Advertisement
  • গল্প
  • মে ৩, ২০২২

পাতান শেখের দুনিয়াদারি

পাতান নিজেকে নবী রসুলের খাস উম্মত ভাবে। সে যা করে সবই নাকি রসুলের সুন্নত।

সৌরভ হোসেন
পাতান শেখের দুনিয়াদারি

চিত্র: সার্থক দাস

আজও ‘সালাম’ ফেরার সময়েই ভুলটা করল পাতান। তিন রাকাত ফরজ নামাজকে চার রাকাত বলে ‘সালাম’ না ফিরেই উঠে দাঁড়াল। ভাগে দেওয়া জমির পাট কেন আধমন কম দিল আমানত? ফসল উঠলেই কম দেওয়া অভ্যেস হয়ে যাচ্ছে বাহিঞ্চতের। ওর হারাম খেয়ে খেয়ে পেট ভরে না? যখন কাছ থেকে জমি কেড়ে নেব তখন বুঝবে পেটের ভাত জোগাড় করা কত ঠাপের কাজ। বলে কি না এবার খরা গেল, ফসল ভালো হয়নি, আধমন খানিক কম নাও! এ বছর খরা সে বছর বন্যা, এ বছর ভালো ফুল আসেনি, সে বছর সব পাতান হয়ে গেছে, ফসল উঠলেই এসব বাহনা করতে শুরু করে বেটা! বলি, ভালো আর হবে কবে? পাতান দুনিয়া ছাড়লে পরে হবে? প্রথম ‘সিজদাহ’ই যেতেই কথাগুলো মাথা খপ করে ধরেছিল পাতানের। তারপর নামাজ যত এগিয়েছে তত কথাগুলো কাঁঠালের আঠার মতো থেবড়ে লেগে নামাজটাকে কাদা ঘাটা ঘেঁটে দিল। পরে ‘সুন্নত’ এবং ‘নফল’ নামাজেও ব্যাপারটা পিছু ছাড়ল না। এমনকি তসবিহ গোনার সময়ও আমানতের ফসল কম দেওয়ার ঘটনাটা তসবিহর দানায় দানায় দাঁত বসাল। এসব আজ নতুন নয় পাতানের। আইবুড়ো বয়সে নামাজে দাঁড়ালেই পাশের বাড়ির কিয়ামত শেখের দোপ হয়ে ওঠা বিটি ফেরদৌসির শরীরটা ছ্যাঁত করে ধরত। মুখে বিড়বিড় করত দোয়া-কলমা আর খুই খুই মনটা ছু করে চলে যেত ফেরদৌসির কাছে। সেখানে কখনও খেলত ছোঁয়াছুঁয়ি কখনও কাটত সাঁতার কখনও কখনও ঝুপ করে ডুবও মারত পাতান। সেসব না হয় যৌবনের দোষ। কিন্তু এখন তো সেসব নেই? এখন পাতানের যৌবন মজে যাওয়া চৈত্রের বিল। না আছে জল না আছে জলের ঢেউ। ইমাম হুজুর কোরানের আয়াত টেনে সাফ বলে দিয়েছেন, নামাজের ভেতর দুনিয়াদারি ঢুকে যাওয়া মানে শয়তান ঢুকে যাওয়া। ও নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। আর ইমাম হুজুরের সেই কথার ফাঁকে ফচকে ছলিমুদ্দি ঠেস মারা কথাটা বলে দিয়েছে, ‘যার হাত থেকে একটা কানাকড়িও বের হয় না সে কী করে দুনিয়াদারি ছাড়বে? কবরে যাওয়ার সময়ও যদি জেগে ওঠে, বলবে, পাটের দর বাড়ল নাকি রে?’ পাতান যখন হজ্ব করতে গিয়েছিল তখন আরব থেকে ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল, দেশে পাটের দর বাড়ল কি না। সেই থেকে লোকে সুযোগ পেলেই ‘পাটের দর’এর খোঁচাটা দেয়। সবাই ‘পরকাল’ ‘পরকাল’ করে ‘ইহকাল’কে ‘ধুত্তরি’ করে দিল আর পাতান ‘ইহকাল’কেই দ্বীন-দুনিয়া আলাম-কলাম করে থাকল! এত ‘দুনিয়া’ ‘দুনিয়া’ করলে নামাজের ভেতর ‘দুনিয়া’ ঢুকবে না তো ঘোড়ার ডিম ঢুকবে? সবাই বলে ‘মাছের পুক্টি চিপে মাছ কেনা লোক’ পাতান। অনেকে আবার এ কথাও বলে, বেটার নামও যেমন কামও তেমন। গায়ের জ্বর চাইলেও দেবে না। পাতান অবশ্য ওসব কথা কানে নেয় না। উল্টে বলে, লোকের কথায় কি আমার পেট চলবে? লোকে কি আমার ঘর গোহাল চালিয়ে দিয়ে যাবে? না লোকের কথায় চললে আমার মাঠ মাঠানে আপানা আপনি ফসল ফলবে? আমার কাজ আমাকেই করতে হবে। আমাকে দুনিয়াদারি শিখিয়ে লাভ নেই। ওসবের আগা-গোড়া তলা-মটকা সব আমার জানা আছে। এমনি এমনি তো আর বয়সটা তিন কুড়ি পার হয়ে চার কড়ি হতে চলল না? আসলে পাতান নিজেকে নবী রসুলের খাস উম্মত ভাবে। সে যা করে সবই নাকি রসুলের সুন্নত। অপচয় অপব্যয় হাদিস কোরানে নিষেধ। পাতান যেমন হালাল রুজি খায় তেমনি হারাম কাজ থেকে শত হস্ত দূরে থাকে। তার হক কথা, আমি কম খাই, কানাকড়ি খাই, তুষ-পাতান খাই লোকের কী? আমি খেতেও পারি না খেতেও পারি। আমার পেট আমার খিদে। যেটুকু খাই সেটুকু হালাল কি না দেখ? আর এখানেই লোকে তাকে ঠেস মারে, তুমি নিজে খাও না খাও ফকির মিসকিনকে তো দান খয়রাত করতে হবে? দান খয়রাত তো হাদিস কোরানের ফরমান। পরকালে কী নিয়ে যাবে? তোমার এই জমানো টাকাও যাবে না, বছর বছর কেনা জমিও যাবে না। যাবে যেটা সেটা হলো দান খয়রাত। আমল। পাতান সে কথাও ফুঁৎকারে উড়িয়ে দেয়। বলে, আমি কারও ক্ষতি করছি কি না সেটা দেখ। কারও পাকা ধানে মই দিতেও যাই নে কারও বউয়ের সাথে ফস্টিনস্টিও করতে যাই নে। সব ফসলের কাঠা মেপে ফেতরা দিই। নিজের ঘাম ঝরানো রোজগার নিজের গতরে দিই। কারও চুরি তো করতে যাই নে? তাহলে আল্লাহর ফেরেশতারা কোত্থেকে আমার নামে পাপ লিখবে শুনি? একবার খাজা বিক্রেতার কাছ থেকে খাজা কেনার সময় পাতান দাঁড়ি পাল্লা থেকে ঝরে যাওয়া তিলের দানা কুড়িয়ে নিয়েছিল। সে নিয়ে কম ঠাট্টা মশকরা শুনতে হয়নি তাকে। লোকে বলতে শুরু করেছিল, ‘তিল কুড়হানে পাতান’। পাতান সে কথাও গায়ে মাখেনি। মুখের ওপর বলেছিল, শোন, আমি যদি ওই তিলের দানাকটা না ঝেরে নিতেম, তাহলে লোকটার হারাম খাওয়া হতো। কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে প্রত্যেকটা তিলের দানার কানায়গণ্ডায় হিসেব দিতে হতো। তখন যদি লোকটা আমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে আল্লাহকে বলত, ও মাল বুঝিয়ে নেয়নি কেন? আমি কি মানা করেছিলাম? তখন আমি আল্লাহকে কী উত্তর দিতেম? হালাল রোজগারের পয়সা দিয়ে মাল কেনাও যেমন সুন্নত তেমনি কেনা মাল কানায়গণ্ডায় বুঝে নেওয়াও সুন্নত।

