Advertisement
  • বি। দে । শ
  • মার্চ ২৪, ২০২৬

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ঘিরে বাড়ছে ভ্রান্তি, ভুয়ো খবর নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগঠনের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ঘিরে বাড়ছে ভ্রান্তি, ভুয়ো খবর নিয়ে উদ্বেগ আন্তর্জাতিক সংবাদ সংগঠনের

সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বদলে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীর রাজনৈতিক সমীকরণ। কলকাতা জুড়ে স্লোগান উঠেছিল ‘তোমার নাম, আমার নাম ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম।’ বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও, ক্ষমতাধর আমেরিকাকে গেরিলা যুদ্ধে নাস্তানাবুদ করেছিল হো-চি মিনের অনুগামীরা। অবশেষে হার মানতে বাধ্য হয় ওয়াশিংটন। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। এখন ইতিহাসের দিকে তাকালে, সে যুদ্ধের নানান দিক খুঁজে পান আলোচকরা। তার অন্যতম ভিত্তি, সে সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রতিবেদন। আর এর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ ক্রমশ বেড়েছে, বেড়ে চলেছে।

গাজায় ইজরায়েলের ভয়াবহ হামলায় বিগত কয়েক বছরে ফিলিস্তিনি সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে নিহত হয়েছেন শতাধিক সংবাদকর্মী। এখন, যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত আবারও প্রশ্ন তুলছে খবরের কারিগরদের স্বাধীনতা, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে। ইরানে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । তেহরানের প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়া উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার ক্ষয়ক্ষতি চিত্রায়ণ নিষিদ্ধ, নির্দেশ অমান্য করায় ব্যাপক ধরপাকর চলছে। গাজায় সংবাদ পরিবেশনের ওপর দমন-পীড়নের পর, ইজরায়েলি সামরিক সেন্সরশিপ এখন ইরান ও লেবাননে চলমান দ্বিমুখী যুদ্ধে আরও কঠোর হয়েছে ।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছেন। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ যুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা সংবাদমাধ্যমকে ‘অসৎ ও ট্রাম্প-বিরোধী’ বলে আক্রমণ করেছেন। এর ফলে, দুনিয়ার কাছে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি তাৎক্ষণিকভাবে জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। যুদ্ধরত পক্ষগুলোর হাতে তথ্যের প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যুদ্ধে কবলে পড়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত,  বৈশ্বিক অস্থিরতা বাড়ছে, অথচ নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবে সাধারণ মানুষ ক্রমাগত বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস-এর মহাসচিব অ্যান্থনি বেলাঞ্জার বলেন, ‘ সংবাদ সংস্থাগুলোর উপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছে যুদ্ধবাজরা। নিজেদের মন গড়া বর্ণনা চাপিয়ে দিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করতে চাইছে তারা।’

এই সময়, তথ্যের প্রাচুর্যে অভূতপূর্ব। আর সেখানেই গভীর সমস্যার সূত্রপাত। তথ্য স্রোতে মার্কিন হস্তক্ষেপ, যুদ্ধের প্রকৃত বাস্তবতা ঢেকে রাখতে চাইছে। সত্য, অর্ধসত্য প্রোপাগাণ্ডা বিভ্রান্তি আর রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করবার কাজই করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এআই-নির্মিত ভিডিও ও ছবির সঙ্গে  বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

সম্প্রতি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৩৫ জনকে ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। কাতারে ৫০০-র বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছে ভিডিও ধারণ ও ছড়ানোর অভিযোগে। বাহরাইন ও কুয়েতেও একই ধরনের গ্রেফতার হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘গুজব, ভুয়ো তথ্য বা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে এমন কিছু শেয়ার করা নিষিদ্ধ।’ গালফ অঞ্চলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আগে থেকেই সীমিত ছিল, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নিষেধাজ্ঞা আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস । যদিও নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন — যেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থান গোপন রাখা বা ভুয়া তথ্য দমন করা। তবু বর্তমান ব্যবস্থা বৃহত্তর দমন-পীড়নের অংশ বলেই মনে হচ্ছে। প্রেস ফ্রিডম সূচকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান ২০০৭ সালে ছিল ৬৫তম, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ১৬৪তম স্থানে। কুয়েত ও বাহরাইনও একইভাবে নিচের দিকে নেমেছে ।

কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস-এর আঞ্চলিক পরিচালক সারা কুদাহ বলেছেন, ‘পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ অঞ্চলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার শেষ আশাটুকুও ধ্বংস করে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘এটি আধুনিক ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ যেখানে এতগুলো দেশ সরাসরি জড়িত। কোনো সরকারই এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল—মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা।’ অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতা বজায় রাখাও এর পেছনে বড়ো কারণ। দুবাইয়ে রেস্তোরাঁ, শপিং মল ও হোটেল খোলা থাকলেও, চাপা আতঙ্কের ছাপ সর্বত্র । তবুও বাস্তবতা পুরোপুরি ঢেকে রাখা সম্ভব নয়—দুবাই ও কুয়েতের বিমানবন্দরে আগুনের ধোঁয়া, ভবনের ক্ষয়ক্ষতি চোখে পড়ছে । ইরান, লেবানন ও অন্যান্য এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ। ইরানকে বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে দমনমূলক দেশগুলোর একটি বলা হয়।

অতীতে, যুদ্ধের আগে থেকেই বিদেশি সাংবাদিকদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হতো। স্থানীয় সাংবাদিকদেরও সংবেদনশীল প্রতিবেদন করলে গ্রেফতার হওয়ার ঝুঁকি থাকত। বর্তমানে ইন্টারনেট প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় তারা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না । ইজরায়েলেও সামরিক সেন্সরশিপ জারি রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার ওপর হামলার খবর প্রকাশ নিষিদ্ধ, এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার তথ্যও সীমিত করা হয়েছে । এ যুদ্ধে মূলত আকাশপথে হামলা চলছে, ফলে স্বাধীনভাবে রিপোর্টিংয়ের সুযোগ কমে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বাড়ছে। সরকারপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যমকে নয় ।

ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের চেয়ারম্যান সম্প্রচার মাধ্যমগুলোকে সতর্ক করে বলেছেন — তাদের সংবাদ পরিবেশন ‘সংশোধন’ না করলে লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়তে পারে। শতাব্দী ধরে প্রসারিত হওয়া সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন নানা দেশে সংকুচিত হচ্ছে। বিশেষ করে এই যুদ্ধ পরিস্থিত দেখিয়ে দিয়েছে, তথ্যের আধিক্যের যুগেও আসল সত্য জানাটা কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!