Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মার্চ ২, ২০২৬

অসম বিধানসভা ভোট নিয়ে কী ভাবছেন বাঙালিরা ?

প্রদীপ দত্ত রায়
অসম বিধানসভা ভোট নিয়ে কী ভাবছেন বাঙালিরা ?

দিশপুরের মসনদে আসীন যে কোনো প্রতিটি শাসক, প্রতিটি রাজনৈতিক দল অসমের বাঙালিদের চিরকাল ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত। বাঙালি গণতান্ত্রিক অধিকার নিজের থেকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেওয়ার পরিবর্তে কুযুক্তি তুলে ধরে তাদের প্রায়ই নিরাশ করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন ও রাজনৈতিক সংগঠন ভোটের প্রাক্কালে জোট বেঁধে প্রতিরোধের কথা বললেও এতে সিংহভাগ মানুষের সাড়া থাকে না। একারণে এ ধরনের জোট বিফল মনোরথ হয়ে স্তিমিত হয়ে যায়। বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় বিধানসভার আসন কমিয়ে দেওয়া, বিজয়ী বিধায়কদের মন্ত্রিসভা থেকে দূরে রাখা, ভিন্ন ধরনের আবেগ সৃষ্টি করে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভাজনের রেখা টেনে দিয়ে ঘোলা জল তৈরি করার ফন্দী। এতে নির্বিঘ্নে শিকার করার অছিলায় ব্যস্ত থাকেন শাসক দলের কর্তা ব্যক্তিরা। এটা যেমন কংগ্রেস আমলে ছিল, বিজেপি আমলেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। অনেক সময় জাতীয় আবেগের ধোয়া তুলে পশ্চাদপদ শ্রেণীকে বঞ্চিত করে রাখা হয়। তাই ভোটের আগে কিছু মানুষ কোন পথে হাঁটবেন, এ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। আর যাঁরা শেষ পর্যন্ত কোনও পথের দিশা না পান, তারা প্রবাহে গা ঢেলে দিয়ে অপছন্দের মানুষকেও ভোট বৈতরণী পার করতে সহায়তা করতে বাধ্য হন।
গণতন্ত্রে দলহীন রাজনীতি খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো নির্দল হয়তো বিজয়ী হয়ে যান, তাঁর পক্ষে ভোটদাতাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ করার সুযোগ থাকে না। এটা এক বাস্তব সত্য। অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো দলের প্রার্থীকেই ভোট দিতে বাধ্য হন। রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হলেও এ নিয়ে সরব ভূমিকা পালন করার মতো পরিস্থিতি সব সময় থাকে না। যাঁরা যুক্তি তুলে ধরে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে এগিয়ে আসেন, দলীয় অনুশাসনের নামে কণ্ঠ চেপে ধরা হয়।
বরাক উপত্যকার কথা ধরা যাক, এখানে বিধানসভার আসন ছিল ১৫ টি। জনসংখ্যা অনুপাতে এ আসনের সংখ্যা বেড়ে ১৮ টি হওয়ার কথা, তা না করে রাজ্য সরকারের কুট কৌশলে দুটি আসন কমিয়ে ১৩ টি করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রতিবাদ করলে মুখ্যমন্ত্রী সাফ বলে দেন, আসন দুটি তো রাজ্যের মধ্যেই রয়েছে। কাজেই এ নিয়ে এত হইচই করার কী আছে।
বিষয়টা হলো এ আসন দুটি যে অঞ্চলে বেড়েছে, সে অঞ্চলে বাঙালি ভোট প্রার্থীরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন না। প্রকারান্তরে বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্য নিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আর যে অঞ্চলে আসন সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, সেখানে জনসংখ্যার অনুপাত বরাক উপত্যকার তুলনায় অনেক কম। ইঙ্গিতটা খুবই স্পষ্ট। বরাকের কোনো নেতৃত্ব যাতে সফল হয়ে উঠতে না পারে সেজন্য একদিকে আসন সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হল, অন্যদিকে প্রার্থী চয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের মনোভাব গ্রহণ করা শাসকদলের নিহিত উদ্দেশ্যকে প্রতিফলিত করেছে। শাসক দলের সমর্থকরা এসব উপলব্ধি করতে পারলেও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাঁরা নীরব দর্শকের ভূমিকা গ্রহণ করতে বাধ্য। বিরোধী দলের যেসব নেতা এ বিষয়ে সরব হয়েছিলেন তাদেরও অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। একমাত্র দলীয় সংগঠনের বাইরের মানুষই এসব নিয়ে প্রতিবাদের পথ এখনো পরিহার করেননি। এ প্রতিবাদ শাসকদল গ্রাহ্য করেনি। কারণ,  ক্ষমতার মোহে তারা অন্ধ। যখন ক্ষমতা হারানোর ভয় তাদের চেপে ধরবে তখন বুঝতে পারবে এর পরিণতিটা খারাপের দিকে যাচ্ছে। বরাকের প্রতি যে অন্যায় করা হয়েছে সেটা বুঝতে পেরেও মানুষ অসহায় ভাবে যেন শাসকদলের কাছে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে।