এই তো সেদিন, বছর খানেকও হয়নি। পাট পচার মতো নেতানো দুমড়ানো ছিবড়াছিবড়ে শরীরটাকে জৈষ্ঠির ভ্যাদভেদে গরমে এলিয়ে ধুকিয়ে যখন টারে পাট শুকোচ্ছিল পাতান তখন খুলুপাড়ার মুজাম শাহ ঠেস মেরে বলেছিল, ‘অত্ টাকা কে খাবে গ রহমতের ব্যাটা ! এখন কি খেটে কাদা হওয়ার বয়স? এখন হলো আরাম করার বয়স। ভালোমুন্দ খাওয়ার বয়স। পরার বয়স। দশ জাগায় ঘোরার বয়স। সারাজীবনই তো খাটল্যে। এবার এট্টুআট্টু আরাম টারাম করো।’ কথাটা শুনে একবার আড়চোখে মুজামের দিকে তাকিয়েছিল পাতান। তারপর ঘোলা চোখগুলো টাটিয়ে পাতান বলেছিল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ঘরে বসে আরাম করি, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে এ দেশ ও দেশ ঘুরি আর তোরা আমার জমিতে গরু ছাগল ঢুকিয়ে দিয়ে উড়ান কর। ওই মতলবেই তো ঘুরছিস?’ তারপর পুকড়ে ফোকলা দাঁতগুলো খিলখিল করে পাতান বলেছিল, ‘নিজের রক্ত খাটানে রোজগার মিষ্টি হয় রে খুলুর ব্যাটা। গায়ের গোস্ত শুকালে কী হলো হাড় তো আর শুকায়নি? কিয়ামতের দিন আল্লাহকে বলতে তো পারব, যদ্দিন হায়াত দিয়েছিলে তদ্দিন গায়ের ঘাম ঝরানে রোজগারের টাকায় ভাত খেয়েছিলাম। শরীরের যাকাত দিতে এতটুকু কার্পণ্য করিনি।’ তারপর মুজাম শাহকে হিস মেরে পাতান বলেছিল, ‘তোর মতন তো আমি লোকের তিল চিপা খইল চিপা পয়সায় খাইনে, আমি নিজের শরীর চিপা পয়সায় খাই।’ বলে হো হো করে হেসে উঠেছিল। মুজাম শাহও অত কমে ছেড়ে দেওয়ার বান্দা নয়। পাতানের বেটা আর তার নাতিকে ইঙ্গিত করে বলেছিল, ‘কাদের জন্যে এতসব করছ! কেউ তোমার মুখে মরার সময় পানি দিতেও আসবে না খ।’ ‘তাতে তোর কী? আমি মুখে পানি নিয়ে মরি আর না নিয়ে মরি তাতে তোর অত লাগছে কেন রে? তুই কি আমার মায়ের পেটের ভাই না দাদো? অ্যাঃ আমার জন্যে দরদ একেবারে ঝরে পড়ছে!’ বেটার কথা বললেই খচে ওঠে পাতান। পাতানের এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে রহিস বয়সে বড়ো। মেয়ে তো স্বামীর বাড়িতে সংসারের খুঁটি পুঁতে দিয়েছে বছর বিশেক আগে। রহিস শহরে থাকে। ভালোবাসা করে বিয়ে করেছিল বলে ছ বচ্ছর ত্যাজ্য করে রেখেছিল পাতান। পরে বাপ বেটায় মিলমিশ হলেও আগের সেই মিলমহব্বত হয়নি। বেটা অত গা করে না বাপকে। ‘বাপ’ বলতে হয় তাই বলে। আপদ বিপদ ছাড়া অত গ্রামের বাড়িতে আসে না। অবশ্য সে জানে সে বাপকে দেখলেও বাপের সম্পত্তির তিন আনার দু আনার মালিক না দেখলেও বাপের সম্পত্তির তিন আনার দু আনার মালিক। পাতান একাই এত বড়ো দোতলা পাকা বাড়িতে থাকে। রহিস একবার তার বুড়ো বাপকে বলেছিল, বয়স হয়েছে, একা বাড়িতে থাকা আর ঠিক হবে না। রাত বিরেতের ব্যাপার। শহরে চলে এসো। পাতান বেটার কথায় রাজি হয়নি। উল্টে বলেছিল, শহরে গেলে নাকি তার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আপুরফাপুর লেগে যায়। সে আরও বলেছিল, বালামুসিবত দেওয়ার মালিক যেমন আল্লাহ বালামুসিবত থেকে উদ্ধার করার মালিকও আল্লাহ। দুনিয়ায় একা বলে কেউ নেই। সঙ্গে আল্লাহ থাকেন। লোকের খচানে রাগানে কথায় একেবারে যে রাগে না পাতান তা নয়। এক আধবার পান্ঠি হাতে তেড়েও যায়। গালিগালাজও করে। গেল মরশুমে তার ডিহিতলার শিমের ভুঁইয়ে জৈগনের ভরণ ছাগলটা ঢুকে কটামাত্র শিমের লতি খেয়েছিল আর অমনি ছাগলটাকে ধরে তার ভরণ পেটে ভ্যাক করে এক লাথি মেরে যাচ্ছেতাই খিস্তি দিয়েছিল পাতান। সে গালমন্দ শুনে জৈগন বেওয়ার মটকা গরম হয়ে গেছিল। সে খেঁকিয়ে বলেছিল, ‘তুমার টাকায় পুকা লেগি যাবে। উ টাকা খবিষে খাবে। কুকুর শিয়ালে টানবে। অবলা ছাগল তাই তুমার ছিমে মুখ দিয়িচে। আমি হলে ছ্যার ছ্যার করি মুইতে দিত্যাম।’ আরও পাঁচ কথা মুখের ওপর শুনিয়ে দিয়েছিল জৈগন। বলেছিল, ‘বেধবা হতি পারি। হতি পারি গরিবের বিটি। তাই বুলি তুমার মুতন, খিদি লাগার ভয়ে না হাগা লোক নই।’ আর যাই কোথায়। শিমের আলে মাদারি খেলার বাঁদরের মতন তিড়িংবিড়িং করে উঠেছিল পাতান। পরনের লুঙ্গি নেঙটি মেরে হাতের গরু চরানে পান্ঠিটাকে উঁচিয়ে রে রে করে তেড়ে গেছিল জৈগনের দিকে। ভাগ্যিস সেদিন পাশের বেগুনের ভুঁইয়ে আসমত ছিল। তা না হলে কারও না কারও রক্ত ঝরত। গায়ে ফোস্কা পড়ত। জুম্মাবারের মজলিশে দশ-এর সালিশি বসত। সেসব কিছুই হয়নি। যেটা হয়েছিল সেটা হল, ছাগল চরানি জৈগন বেওয়া সেদিন দেখেছিল, অবলা ছাগলে দুটো শিমের লতি খেয়েছিল বলে গায়ের গেরস্ত লোক পাতান শেখের ভেকধারি ইমান।

