিলের। জীববিজ্ঞান ও পরিবেশবিদ্যার ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষাগত পথচলা উজ্জ্বল। প্রাথমিক শিক্ষা পুণেতে সম্পন্ন করার পর, বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। তিনি ভারতের প্রথম জীববিজ্ঞানী হিসেবে ‘ম্যাথমেটিক্যাল ইকোলজি’-তে ডক্টরেট। দেশে ফিরে ১৯৭৩ সালে তিনি ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স’-এ যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে সেখানে ‘সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল সায়েন্সেস’ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর লেখা অগণিত গবেষণাপত্র ও বই আজও পরবর্তী প্রজন্মের বিজ্ঞানীদের জন্য অমূল্য সম্পদ হিসেবে কাজ করছে। ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম ঘাটের স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করেছেন।

২০১০ সালে পশ্চিম ঘাটের সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে গঠিত ‘ওয়েস্টার্ন ঘাটস ইকোলজি এক্সপার্ট প্যানেল’-এর প্রধান হিসেবে বিশদ রিপোর্ট তৈরি করেন। রিপোর্টে ঘাটের সংবেদনশীল অঞ্চলগুলোতে কোন ধরনের উন্নয়নমূলক কাজ বা শিল্পায়ন গ্রহণযোগ্য এবং কোনগুলো নিষিদ্ধ তা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক চাপের কারণে ওই রিপোর্ট পরে বিভিন্ন দক্ষিণী রাজ্যের সরকার বাতিল করে দেয়। গাডগিল বারবার সতর্ক করেছিলেন যে, উচ্ছৃঙ্খল নির্মাণ, খনন এবং শিল্পায়ন প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করবে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বিশেষ করে ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি করবে। ২০১৯ সালের পুতুমালা ভূমিধস এবং ২০২৪ সালের মেপ্পাদি ভূমিধস তাঁর সেই পূর্বাভাসকে বাস্তব প্রমাণ করেছে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, সংরক্ষণ এবং উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ অপরিহার্য, কোনো কাজই তাদের সম্মতি ছাড়া চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

গাডগিলের গবেষণা ক্ষেত্র ছিল পশ্চিমঘাটের মতোই বিস্তৃত। জনসংখ্যা জীববিজ্ঞান, সংরক্ষণ জীববিজ্ঞান, মানব-পরিবেশবিদ্যা এবং পরিবেশগত ইতিহাসে তাঁর অবদান বিপুল। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজের পাশাপাশি উত্তরের রাজ্যগুলিতে বৈচিত্রপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রথম ‘বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ প্রজেক্ট’-এ তার প্রস্তাব এবং ২০০৩ সালের ‘বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি অ্যাক্ট’ ও ২০০৬ সালের ‘ফরেস্ট রাইটস অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নেও তাঁর অবদানও স্বীকৃত। পরিবেশ রক্ষায় অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৮১ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০০৬ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে তিনি ‘টাইলার প্রাইজ ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যাচিভমেন্ট’-এর মতো মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেন। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি তাঁকে ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য আর্থ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ও একাডেমিক মহলে শোকের ছায়া নেমেছে। প্রাক্তন পরিবেশমন্ত্রী জয়রাম রমেশ শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘গাডগিল ছিলেন বিশাল জ্ঞানভান্ডার, অক্লান্ত গবেষক, মানুষ-মনস্ক শিক্ষক এবং সমাজ সচেতন নেতা। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রথাগত জ্ঞানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে তাঁর অবদান অনন্য। পশ্চিমঘাট সংরক্ষণ, সাইলেন্ট ভ্যালি আন্দোলন ও বস্তারের অরণ্য সংরক্ষণে তাঁর ভূমিকা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দিশারী হবে।’

গডগিলের জীবন দর্শন ছিল এক অনন্য সংমিশ্রণ আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রথাগত জ্ঞান। তিনি মানুষকে বোঝার ক্ষমতা, স্থানীয় জ্ঞানের গুরুত্ব এবং প্রকৃতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং দরিদ্র সম্প্রদায়ের উপর প্রভাব নিয়ে তার ব্যাখ্যা ছিল গভীর ও মানবিক। তিনি বারবার বলেছেন, যে সমস্ত প্রকল্প ধনী ও ক্ষমতাশালীদের স্বার্থে প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে, তার বোঝা সবচেয়ে বেশি দরিদ্রদের উপর পড়ে। চা-বাগান শ্রমিক, ছোট কৃষক, মৎসজীবী এবং বনের বাসিন্দারা সব সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। শুধু ‘থিরোরি’ নয়, গাডগিল নিজে সরাসরি মাঠে গিয়ে সমস্যা বুঝতেন। মেপ্পাদি ও পুতুমালা ভূমিধসের পর তিনি বলেছিলেন, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, তথ্য এবং আইনি সচেতনতা দরিদ্র সম্প্রদায়কে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিচ্ছে। চা-বাগান শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে স্থানের ব্যবস্থাপনা নিজ হাতে নিতে পারে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে তাদের জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে। তাঁর সেই আদর্শ, সতর্ক বার্তা এবং গবেষণার ফলাফল আগামী প্রজন্মকে পরিবেশ রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!