- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- এপ্রিল ২০, ২০২৫
পথ ভুবনের দিনলিপি । পর্ব এক
নাটকে তাঁকে ঘিরে থাকে চেনা ভুবনের অচেনা, না বলা ছায়াচিত্র । গল্প উপন্যাসেও অভিনব তাঁর অভিব্যক্তি । এবার শুরু হল ময়ূরীর পথ আর পথ মানুষকে দেখার নকশা । প্রতি সপ্তাহে, রোববার নতুন পথের খোঁজে বেরুবেন তিনি
দুপুরে আজ খুব গুমোট ছিল ৷ রোদ গায়ে একেবারে ঘা করে দিচ্ছিল ৷ প্রতিদিন যখন নেয়ারাবাগানের রিহার্সাল রুমে গিয়ে পৌঁছই, টিনের চাল ভেদ করে কাঠের মেঝেতে রোদ আঁকি কাটে ৷ পাড়াটি আমার খুব প্রিয় ৷ এখানের মানুষ শ্রেণীসচেতন নয় ৷ আপন ভুলে পরের কথা শোনে ৷ পাড়াটিতে বস্তি আছে, ফ্ল্যাট বাড়ি আছে ৷ আবার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের পৈতৃক বাড়িও আছে কয়েকটা ৷ ফ্ল্যাট বস্তি ও পুরোনো বাড়ির মানুষগুলো এখনো এখানে এ ওর বাড়ি যায়, রাস্তায় জটলা করে গল্প করে ৷ বেশ লাগে দেখতে ৷ অনেক সময় রিহার্সাল রুমের পিছনের জানলায় দাঁড়িয়ে থাকি ৷ এক পাল্লার কাচ ভাঙা ৷ ভাঙা কাচের মধ্যে দিয়ে বাড়ি গাছ ঝাপসা লাগে ৷ এ পাড়ায় মানুষের বসতি ও বাসস্থান বিভিন্ন উচ্চতা বহন করেও লোক-চরাচর হয়ে থাকে ৷ এর বারান্দা শেষ হয় তার ছাদে ..তার ছাদের লোহার সিঁড়ি পৌঁছোয় হয়ত আরেক বাড়ির নতুন বউয়ের শোবার ঘরে ৷ প্রতি বাড়ির কার্নিশে কত পায়রা ! কালো সাদা ! তারা ভাদ্রের হঠাৎ রোদ হঠাৎ বৃষ্টি মেখে চমচম করে ৷ বাড়ির আলসে অনুযায়ী তাদের বাসস্থানও উঁচু নিচু হয়ে যায় ৷ তবে মানুষের মতো কালোরা কেবল নীচতলাতে থাকে না ৷ ঠিক উল্টোদিকে তিনতলা বাড়ির ছাদে সার বাঁধা কালো পায়রা হাসে খলখল ৷ রংচটা সবুজ জানালায় সেকেলে লোহার শিক ৷ ঝড় উঠলে জানলা খোলাপড়ার শব্দ পাই বটে তবে জানলায় লোক দেখিনি কখনো ৷ পাশাপাশি দুটো ঘরের একটায় মরাআলোর টিউব আরেকটায় একালের উজ্জ্বল টিউব ৷ আলো আর প্রাণ -এরও এতো ভেদ, এত মিল ! আমি শুধু খুঁজে মরি ৷ হয়ত একলা দাঁড়িয়ে থাকা সুপুরি গাছ ..জলের ট্যাংক কিংবা সেন্ট মেরিজ স্কুলের চূড়াটা ঠিক আমারই মতো করে ভেদে মিল দেখে আনন্দ করে ওঠে !
আজ রিহার্সাল যাওয়ার পথে খিদে পেল ৷ পাড়ায় ঢোকার মুখে ছোট্ট একটা চিড়ে মুড়ির দোকান ৷ বাদাম, সেদ্ধ ছোলা, কঠিন ছোলা, মুড়ি মাখার আচার, নকুল দানা, ভাজা নিমকি– কী নেই সেখানে ! আড়ম্বরহীন দোকানের প্রতিটি বোয়েমে দোকানির যত্ন ৷ এর মধ্যে একদিন খুব ছোট সাইজের তালবড়ার প্যাকেট দেখেছিলাম ৷ কিনতে গিয়েও কিনিনি৷ সাইজ এতো ছোট বড়াগুলোর ৷
বাচ্চা আঁক কষে শুধু সংখ্যা বোঝে ! পরিমাণ আর আদত মূল্য বুঝতে অনেক দেরী হয় মানুষের ! নয় জীবনরেখার শেষ দাঁড়িতে গিয়ে বোঝে নতুবা বুঝল কিনা তাও বুঝতে পারে না
দশ বড়া মিলবে তিরিশ টাকায় ! দোকানিকে বলেওছিলাম– সাইজ বড় করে দাম নাহয় একটু বেশী রাখুন ! এতো তালের পুঁট বলে মনে হচ্ছে ! তালের গাছে পেতেছি লুডোর বোর্ড !
