Advertisement
  • দে । শ
  • আগস্ট ১১, ২০২৬

ডাস্টবিন কাঁধে ২০০ কিমি পথ ! আবর্জনার বিরুদ্ধে পাহাড়ে ৮ যুবকের অভিনব অভিযান

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ডাস্টবিন কাঁধে ২০০ কিমি পথ ! আবর্জনার বিরুদ্ধে পাহাড়ে ৮ যুবকের অভিনব অভিযান

পাহাড়ে বেড়াতে এসে বোতলের জল শেষ হয়েছে। খাবারের প্যাকেটটিও খালি। এ বারহাতের আবর্জনাটা কি রাস্তার ধারেকোনো ভিউপয়েন্টে কিংবা জঙ্গলের কোণে ফেলে দেওয়া হবেনা কি ডাস্টবিন খুঁজে পাওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রাখা হবেএই সহজ প্রশ্নটিই পর্যটক এবং পাহাড়বাসীর সামনে তুলে ধরতে এ বার প্রায় ২০০ কিলোমিটার হাঁটাছে ৮ যুবক। সঙ্গে তাঁদের অদ্ভুত সঙ্গী’— একটি ডাস্টবিন!

গত ৭ গস্ট কালিম্পংয়ের ভারত-ভুটান সীমান্তের কাছে টোডে-টাংটা থেকে শুরু হয়েছে তাঁদের পদযাত্রা। গন্তব্য দার্জিলিংয়ের চৌরাস্তা। পাহাড়ি পথে হাঁটার পাশাপাশি ডাস্টবিনটি বয়ে নিয়ে চলছেন তাঁরা। পরিবেশ সচেতনার তাঁদের এই যাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে ক্লিন হিলস ওয়াক। ১৪ গস্ট দার্জিলিং পৌঁছনোর কথা তাঁদের। এ উদ্যোগের নেতৃত্বে রয়েছেন দেখো দার্জিলিং’-এর প্রতিষ্ঠাতা মিগমা গির্মে শেরপা। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত তাঁর কয়েক জন বন্ধুও রয়েছেন এ দলে। পর্যটকদের কাছ থেকে পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ এবং নিজেদের পর্যবেক্ষণ থেকেই এ উদ্যোগের ভাবনা বলে জানিয়েছেন শেরপা।

বার্তাটিও খুব সোজা। শেরপার আহ্বান, ‘ডাস্টবিন ব্যবহার করুন। আর ডাস্টবিন না পেলেযতক্ষণ না ডাস্টবিন পাচ্ছেন ততক্ষণ নিজের আবর্জনা নিজের কাছেই রাখুন।’ শুধু পথে হাঁটা নয়। যাত্রাপথে বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দাপড়ুয়া আর পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা বলছেন ওই আট যুবক। তাঁদের বোঝানো হচ্ছেপাহাড়ের সৌন্দর্য বাঁচিয়ে রাখতে শুধু প্রশাসনের উপর নির্ভর করলে হবে নাপর্যটক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদেরও নিজেদের দায়িত্ব বুঝতে হবে। সোমবার১০ গস্টদলটি পৌঁছেছে কালিম্পংয়ের ডেলোতে। সেখান থেকে আরও পথ বাকি। প্রায় ২০০ কিলোমিটার পেরিয়ে দার্জিলিং পৌঁছবেন তাঁরা।

দার্জিলিং বা কালিম্পংয়ের মতো চেনা পাহাড়ি শহরে এখন পর্যটনের সীমা আটকে নেই। সামাজিক মাধ্যমে নতুন নতুন গন্তব্যের ছবি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যটকের পা পড়ছে প্রত্যন্ত গ্রামপাহাড়ি রাস্তাভিউপয়েন্ট আর ছোটো ছোট জনপদে। ফলে এক দিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছেঅন্য দিকে তেমনই বাড়ছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপ। গত কয়েক বছরে পাহাড় জুড়ে ২ হাজারেরও বেশি হোমস্টে তৈরি হয়েছে। পর্যটনের পরিধি পৌঁছে গিয়েছে এমন বহু এলাকায়যেখানে কয়েক বছর আগেও নিয়মিত পর্যটকের দেখা মিলত না। পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছেকিন্তু তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সর্বত্র বর্জ্য সংগ্রহ ও নিষ্পত্তির পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। শেরপার বক্তব্যএই জায়গাটিই তাঁদের প্রচারের মূল লক্ষ্য। আট জনের একটি দল পাহাড়ের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো বিরাট সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। কিন্তু মানুষকে অন্তত এটুকু মনে করিয়ে দেওয়া সম্ভবহাতে থাকা প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের মোড়কটি যেখানে-সেখানে ফেলে দেওয়া কোনো সমাধান নয়।

