- গল্প
- মে ৩, ২০২২
হন্যমান
যূথিকা নানা অঙ্ক মেলাতে চায়, আগে পরের কারণ হাতড়ায় । অঙ্গীরার গলার সিলভারের চোকারটার দিকে চোখ পড়ে তার, চোখ পড়ে শাড়ির আড়ালে ওর টানটান শরীরটার দিকে।
চিত্র: চিত্তরঞ্জন কুন্ডু
বয়স বাড়লে শরীর ভারী হয়ে আসে। জীবন নিরাপত্তা চায়। চেনা জীবন ছাড়তে নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করতে হয়। কিন্তু সে নিজের কাজে এত দক্ষ হয়ে ওঠে যে যে-কোনো হঠাৎ পাওয়া কাজকে অনায়াসে সামলে নিতে পারে সেই ভদ্রলোকের মতো যার বাবাকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে চলেছিল আর সে চলেছিল নিজের বাইকটাতে কখনো তার পরে, কখনো তার সঙ্গে সঙ্গে। ছাড়ার ঘণ্টা দুয়েক আগে তার ডাক্তারের সঙ্গে যা যা কথাবার্তা হয়েছিল তাতে সে বুঝেছিল এরপর ভর্তি করতে হলে আর ফিরবে না তার বাবা। তাই সে মাথায়-মনে এমন ঘেঁটে ছিল যে পিছনে ঝুলতে থাকা তার স্ত্রীর হেলমেটটা লকগেট ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে যখন পড়ে যায় সে লক্ষই করে না। পথচারীরা দেখতে পায়। বাইক দাঁড় করিয়ে তুলে দেয় তার হাতে। পরে সে তার স্ত্রীকে বলেছিল – ‘চোদ্দ বছর ধরে বাইক চালিয়ে এখন আর সচেতন থাকতে হয় না, রাস্তাটা একটু খেয়াল রাখলেই হয়। বাকিটা অভ্যাস।’ যে-কোনো প্রতিষ্ঠান (বিশেষত তা যদি হয় বেসরকারি) যেন এমনই কর্মীকে চায়। কারণ এঁরা কাজটা দক্ষতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে সময়মতো করেন।
কিন্তু বিগত কিছু বছর ধরে নতুন একটা খেলা শুরু হয়েছে। নীরব, নিষ্ঠুর, অশালীন ষড়যন্ত্রের মতো সে আয়োজন। দক্ষতা, বয়স এবং তার তুল্যমূল্যে বেতন কাঠামো তালে তালে মেলে না। কোম্পানি আরও মুনাফা চায়। আর ব্যয় কমাতে চায় আরও বেশি। তাতে যতই তাদের বেআবরু, লোভী, বর্বর দেখাক না কেন, তারা উঁচু কালো কাঁচের গাড়িতে দামি পারফিউম মেখে দ্রুত মিলিয়ে যায়। পরে থাকে ব্রততী, অদ্রিজা, মধুমিতা, দেবিকারা অসংখ্য বলতে চাওয়া কথা নিয়ে ঠান্ডা মিটিং রুমটাতে। ওরা সবাই একই বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত। ওদের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে অথবা পঞ্চাশের কাছাকাছি। ওদের দেখার চোখ, বোঝানোর ক্ষমতা, কর্ম দক্ষতা ঈর্ষনীয়। তবু যূথিকা বোঝে না কেন কমলিনীকে ওরা হারালো। ও আর কমলিনী এগারো বছর একসঙ্গে এক স্কুলে পড়াচ্ছে। ওদেরকে বাচ্চারা, তাদের অভিভাবকরা বরাবরই পছন্দের তালিকায় রেখেছে। বছর খানেক আগে যখন মালিকানা বদল নিয়ে এ তল্লাটে অভিভাবক আর গণমাধ্যম দামাল হাওয়া তুলেছিল, তখন এইসব পুরনো শিক্ষিকা শিক্ষকদের থাকার প্রতিশ্রুতি পেয়েই অভিভাবকরা শান্ত হয়েছিলেন। ‘পড়াশুনাটা এখানে ভালোই হয়’ –এমন একটা বার্তাও স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বেশ প্রচলিত। তার আধার এই যূথিকা, কমলিনীরা। তবু রদবদলের সেই অস্থিরতা কমে আসতেই অভ্যন্তরীণ সুনামি শুরু হলো এ বছরে বসন্তের শুরুতেই। আগের শিক্ষাবর্ষ শেষ করল যে দেড়শোর অধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা তাদের মধ্যে জনা পাঁচেককে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন, জনা তিনেককে সপ্তম দিন…। তারপর বিরতি ছিল একমাসের। এরপর বাংলা নতুন বছরের প্রথম মাসটার শুরুতেই বাড়ি পাঠানো হলো তিন দিনে আটজনকে।

