- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ১৮, ২০২৫
আট বছর পর প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে গতি, আগামীকাল থেকে শুরু ফর্মপূরণ। টেট নম্বরে বড়োসড়ো রদবদল
প্রায় আট বছরের দীর্ঘ স্থবিরতার পরে রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে। ২০১৭ সালের পর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ আর কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করলেও, চলতি বছরে অবশেষে সেই প্রক্রিয়াকে সামনে আনার প্রস্তুতি এবার অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর প্রাথমিক স্তরে ১৩,৪২১টি শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগের কথা ঘোষণা করেছিল পর্ষদ, কিন্তু আবেদনপত্র জমা নেওয়ার কাজ শুরু হয়নি এতদিন। প্রায় দেড় মাসের অপেক্ষার পর অবশেষে সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে চলেছে রাজ্য। জানা গিয়েছে, আগামী বুধবার, অর্থাৎ ১৯ নভেম্বর, অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে টেট উত্তীর্ণ প্রার্থীদের থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হবে। সরকার অনুমোদিত ও সরকারি পোষিত প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং জুনিয়র বেসিক স্কুলগুলির জন্যই এই সহকারী শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল ১৩ হাজারেরও বেশি শূন্যপদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এদিকে নিয়োগের আগেই বদলে গিয়েছে টেটের মূল্যায়ন কাঠামো। পুরনো খসড়া বিধিতে টেটের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র পাঁচ নম্বর। বহু চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষাবিদরাই অভিযোগ করতেন, এত কম নম্বর টেটকে গুরুত্বহীন করে দিচ্ছে। সেই অভিযোগেরই যেন প্রতিফলন ঘটল নতুন প্রস্তাবিত খসড়া বিধিতে। সেখানে টেটের নম্বর এক লাফে বেড়ে হয়েছে পঁচিশ। অর্থাৎ, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে টেটের গুরুত্ব এবার বহুগুণ বৃদ্ধি পেল। কিন্তু এই পরিবর্তনের পাশাপাশিই কমে গিয়েছে ডিএলএডের মূল্যায়ন। আগে ডিএলএডের ওজন ছিল পনেরো নম্বর, এখন তা নেমে হয়েছে পাঁচে। ফলে প্রশিক্ষণকে নয়, বরং যোগ্যতা যাচাইয়ের পরীক্ষাকে, অর্থাৎ টেটকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে পর্ষদ। শিক্ষা দফতরের দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক— তিন স্তর মিলিয়ে চলতি বছরের মধ্যেই প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে। দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘স্বচ্ছ এবং দ্রুত নিয়োগই এ বারের লক্ষ্য। বহু বছর ধরে জমে থাকা শূন্যপদ পূরণ না হলে স্কুলশিক্ষার মান বিঘ্নিত হচ্ছে।’
গত বৃহস্পতিবার, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে দেরি হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। সল্টলেকে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের দফতরের সামনে বিক্ষোভে সামিল হন ২০২২ সালের প্রাথমিক টেট উত্তীর্ণরা। তাঁদের চোখেমুখে হতাশা, অসহায়তা ও ক্ষোভ। অনেকের কথায়, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বচ্ছ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রত্যাশায় দিন গুনছিলেন। তবু বারবার আশ্বাস মিললেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরীক্ষা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হবার পর, বিক্ষোভকারী চাকরিপ্রার্থীরা অভিযগ তুলছেন, নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শুধু তাঁরাই নন, সুযোগ পাবেন ২০২৩ সালের টেট পাশ করা প্রার্থীরাও। এমনকি, ২০১৪ এবং ২০১৭ সালে টেট উত্তীর্ণ চাকরিপ্রার্থীরাও এ বার আবেদন করতে পারবেন। ফলে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে, এবং অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে শঙ্কা অনেকের।
সল্টলেকের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেউ কেউ জানিয়েছেন, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও তাঁরা চাকরির মুখ দেখেননি বহু বছর। পরিবার, সমাজ ও নিজের জীবনের দায় সামলে তাঁরা আজও শিক্ষকের পদ পাওয়ার আশায় অপেক্ষায়। এমন দৃশ্য দেখে স্পষ্ট, দীর্ঘদিনের অবহেলা ও প্রশাসনিক জটিলতার ভার তাঁদের কাঁধে এখন যেন আরও বেশি করে চাপ ফেলছে। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের তরফে এই বিক্ষোভ বা নতুন বিধি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও শিক্ষা মহলের মতে, নিয়োগের নড়াচড়া শুরু হওয়াই স্বস্তির খবর। টেটের গুরুত্ব বাড়ানো এবং পরিষ্কার নিয়ম তৈরি করলে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হবে, একথা বলছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের একাংশ। তবে একই সঙ্গে তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, নিয়োগের পথ দীর্ঘ। অতীতের ব্যাপক দুর্নীতির মেঘ আবারও ঘনীভূত হতে পারে। বহু বছরের দাবি, ক্ষোভ ও হতাশার আবরণ সরিয়ে সকলের জন্য ন্যায়সঙ্গত সুযোগ তৈরি করাই সরকারের কাছে সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ।
❤ Support Us