মিগমা গির্মে শেরপা বলেন, ‘আমরা ছোটো একটি দল। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়গুলি পঞ্চায়েত এবং পুরসভাগুলিকেই দেখতে হবে। তবে ডাস্টবিন ব্যবহার করাআবর্জনা না ছড়ানো এবং দৃশ্যমান নোংরা কমানোর মতো সহজ বিষয়গুলিতে আমরা অবশ্যই সচেতনতা তৈরি করতে পারি।’ দার্জিলিং পাহাড়ে আবর্জনার সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় প্রশাসনপরিবেশকর্মী এবং বিভিন্ন সংগঠন এই সমস্যা নিয়ে সরব হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দার্জিলিং পুরসভার তরফে স্থানীয় বাসিন্দা আর পর্যটকদের এক বার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, থার্মোকল ব্যবহার না করার আবেদন জানানো হয়েছিল। পাহাড়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র টাইগার হিলে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য জমার বিষয়টিও সামনে এসেছিল। ওই এলাকাকে প্লাস্টিকমুক্ত করার দাবিও উঠেছিল।

তার আগে ২০১৮ সালে টাইগার হিলে সাফাই অভিযান চালিয়েছিল স্ক্যাভেঞ্জার’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী। সেখানে সংগৃহীত বর্জ্য আলাদা করে হিসাব করা হয়েছিল। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের কোন কোন ব্র্যান্ডের পণ্যতা চিহ্নিত করারও চেষ্টা হয়েছিল। একই সময়ে পাহাড়ের বিভিন্ন হোমস্টে নিয়েও প্লাস্টিক-বিরোধী উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। হিমালয়ান হোমস্টে ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর উদ্যোগে দার্জিলিংকার্শিয়াংমিরিকলামাহাটা, ঘুমের প্রায় ২৫০টি হোমস্টে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর অঙ্গীকার করেছিল। এক বার ব্যবহারযোগ্য কাপ কিংবা বোতলবন্দি জলের পরিবর্তে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছিল। পাহাড়ের প্লাস্টিক বর্জ্য নিকাশি নালা আটকে দেওয়ার পাশাপাশি নদী এবং পাহাড়ি ঝোরায় মিশে পরিবেশের ক্ষতি করতে পারেএ আশঙ্কার কথাও তখন বলা হয়েছিল।

পরিচ্ছন্নতা নিয়ে পাহাড়ের সমস্যা গত বছরও নতুন করে আলোচনায় এসেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ব্রিটিশ ট্রাভেল ভ্লগার অ্যালেক্স ওয়ান্ডার্স দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের মধ্যবর্তী একটি ভিউপয়েন্টের ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন। সেখানে ডাস্টবিনের কাছেই ছড়িয়ে থাকা আবর্জনা দেখিয়ে পর্যটকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও কেন তার আশপাশে আবর্জনা পড়ে থাকবেসে প্রশ্ন ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় বিতর্ক। শুধু দার্জিলিং নয়দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যটকদের নাগরিক দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। এ জায়গাতেই ক্লিন হিলস ওয়াক’-এর উদ্যোগের সঙ্গে বৃহত্তর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পার্থক্য রয়েছে। রাস্তার ধারে পড়ে থাকা প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের প্যাকেট কুড়িয়ে নিলে কোনো জায়গা সাময়িক ভাবে পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু তাতে বর্জ্য সংগ্রহবাছাইপরিবহণপুনর্ব্যবহারপ্রক্রিয়াকরণ, শেষ পর্যন্ত তা কোথায় ফেলা হবে— সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর মেলে না।

