- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৪
মাটি ব্রতের আখ্যান। পর্ব ৪২
।। শুকনাকান্ড ।।
দুই বোন
স্নেহলতা পতি পরম গুরু বিধান মানে না।
এদিকে এই নবজনপল্লীর নারীকূলের সঙ্গে তার সম্পর্কটি আটোঁ নয়। তারা উচ্চকোটির – চলনে, বলনে, ফ্য্যাশনেও। ওদের চলতায় চিকনবাহার, মেজাজে স্বর্গের অপ্সরাই যেন, উপরভদ্রতায় মিহি নবনীত। ওদের কথার কেতা আলাদা, ‘শ’ জিভে লাগায় জোরে। হাসে অদরকারে। বিনা কারণেও। তিনটি শব্দে কথা সাজালে দুটো ইংরাজি ভাষায় গোঁজ দেয়।
স্নেহলতা নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে। তার জিভে এখনও খুলনে যশুরে টান। শুনে ওঁরা মুখ চেপে হাসে। হঠাৎ দেখা হলে কুশলবিনিম্য় হয় না বললে অনৃতভাষন হয়ে যাবে। তবে এও মনে হয়, ওঁরা চমকে ঠাসা, ভিতরটা মিথ্যেই। ওর ভালো লাগে না। কেন এই বীতরাগ, সবটা নিজেরও জানা নেই।
নীলাম্বর খুঁতখুঁত করে। তার বউকে এখানকার শিক্ষিত পড়শিরা গেঁয়ো ভাবছে। আনকালচারড়। হীণতা জাগে তার। নিজের প্রতিষ্ঠাটাই প্রশ্নচিহ্নের আওতায় এসে যায়। চেষ্টা করে স্ত্রীকে সহবত শেখাতে। পারে না। দুঃখ পায়। রাগ হয়। স্নেহ যেন কেম্ন আচরণ করছে। কিছু বলতে পারে না। ভয় লাগে। আস্তে আস্তে দুজন যেন দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। এক বাড়িতে, এক শয্যায় থেকেও।
পড়শিরা একে অপরকে ঠারে ঠোরে।
– মিসেস আচারিয়া একটু প্রাউড ফিল করেন।
আরেকজন পাদপূরন করে দিল, – নো, আই থিংক। উনি ইন ফ্য্যাক্ট, শেকি। আ-শ-শো-লে, – মুখ টেপে সে, – হোমিও বেটার হাফ তো ! পসিবলি …।
বাকিরা ঠোঁটে চোখে সমর্থন জানায়।
বিষ্যুদবার। সাধন বাড়িতে। আয়েশ করতে এখন মন চায়। বয়সের দাবি বোধ হয়, এমনই। রমাকে ঘরের ভিতর থেকে ডেকে এনে বারান্দায় বসেছে। টুকিটাকি কথা বলছিল।
রমার কাজও এখন অনেক কমেছে। একটু ফুরসত মেলে। ফর্মা সেপে থান কেটে দিয়ে দিয়েছে লোকদের। ওঁরা, ওদের ঘরে, মেশিনে বুনে জমা দিয়ে যাবে পোশাক, প্রাপ্যটুকু নিয়ে যাবে নগদ। রমার কাছে আছে লম্বা খাতা, ওঁরা সই করবে। কেউ সাক্ষী নিয়ে টিপ সই। গোটাদশেক এমন লোক আছে রমার।
‘লোক’ শব্দটিই বলা হয়। সবিতার বউদিদির কাছ থেকে শেখা। জপের মন্ত্রের মতো।
সবিতা সরকার বলতেন – মালিক মজুর সম্পর্কে কখনও যেতে নেই। এতে কাজই শুধু পণ্ড হয় না। মানুষে মানুষে সম্পর্কটাও বিষিয়ে যায়। একে অপরকে মনে মনে ঘৃণা করে।
যুবকদের মধ্যেও বেশ কয়েকজন গোপালের হেম লেডিজ গারমেন্টসের সেলসম্যান হয়েছে। প্যাক করা মাল বাজারে জোগান দিয়ে আসে, নতুন অর্ডার নেয়, টাকা তুলে আনে। ওরা নামেই সেলসম্যান। কেননা ওদেরও স্বাধীন ব্যবসা। যারা মাল কিনতে পারে, তারা কিনে নিয়ে যায়। লাভটা ওদের পাওনা। যাদের হাতে পুঁজি নেই, তারা কমিশনে কাজ করে।
রমা ওদের বলে – কমিশনের টাকা দাঁতে দাঁত লাগাইয়া জমাও। সোমসার তো চাইয়াই থাকবো। তারপর পুরাপুরি কারবারি হইয়া যাও। তোমাগো কাকায়রে সামলাইতে কি কম ম্যাহন্নত গেছে !
সাবেকি ব্লাউজ, সায়া, সেমিজের আয় চন্দ্র রেডিমেডের। ওদিকে হালফ্যাশনের কুর্তা, কামিজ, টু পিস, টিপটপ এসব থেকে রোজগার হেম লেডিজের। গোপাল সাহেবের কড়া ফরমান।
কথাটি মনে পড়ায় রমা হেসে উঠলো – তোমার পুলায় সাহেব হইছে। তোমারে আমারে নাকি সকালে সইনধ্যায় সেলাম কড়তে লাগবো। শয়তান কইছে। চাপুড় দাও তো পিঠে অর !