দোকানির উত্তর ছিল বড়ার থেকেও মিষ্টি– দিদি সবাই অতো দামের বড়া কিনতে পারে না ৷ স্টেশনের বাচ্চাগুলো আসে ৷ তিরিশ টাকায় দশ বড়া কিনে লাইন ধরে ছোটে ৷
শুনে কিছু উত্তর আসেনি ৷ সত্যি তো ! বাচ্চা আঁক কষে শুধু সংখ্যা বোঝে ! পরিমাণ আর আদত মূল্য বুঝতে অনেক দেরি হয় মানুষের ! নয় জীবনরেখার শেষ দাঁড়িতে গিয়ে বোঝে নতুবা বুঝল কিনা তাও বুঝতে পারে না ৷
আজ চিড়ে বাদাম কিনতে গিয়ে দেখি, একটা নাইলন শাড়ি পরা ভদ্রমহিলা মুড়িমাখা নিচ্ছেন ৷ সাতের দশকের মায়েরা এমন শাড়ি পরে বেলা বারোটার শেষ বাজারে ঘোরাঘুরি করতেন৷হাত কাটা ব্লাউজ, উশখো চুল, কাঁধে একটা স্পঞ্জ বের হওয়া ভ্যানিটি৷ মাথায় সামান্য গণ্ডগোল, কথাবার্তা অসংলগ্ন ৷ দশটাকার মুড়ি কিনবেন, তাতে সব আইটেম মিশিয়ে দিতে হবে ৷ মহিলা সব আইটেম আগেই আলাদা আলাদা ঠোঙায় নিয়ে নিয়েছেন.. মুড়ির আর টাকা নেই৷ নকুলদানা আর আচার দুইই নিয়েছেন ৷ সাদা নকুলে শুকনো তেঁতুল লেবড়ে ! খবরের কাগজের ঠোঙায় অহি নকুলের ঝগড়া বেঁধেছে ৷ দোকানে বেশ ভিড় তখন ৷ দোকানি খুব শান্ত হাতে বড় ঠোঙায় আগে তিনটাকার মুড়ি নিয়ে বললেন, মাসি আগে মুড়ি দেখো ! পেট ভরবে এতে?
তিনটাকায় অত মুড়ি দেখে পাগলিনীর চোখ উজ্জ্বল ৷ মেচেতা পড়া গালে সূর্যের স্বাভাবিক আলো ঝলমল করছে৷ চানাচুর বাদাম নকুলদানা সব কিছু দিয়ে মুড়ি মেখে দিয়েছেন দোকানী ৷ সবকিছুই আছে, একটু একটু করে ! পাগলিনী ভুল বকা ছেড়ে মুড়িতে মন দিয়েছে ৷ দাম মিটিয়ে চলেছে হনহন ৷ পিছন থেকে দোকানি ডাকলে –
মাসি দুটাকা নিয়ে যাও ৷
নাইলন শাড়ির পা দৌড়ে এল ৷ প্রশ্ন না করে দুটাকা নিয়ে চলে গেল ৷
আমি বললাম– দশ টাকাই তো হল !
– তা হল ৷ তবে ও পাগল মানুষ ৷ কে জানে সংসার করে খুচরো জমাতে পারে কিনা !
আমি আর বলিনি, একদিন দুটাকা দিয়ে ওর সারাবছরের খুচরো পুরোবেন আপনি !
মদ্দ মেয়ের খুচরো কথায় ঢুকে পড়লে গোটা ট্যাকার কথকতা ছোট হয়ে যায় ! স্কুলে দড়ি টানাটানির খেলায় কখনো জিততে পারিনি !
পাগলিনীর আমার সবদিকে বুদ্ধি কম হলেও সাজগোজের জরুরি বিষয়টি খেয়াল রেখেছে ! স্লিভলেস পরেছে বলে বগলের চুল নিপিস করে উড়িয়ে দিয়েছে ৷
ভরা পুকুরে পড়ন্ত বৈকাল !
ও বউ …
♦·♦–♦·♦♦·♦–♦·♦
ক্রমশ..
❤ Support Us