এই বৃহত্তর সমস্যার মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে নেসলে ইন্ডিয়া দার্জিলিংয়ে প্রজেক্ট হিলদাড়ি’ সম্প্রসারণের কথা ঘোষণা করেছিল। পর্যটনকেন্দ্রগুলিতে কঠিন  প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় ভাবে উপযোগী ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল ওই প্রকল্পের লক্ষ্য। প্ল্যান ফাউন্ডেশন এবং প্রযুক্তিগত সহযোগী রেসিটি ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিলে সেই কাজ এগোনোর কথা জানানো হয়েছিল। ক্লিন হিলস ওয়াক’ নিশ্চিতভাবেই সে ব্যবস্থার বিকল্প নয়। বরং তার আগে আরও একটি প্রশ্ন মানুষের সামনে রাখতে চাইছে— পর্যটকের হাতে থাকা বোতল বা মোড়কটির ভিতরের জিনিস শেষ হওয়ার পর সেটির ঠিকানা কোথায়রাস্তার ধারে নয়। পাহাড়ের ঢালে নয়। জঙ্গলের মধ্যে নয়। কোনও সুন্দর ভিউপয়েন্টের পাশে তো নয়ই।

পরিচ্ছন্ন পাহাড়ের সঙ্গে শুধু পরিবেশের প্রশ্নই নয়জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতিও। দার্জিলিং পাহাড়ের হাজার হাজার মানুষের জীবিকা পর্যটনকে ঘিরে। হোটেলহোমস্টেরেস্তরাঁ থেকে গাড়িচালকগাইডপোর্টারদোকানদার— বিভিন্ন পেশার মানুষ পর্যটকের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ এই পদযাত্রায় শামিল যুবকদের মতেপর্যটকেরা এখন দার্জিলিংয়ের সঙ্গে সিকিমনেপাল এবং ভুটানের মতো পর্যটনকেন্দ্রের তুলনা করছেন। পরিচ্ছন্নতা নিয়ে খারাপ অভিজ্ঞতা হলে তার প্রভাব পড়তে পারে পাহাড়ের পর্যটন-ভাবমূর্তিতেও। সমস্যার আরও একটি দিক রয়েছে। কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম বা পাহাড়ি ভিউপয়েন্ট সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে সময় লাগে না। কিন্তু পর্যটকের ঢল নামার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি হয়ে যায় না। ফলে পর্যটন বাড়ে দ্রুতপরিকাঠামো পিছিয়ে থাকে। যে পাহাড়ের সৌন্দর্য পর্যটককে টেনে আনেসে সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত পর্যটকের ফেলে যাওয়া আবর্জনায় ঢাকা পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে।

গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর পর্যটন দফতর এ পদযাত্রায় সহায়তা করছে। আগামী ১৪ গস্ট দার্জিলিং পৌঁছনোর কথা আট যুবকের। তাঁদের পৌঁছনোর সঙ্গে মিলছে স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে আয়োজিত হতে চলা ১০ কিলোমিটারের নাইট রান’-এর কর্মসূচিও। দার্জিলিংয়ে প্রথম নাইট রান’-এ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারেরও বেশি মানুষের যোগ দেওয়ার কথা। তবে শুধু এ পদযাত্রাই নয়পাহাড়ে হাঁটার সংস্কৃতি এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতেও কাজ করছেন শেরপা ও তাঁর দল। পর্যটকদের জন্য পাহাড়ে ১৬টি নির্দিষ্ট হাঁটার পথ চিহ্নিত করেছেন তাঁরা। পাশাপাশি কয়েক মাস অন্তর স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে বিনামূল্যে কমিউনিটি ওয়াকও আয়োজন করা হয়।

গত মাসে দার্জিলিং থেকে চটকপুর পর্যন্ত প্রায় ১৬ কিলোমিটারের এমনই একটি হাঁটায় ১৫০-এরও বেশি স্থানীয় বাসিন্দা অংশ নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন মিগমা। তবে আট যুবক ডাস্টবিন টেনে দার্জিলিংয়ের চৌরাস্তা পৌঁছে গেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে না। বরং তার পরেই শুরু হবে আসল পরীক্ষা।  পর্যটক কি ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত নিজের আবর্জনা নিজের সঙ্গে রাখবেনপাহাড়ের প্রত্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে কি পর্যাপ্ত বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি হবেপর্যটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি বাড়বে স্থানীয় পরিকাঠামো ?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!