বরাকের প্রতি বঞ্চনার ইতিহাসটা দীর্ঘকালের পুরনো। এ অঞ্চলে জোর করে অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বারবার চেষ্টা হয়েছে। ১৯৬০ সালের  ভাষা সার্কুলার জারির বিরুদ্ধে ৬১ সালে মে মাসে গর্জে উঠেছিল বরাকের জনতা। ভাষার অধিকার রক্ষায় রক্ত দিয়ে ইতিহাস রচনা করেন শহিদরা। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ৬১ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদের এখনো ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দেয়নি রাজ্য সরকার। ওই বছর শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার তদন্তের জন্য যে মেহরোত্রা কমিশন গঠন করা হয়েছিল এর রিপোর্ট আজ অব্দি প্রকাশ করা হয়নি। কমিশনের ওই রিপোর্ট প্রকাশ পেলে রাজ্য সরকারের গাফিলতি ধরা পড়ে যাবে তাই এত রাক ঢাক। সেই রিপোর্ট প্রকাশের পরিবর্তে বর্তমান সরকারের আমলে রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে ৬১ ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে খোলাখুলি ভাবে  জবাব দেন, সরকারি দস্তাবেজে ওই বছর পুলিশের গুলিতে রেলওয়ে স্টেশনে নিহতরা দুষ্কৃতি হিসেবেই চিহ্নিত। এটাই হলো রাজ্য সরকারের প্রকৃত মনোভাব। যে নিরীহ মানুষগুলো রাষ্ট্রের নিপীড়নের শিকার তাদের দুষ্কৃতি বলে অপবাদ দেওয়া এর চেয়ে নিকৃষ্ট মনোভাব আর কী হতে পারে। পূর্ববর্তী রাজ্য সরকারগুলির মতোই বর্তমান রাজ্য সরকারের  ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনীহা রয়েছে তার জ্বলন্ত প্রমাণ ৬১ গুলি চালানোর কমিশনের তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না করা। অথচ এই সরকারি নেলি গণহত্যার রিপোর্ট সদনে প্রকাশ করেছে। ভাষা শহিদ দিবসে গান্ধীবাগে শহিদ মিনারের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের মধ্য দিয়ে ভাষা শহিদদের স্বীকৃতি দেওয়া প্রমাণ করে না।  যারা ভাষা শহিদদের শহিদ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়, তাদের কাছে শিলচর রেলওয়ে স্টেশনের ভাষা শহিদ নামকরণ করার দাবিটি মর্যাদা লাভ করবে এটা আকাশকুসুম কল্পনার মত মনে হয়। অথচ রেলওয়ে স্টেশনের এই নামকরণের সঙ্গে লক্ষ লক্ষ বাঙালির আবেগ জড়িত রয়েছে। কেবল বাঙালি নয় বরাক উপত্যকার প্রতিটি জনগোষ্ঠীর এতে সায় রয়েছে,  কারণ ভাষা আন্দোলনে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিঃস্বার্থভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
স্বাধীনতার পর থেকেই অসমে বাংলাভাষীদের প্রতি যে আচরণ শুরু হয়, তা আজও বহমান। ভূমিপুত্র এবং বহিরাগত দুই শ্রেণিতে রাজ্যের মানুষকে বিভাজত করার চক্রান্ত এখনো সক্রিয়।  দেশ ভাগের পর শ্রীহট্টকে গণভোটের নামে প্রহসন করে পাকিস্তানে ঠেলে দেওয়া হয়। শ্রীহট্ট অঞ্চলের হিন্দু মানুষ নিরাপত্তার প্রশ্নে বাধ্য হয়েই অসমের অন্যান্য জেলাগুলিতে চলে আসেন। এসব মানুষজনকে হেনস্থা করার জন্যই রচিত হয় ষড়যন্ত্র। ভাষা ও শিক্ষার অধিকার হরণের মতো ষড়যন্ত্র হয়েছিল। যদিও প্রবল প্রতিরোধে তা ভেস্তে যায়। স্বাধীনতার কিছুকাল আগে অসমসহ গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। তখন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু অসমে এসে জননায়ক অরুন কুমার চন্দ, সতীন্দ্রমোহন দেব এবং বৈদ্যনাথ মুখার্জির সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়ে লিগ মন্ত্রিসভার পতন ঘটিয়ে গোপীনাথ বরদলৈর নেতৃত্বে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা গঠন করে দিয়েছিলেন। নেতাজি ওই উদ্যোগ না নিলে আজ গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত। এ কথাটা স্মরণ করে বাঙালির প্রতি যে ধরনের আচরণ করা উচিত, তা করা হয়নি। এটাই সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। বাঙালি মুসলিমদের সম্প্রতি মিঞা বলে তাদের গায়ে বাংলাদেশি তকমা সেটে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। ১৯৭১ সালের পর মুসলিমরা এরাজ্যে এসেছেন, এমন নথি পাওয়া