ঠিক সেইসময় রিকশাটি এসে দাঁড়িয়েছিল বেড়াদরজার মুখে। আগন্তুককে চেনার উপায় ছিল না। বয়স হয়েছে। যেমন সাধারণ নিয়মে হয়। মহিলারা ভাটির নদীর মতো দেহাকৃতি অর্জন করে। সে চেহারাও পরিপূণতায় সুন্দর লাগে চোখে। আগন্তুক মহিলাটি সে রকম নয়। বেশ শীণ। দরজা ঠেলে ঢুকে পড়েছে সে, সাধনকে প্রণাম করতে চায়।
শিউরে উঠলো সাধন – একী ! কী করতিছেন !
– চেনতি পারতিছেন না, সাধন দাদা? আমি স্নেহ, মুক্তোকান্দির স্নেহ।
রমা অবাক চোখে চেয়ে চেয়ে দেখছিল তখন, এই সেই স্নেহলতা ! হেমশশীর মুখে কতবার নাম শুনেছে, রূপের প্রশংসা শুনে নিজের জন্য লজ্জা লাগতো ওর ! রমা এখন আয়তচোখ, স্থিরবিন্দুতে নিবিষ্ট। সাধনও বলেছে কথায় কথায়।
সাধন কি একটু কঠিন হল ! বললো – নীলুদাদা কই?
– আমি একা আসিছি।
– সে জানে?
– তার জানার দরকার নেই।
চকিতে যেন রমার নিদ্রা ভাঙলো, গোঁয়ার স্বামীকে সামলাতে হবে। লোকটাকে নিয়ে খুব মুশকিল। দেরি করে না সে, বললো – আসো, দিদি, আসো। একটু খাঁড়াও দেখি, নমস্কারখান করি।
স্নেহলতা, তখন, রমাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে, – উয়ের দরকের নাই, দিদি। আমি সম্পর্কে বড়ো, বয়সিতে ছোটোই হবো। – রমার এগিয়ে দেয়া হোগলা মাদুরে বসলো স্নেহ। তারপর ধীরে বলে
– আমি যদি তোমাগের কাছে আসি, তোমরা কি রাগ করবা, দিদি?
– হায়, ঠাকুর ! কি যে কও, তুমি। আগে জিরাইয়া লও, তারপর কথা শুনুম।
সেই প্রথমদিন। তারপর থেকে হরহপ্তার একদিন আসেই স্নেহলতা। বৃহস্পতিবারটাই পছন্দ। ভাসুরঠাকুর বাড়িতে থাকে। হেমশশীর ঘরে মাদুর বিছিয়ে দুই জা বসে থাকে, হেমশশীর কথা বলে, চন্দ্রমোহনের কথা হয়। দুজনেই চোখের জল ফেলে, নীরবে। রাত নটা বেজে যায়। সেই রিকশাটি আসে, স্নেহকে নিয়ে মুন লজে ফেরে।
রমা সাধন সে বাড়িতে যায় না। কোনওদিন। স্নেহলতাও কখনো যেতে আবদার করেনি। করে না।
কথায় কথায় ক্যাম্পের কথা উঠলে ফুরোতে চায় না। দিনক্ষয়ের ভৈরবী রাগে বাঁধা গান। স্নেহর চোখ গলে যায়। শোনে চন্দ্রমোহনের মনোরোগের শিকার হওয়ার কথা। অসহায় হেমশশী কীভাবে আগলে রাখতেন তাঁকে।
রমার হাতটিকে টেনে বুকে নেয় স্নেহ, বলে উঠলো – দিদি, মা বাবা দুজনেই পোর্বোজন্মের পোণে ভাগ্য করি আসিছিলেন। তাই তোমায় নতুন বিটার বউ পায়িছিলেন। আমার পুড়াকপাল। একদেশিতে থাকি ভাগেরে সিবা করতিই পারলেম না।
রমা প্রবোধ দেয় – বাবা যখন সগগে যান, তখন তোমার দাদার লাগে আমার বিয়া হয় নাই। জানতামও না যে এইঘরের বউ হমু। বাবায়রে দেখছি। চরণ ছুঁইয়া পুনামও করছি। তিনি ডাইন হাতে আমার মাথায় হাত রাইখ্য্ আর্শীববাদ করছেন। বিড়বিড় কইররা কী মন্তর কইছেন তখন, বিদ্যা নাই – বুদ্ধি নাই, কেমনে বুঝুম ! পরে মায়ের কাছে জানছি ওইয়া দ্যাবভাষা। উনি যে দ্যাবতাই ছিলেন দিদি। এইটুকানি তারে পাইছি।
– তবু তো পায়িছো।
– মায়েরে পাইছি, ঠিক কথা। আমি তারে খুড়িমা কইয়া ডাকি নাই, দিদি। একদিন মন উথনাইয়া তারে “মা” ডাকলো। কিন্তু তারেও আমি স্যাবা করি নাই। করতে পারলাম না। করতে দিলেন না। চাড়াল পুতের মা হইছিলেন। চাড়াল বউয়ের ছুয়াছুয়িতে তার দ্যাহে কালি লাগে নাই। কিন্তুক পরাণ ভইরা স্যাবা করতে দিলেন না মায়, দিদি, – রমা তখন ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।
স্নেহলতাও। স্মৃতি রোমন্থিত হয়ে দুই জায়ের দুটি ভিন্ন সংখ্যার, কিন্তু একই আনন রচিত হয়, অশ্রুধারা সে মুখেরই।
রমার কাছে এলে স্নেহলতার মুখের অর্গল খুলে যায়। মুন লজে নিজের বাড়িতে সে প্রায় নির্বাক।
♦—♦♦—♦♦—♦♦—♦
ক্রমশ…
আগের পর্ব পড়ুন: পর্ব ৪১
অনিবার্য কারনে এসপ্তাহে ভোর ভোয়ি-র ২১ পর্ব প্রকাশিত হলো না । আগামী সপ্তাহ থেকে প্রকাশিত হবে নিয়মিত
❤ Support Us








