Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুলাই ২০, ২০২৬

উত্তর, উত্তর-পূর্বে বর্ষার তাণ্ডব, ধস-বন্যায় বিপর্যস্ত পাঁচ রাজ্য: মৃত অন্তত ২০, চারধাম ও অমরনাথ যাত্রায় কড়া বিধিনিষেধ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উত্তর, উত্তর-পূর্বে বর্ষার তাণ্ডব, ধস-বন্যায় বিপর্যস্ত পাঁচ রাজ্য: মৃত অন্তত ২০, চারধাম ও অমরনাথ যাত্রায় কড়া বিধিনিষেধ

উত্তরাখণ্ডে পাহাড় ভাঙছেজম্মু ও কাশ্মীরে আকস্মিক বন্যা গ্রাস করেছে জনপদহিমাচলে লাল সতর্কতায় বন্ধ স্কুল-কলেজঅসম ও অরুণাচলে নদীর জল ঢুকে পড়েছে গ্রাম-শহরে। সক্রিয় মৌসুমি অক্ষরেখা এবং একাধিক ঘূর্ণাবর্তের জেরে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে বর্ষা ফের ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সোমবার, বৃষ্টি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে ভারতীয় আবহাওয়া দফতর। ইতিমধ্যেই প্রবল বৃষ্টিভূমিধসবজ্রপাত ও আকস্মিক বন্যাজনিত ঘটনায় অসম, অরুণাচল, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডজম্মু-কাশ্মীর,হিমাচল, উত্তরাখণ্ড মিলিয়ে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি উত্তরাখণ্ডে। অবিরাম বৃষ্টিতে রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে জনজীবন  বিপর্যস্ত। দেরাদুনহরিদ্বারনৈনিতালউধম সিং নগরের মতো সমতল জেলা থেকে শুরু করে উত্তরকাশীচামোলিরুদ্রপ্রয়াগের পাহাড়ি অঞ্চল— সর্বত্রই ধসপাথর গড়িয়ে পড়া আর রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। বহু গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরুদ্ধ হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চারধাম যাত্রাকে ঘিরেও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে প্রশাসন। উত্তরকাশী জেলায় রাত ৮টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের মতেভারী বৃষ্টিভূমিধস ও ঘন কুয়াশার কারণে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় এ সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি থাকে। পর্যটক ও ট্রেকারদের প্রতিকূল আবহাওয়ায় পাহাড়ি পথে না যাওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ইতিমধ্যেই চারধাম যাত্রীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাগুলির উপর নজরদারি বাড়িয়েছে, যাত্রা শুরুর আগে আবহাওয়া ও রাস্তার অবস্থা যাচাই করে নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।

কেদারনাথ যাত্রাপথও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গৌরীকুণ্ড-কেদারনাথ ট্রেক রুটের চিয়ার বাসার কাছে পাহাড় থেকে পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসায় শুক্রবার সকাল থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘোড়া ও খচ্চরের পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়। যদিও সতর্কতার সঙ্গে সরু একটি পথ দিয়ে পথচারীদের যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অন্য দিকে চামোলি জেলায় জ্যোতির্মঠ-মালারি জাতীয় সড়কেও ধস নামায় দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ ছিল। উত্তরাখণ্ডে বজ্রপাতেও প্রাণহানির খবর মিলেছে। হরিদ্বার জেলায় বজ্রাঘাতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি ভূমিধসের জেরে দুটি জাতীয় সড়ক-সহ অন্তত ৮৪টি রাস্তা বন্ধ হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে, জাতীয় আবহাওয়া দফতর দেরাদুননৈনিতালচম্পাবতউধম সিং নগরতেহরিউত্তরকাশীহরিদ্বারপৌরি এবং বাগেশ্বর-সহ একাধিক জেলায় কমলা সতর্কতা জারি করেছে। আগামী ২৩ জুলাই পর্যন্ত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিবজ্রবিদ্যুৎ, কোথাও কোথাও অত্যন্ত ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। ২১ জুলাই দেহরাদুন ও বাগেশ্বরে  ২২ ও ২৩ জুলাই উত্তরকাশীরুদ্রপ্রয়াগচামোলিপিথোরাগড় ও বাগেশ্বরে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া দফতর। উত্তরাখণ্ডের পাশাপাশি হিমাচল প্রদেশেও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে। কাংড়াচম্বামান্ডিকুল্লু ও সিরমৌর জেলায় অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কাংড়া জেলার সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি স্কুলকলেজকারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রঅঙ্গনওয়াড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ২০ ও ২১ জুলাই বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। নির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। কিন্নৌর জেলার সাংলা-চিতকুল রুটে রানি কান্দার কাছে তুবার নাল্লায় আকস্মিক বন্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন ভারতীয় সেনা এবং ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশএর উঁচু অবস্থানের পোস্টগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের দাবিএ রাস্তাটি সীমান্তে সেনা ও রসদ পরিবহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