চিত্র: চিত্তরঞ্জন কুন্ডু
সারাদিন পরে আড়াইটে নাগাদ টিফিনটা খুলে বসে যূথিকা। তখন ক্লান্ত শরীর আর মাথা জুড়ে আসে নানা ভাবনা। সে নানা অঙ্ক মেলাতে চায়, আগে পরের কারণ হাতড়ায়। যারা গেল তাদের বয়সগুলো মনে করতে চায়, মনে করতে চায় তাদের আগে কতবার বোর্ডরুমে ডাকা হয়েছিল সেই পরিসংখ্যাটা, কতবার কী কী বিষয়ে নাম করে প্রকাশ্য মিটিংয়ের মাঝে অপমান করা হয়েছিল সে কথাও ভাবে। এ বিষয়ে ওর স্মরণশক্তি তীব্র। ওর মুখ দেখেই মধুমিতা বোঝে। মুদ্রাদোষের মতো একটা কথা মধুমিতা বারবার বলে। আজও সেই মুহূর্তে বলতে ভোলে না। যূথিকার উল্টোদিকে নিজের চেয়ারটাতে বসে মধুমিতা আজ আরও একবার উচ্চারণ করে সে কথা – ‘আসলে আমাদের বয়সটাও তো কম নয়। এ বয়সে কে চাকরি দেবে চট করে?’ যূথিকার মাথার গঠনে একটা কোনো গুণের বাড়তি উপস্থিতি আছে। যার ফলে ও কোনো দুর্ঘটনা, অপমান, সমস্যাকে সহজ ভাবে নিতে পারে না। দিনরাত তাই নিয়ে ভাবে। বরের সঙ্গে ভুলভাল বিষয়ে ঝগড়া করে, ছেলে এবং বাড়ির কুকুর গাব্বুস ওই দিনমানে অতিরিক্ত বকা খায়।
ওরা সব নবীন, ওরা সব তাজা ছেলেমেয়ের দল। ওরা এখন সর্বত্র দরকারি, আকর্ষণীয়, মধ্যমণি। ওদের দেখে ছাত্রছাত্রীরা ছটফট করে, বিদ্যালয় প্রধান ভরসা করে, পরিচালন সমিতি পরিকল্পনা করে। এই উপস্থিতির ম্যাজিকটা যূথিকার ছিল বলেই ও বুঝতে পারে সেটার জাদু কোথায় যেন কমতে শুরু করেছে।
আজ মোটেও সে মধুমিতার এই একান্ত আপন সংলাপটি শুনতে চাইছিল না। এতে সে ভেতরে ভেতরে দুর্বলতা বোধ করে। অঙ্গীরার গলার সিলভারের চোকারটার দিকে চোখ পড়ে তার, চোখ পড়ে শাড়ির আড়ালে ওর টানটান শরীরটার দিকে। মনে হয় সব মিলিয়ে অঙ্গীরাকে বড়ো চোখে পড়ছে। ওর বয়স যূথিকার থেকে অন্তত দশ বছর কম। অঙ্গীরার মতো এমনই সুন্দর সাত-আট জন যুবকযুবতী ওদের স্টাফ রুমেই বসে। ওরা সবাই কখনো কখনো দারুণ আড্ডা জমায়। যা তেমন গোপন কিছু নয়। আড়াল, আবডাল, কানাঘুষো তাতে নেই, তবু যূথিকার মনে হয় সেখানে ও নিজে, ব্রততী, অদ্রিজা, মধুমিতা, দেবিকারা যেন ব্রাত্য। সামিল হলেও মনে হয় শিং ভেঙে বাছুরের দলে জোড় করে ঢুকেছে ওরা। ওরা সব নবীন, ওরা সব তাজা ছেলেমেয়ের দল। ওরা এখন সর্বত্র দরকারি, আকর্ষণীয়, মধ্যমণি। ওদের দেখে ছাত্রছাত্রীরা ছটফট করে, বিদ্যালয় প্রধান ভরসা করে, পরিচালন সমিতি পরিকল্পনা করে। এই উপস্থিতির ম্যাজিকটা যূথিকার ছিল বলেই ও বুঝতে পারে সেটার জাদু কোথায় যেন কমতে শুরু করেছে। চলবে না বেশি দিন আর। আর সেটাই যেন কীভাবে মালিক পক্ষ টের পেয়ে গেছে। তাই একে একে জাদু হারানো বুড়ো বুড়িদের সরিয়ে দেওয়া চলছে। …এ যূথিকা কী ভাবছে? নাকি এমন করে ভাবাটা আসলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া? যে