কঠিন। যেসব মানুষকে বিদেশি সন্দেহে ট্রাইব্যুনালে দাঁড় করানো হচ্ছে, তারা পরবর্তীকালে হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্ট থেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে ছাড়া পাচ্ছেন। এরপরও এই জনগোষ্ঠীকে হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে হিন্দু ভোট ব্যাগ গড়ে তোলার যে প্রয়াস চালানো হচ্ছে, তা বাঙালি জাতিসত্তার কাছে একটা বিভ্রান্তিকর অবস্থান। যারা ধর্মের টোপ গিলে হিন্দু-মুসলমানে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা আখেরে নিজেদের জাতিসত্তার পায়ে কুড়োল মারছেন। সেটা বুঝতে পারছেন না। আর শাসকরা এটাই চায়।
বরাক উপত্যকার যুব সমাজ এখন দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। এ উপত্যকায় রেজিস্ট্রিকৃত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। কিন্তু এই উপত্যকায় বেকারদের চাকরি-বাকরির রাস্তা একপ্রকার বন্ধ। দেখা যাচ্ছে, বরাক উপত্যকায় তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে স্থানীয়রা প্রাধান্য পাচ্ছেন না। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে প্রার্থী এনে নিয়োগ করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বেকাররা বেকার থেকে যাচ্ছে। এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও মেধাবীদের লক্ষ্য থাকে কলকাতা, দিল্লি, চেন্নাই ,হায়দ্রাবাদ, মুম্বাই ,বেঙ্গালুরু ইত্যাদি স্থানে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বা অন্যান্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখা পড়া করতে চলে যাওয়া। এর কারণ একটাই, ছাত্র-ছাত্রীরা যখন তাদের শিক্ষা গ্রহণ শেষ করে সেখানেই তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়ে যায়। বরাক উপত্যকায় থাকলে তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ মিলবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। একারণে অনেক ছাত্র ছাত্রী বরাকে থাকার ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। এ ব্যাপারে সরকার  সম্পূর্ণ উদাসীন। বরাক উপত্যকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কিছু কিছু ক্যাম্পাস সিলেকশনের মাধ্যমে চাকরি হয়, তবে সেসব চাকরি রাজ্যের বাইরে। আমাদের মনে হয় রাজ্য সরকার বরাক উপত্যকাকে অসমের অঙ্গই মনে করে না। বরাক উপত্যকায় ৪৫ লক্ষ মানুষের বসবাস। এ জনসংখ্যার জন্য সরকারি ক্ষেত্রে উপযুক্ত সুযোগ সুবিধা নেই এটা আমরা বুঝতে পারছি। সরকার যখন কোন চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, তখন দেখা যায় তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণীর পদের জন্য মাস্টার ডিগ্রি পাস ছেলেমেয়েরা আবেদন করছে, এটা খুবই দুঃখের ব্যাপার। আবেদন করলে কী হবে ? চাকরি তো মিলছে না। তাই বেকারত্বের বোঝা নিয়ে বছরের পর বছর কাটাতে হচ্ছে। অনেকে পরিবার প্রতিপালনের জন্য এই অটো অথবা ই রিক্সা চালানো রাস্তার পাশে ফুটপাতে দোকানদারি করা ইত্যাদি কায়িক শ্রমের কাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন।
চলতি বছরের অসম বিধানসভা নির্বাচনে শাসক দল বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সারা রাজ্য জুড়েই সংগঠন চাঙ্গা করতে নেমে পড়েছে কংগ্রেস। কিন্তু দলের একের পর এক নেতা পদত্যাগ করে বেরিয়ে যাওয়ায় দলের অভ্যন্তরীণ সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে। বদর উদ্দিন আজমল এর নেতৃত্বাধীন এ আই ইউ ডি এফ দলের ভিত এখন অনেকটা নড়বড়ে। শাসকদলের বিরুদ্ধে প্রান্তিক, গ্রামীন বাঙালির ভোট সংগঠিত করার কাজটি সহজ নয়। বাঙালি অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মের নামে বিভাজিত হয়ে কোন পক্ষ নেবেন, তা নিশ্চিত নয়। তাঁদের অরাজনৈতিক সংগঠনগুলি বাঙালি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেও, সেটা আদৌ কতটা ফলপ্রসু হবে এ নিয়ে সন্দেহ বিস্তর আছে। বাঙালি সংগঠনগুলির হুংকার শেষ পর্যন্ত পর্বতের মুসিক প্রসবের মতো হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা হচ্ছে।

  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!