হিমাচলের মুখ্যসচিব কমলেশ কুমার পন্ত সমস্ত জেলার প্রশাসকদের ২৪ ঘণ্টা জরুরি অপারেশন সেন্টার সচল রাখতেসম্ভাব্য ভূমিধসআকস্মিক বন্যা ও মেঘভাঙা বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পুলিশদমকল ও অ্যাম্বুল্যান্সকে সর্বক্ষণ প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির খবর এসেছে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে। প্রবল বৃষ্টির জেরে পুঞ্চ ও রাজৌরিতে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে পুঞ্চ জেলার সুরানকোট তহসিলে। প্রশাসনের আশঙ্কাকয়েক জন এখনো নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। রবিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণের পর কাশ্মীরের বনাঞ্চলে একাধিক মেঘভাঙা বৃষ্টির ঘটনাও ঘটেছে। পরিস্থিতির জেরে পাহেলগাম ও বালতালদুই পথ দিয়েই অমরনাথ যাত্রা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতেও বর্ষার দাপট ক্রমশ বাড়ছে। অসমে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। সাতটি জেলায় ৫৭ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে অসম রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্। চারাইদেওধেমাজি ও ডিব্রুগড় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ইতিমধ্যেই চলতি বছরে বন্যাজনিত মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫-এ পৌঁছেছে। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেনপরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনা ও ভারতীয় বায়ুসেনাকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। উচ্চ অসমের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে চার জন মন্ত্রীকে পাঠানো হয়েছে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ তদারকির জন্য। বর্তমানে ১৪টি ত্রাণ শিবিরে বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। রাজ্যের ২৯৮টি গ্রাম প্লাবিতপ্রায় ৩,৮৭৫ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৩৭ হাজারেরও বেশি গবাদি পশু ও পোলট্রি বন্যার কবলে পড়েছে। অসমের পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশেও নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। পূর্ব সিয়াং ও কামলে জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় একাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নিম্ন দিবাং ভ্যালির দীফু নাল্লায় জলের স্রোতে কয়েকজন শ্রমিক আটকে পড়েছেন। প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে। চলতি বর্ষায় অরুণাচলে এ পর্যন্ত  জনের মৃত্যু হয়েছেআহত ২৯ জন এবং প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ৮০৬টি বাড়ি১৯২টি রাস্তা৩২টি সেতু৩০টি কালভার্ট২৬৫টি পানীয় জলের প্রকল্প১৫৬টি বিদ্যুৎ লাইন এবং ২২৪টি বিদ্যুতের খুঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কৃষি ও উদ্যান পালনের মিলিয়ে ৭৩৩ হেক্টরেরও বেশি জমির ক্ষতি হয়েছে।

নাগাল্যান্ডের মোন জেলায় আকস্মিক বন্যায়  জনের মৃত্যু হয়েছে। বহু বাড়িঘর ভেসে গিয়েছেধসে বন্ধ হয়ে গিয়েছে একাধিক সড়ক। প্রশাসনের আশঙ্কাধ্বংসস্তূপের নীচে আরও কয়েক জন আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে। এদিকে এই দুর্যোগপূর্ব পরিস্থিতিতে আবহাওয়া দফতর জানিয়েছেআগামী ছয় থেকে সাত দিন উত্তরপূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে সক্রিয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। উত্তরাখণ্ডজম্মু-কাশ্মীরহিমাচল প্রদেশঅসমমেঘালয়নাগাল্যান্ডমণিপুরমিজোরামত্রিপুরা এবং উপ-হিমালয় পশ্চিমবঙ্গে কোথাও কোথাও অত্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতেমৌসুমি অক্ষরেখার উত্তর দিকে সরে যাওয়া  উত্তর পাঞ্জাববিহার-ঝাড়খণ্ডমধ্যপ্রদেশঅন্ধ্রপ্রদেশ ও অসমের উপর একাধিক উচ্চস্তরের ঘূর্ণাবর্ত সক্রিয় থাকায় আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর— দুদিক থেকেই বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প উত্তর ভারতে প্রবেশ করছে। সে কারণেই একসঙ্গে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে। প্রশাসনের আবেদনঅপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়িয়ে চলতে হবেপাহাড়ি ঢালনদী ও নালার ধারে না যেতে হবে এবং সরকারি নির্দেশিকা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবেকারণ আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!