জনা পনেরোকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য সে এমন ভাবছে না তো? কিন্তু তারা সবাই তো চল্লিশের কোঠা ছুঁইছুঁই ছিল না। যূথিকার এও মনে হয় দীর্ঘ বাইশ বছরের শিক্ষিকা জীবনে তার অভিজ্ঞতা যেমন বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে না হলেও বেতনও বেড়েছে বেশ খানিক। তাই কী তাকেও তাড়ানো হতে পারে? তার পরিবর্তে তার থেকে কম বেতনের কোনো যুবক কিংবা যুবতীকে বেছে নেওয়া হবে যাকে ইন্টারভিউ নেবে সে নিজেই। তারপর সে নিয়ে যখন একটু অহংকার ছলকাবে তার হৃদয়ে তখনই শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা বাতাস নেমে আসবে কমলিনীর কথাটা মনে পড়ে। কমলিনীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল গত পরশু সকালে। এও বলা হয়েছিল তোমার পরিবর্তে যিনি আসছেন তিনি বাইরে অপেক্ষারত। কমলিনী যূথিকাকে বলেছে ‘যে দাঁড়িয়ে ছিল তার বয়স চব্বিশের বেশি হবে না জানিস’।
হয়তো যূথিকা এত দেউলেপনা করত না। আজ থেকে বছর পাঁচেক আগেও ওর নিজেকে নিয়ে চরম বিশ্বাস ছিল। কিন্তু গত দু’বছরে সাতটা-আটটা স্কুলে আবেদন করেও একটাও ডাক পায়নি সে। কারণ মন ভরাতে অনেক কিছু থাকলেও সে সেসব ভাবতে পারে না। তার তখনই মধুমিতার সংলাপটা মনে পড়ে যায় — ‘আমাদের বয়সটাও তো কম নয়। এ বয়সে কে চট্ করে চাকরি দেবে?’ এসব ভাবনা চিন্তার ক্রমের মাঝেই কখন যেন যূথিকার টিফিনটা শেষ হয়েছে। শেষ শসার টুকরোটা মুখে দিতেই চোখে পড়ে মোবাইলটাতে একটা নোটিফিকেশন এল। খুলতেই দেখলো অধ্যক্ষের ঘর থেকে এসেছে। ইংরেজিতে। যার তরজমা করলে দাঁড়ায় – ‘যূথিকা স্কুল থেকে আজ বেরনোর আগে বোর্ড রুমে দেখা করে যাবে’।
গত পরশু, যে দিন কমলিনীকে চলে যেতে বলা হয়েছিল সেদিন যূথিকার ক্লাস নাইনের বিজ্ঞান ক্লাসে উপাধ্যক্ষা এবং বোর্ড রুমের এক সদস্য ঢুকে ছিলেন। টানা তিরিশ মিনিট ছিলেন তাঁরা। ওর ক্লাসটা রেকর্ডও করা হয়।
♦–♦♦–♦♦–♦
লেখক পরিচিতি: স্কটিশ চার্চ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী শাশ্বতী এই মুহূর্তে দিল্লি পাবলিক স্কুলে শিক্ষিকার পদে কর্মরতা। পাশাপাশি নিয়মিত লেখালেখি ও কয়েকটি পত্রপত্রিকা ও ওয়েব ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত আছেন। নিয়মিত থিয়েটার দেখা, সিনেমা দেখা ও তার সম্পর্কে চর্চা তাঁর উৎসাহের বিষয়। একমাত্র প্রকাশিত বই: স্থানীয় সংবাদ; এটি একটি গল্প সংকলন। তিনি বিশ্বাস করেন এই নীল গ্রহের প্রতিটি মানুষ তাঁর অনন্যতা নিয়ে বাঁচার অধিকারী হবে এবং প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক পদক্ষেপ নেবে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য।
চিত্রি পরিচিতি: চিত্তরঞ্জন কুন্ডু বারাসাত আকাদেমি অফ কালচারের ছাত্র। বাঁকুড়ার বাসিন্দা
গল্পের সমস্ত চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই, কেউ যদি মিল খুঁজে পান তাহলে তা অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয় ।
❤ Support Us