চিত্র: সার্থক দাস

এখন নামাজের মধ্যে জৈগনের ছাগলও ঢুকে যাচ্ছে। শরীরে যৌবন থাকলে হয়তো জৈগনও ঢুকে যেত। বয়স পাকলে আবার সেসব ঢেমনি ঢ্যামনাও নাকি বাড়ে। পাতানের অবশ্য এখনও সে ব্যামু দেখা দেয়নি। তবে বিটি মাটি পিছু ছাড়ছে না। ইদানীং আবার এক নতুন চিন্তাতে ধরেছে। কোর্ট কাছারির ঝামেলা। মণ্ডলপাড়ার নেকসুদ্দি মণ্ডল নাকি পাতানের আঁশঘাটির মাঠের আমনে জমিতে সেচের স্যালো মেশিন বসিয়েছে। নেকসুদ্দি বলছে জায়গা তার আর পাতান বলছে জায়গা তার। পাতান আর ঝোরঝামেলাই না গিয়ে সরাসরি নেকসুদ্দির নামে কেস ঠুকে দিয়েছে। আর সে কিত্তির কথা শুনে গাঁয়ের লোকে তাকে বলতে শুরু করেছে, লোকটা এত চশমখোর, দু হাত জমির লেগে কোর্টে চলে গেল! গোটা দুনিয়া দিলেও লোকটার পেট ভরবে না। এখন নামাজে দাঁড়ালে পাতান দেখতে পাচ্ছে নেকসুদ্দি আইনের ফাঁদে পড়ে ক্যাউম্যাউ ক্যাউম্যাউ করছে। এর ওর হাত পা ধরতে যাচ্ছে মীমাংসা করার জন্যে। সেদিন জুম্মার নামাজে তো হুলুস্থুল কাণ্ড ! ইমাম সাহেব যেই নামাজের ‘সুরা’ পাঠ শেষ করে ‘সিজদাহ’তে যাবেন অমনি পাতান ‘ফিক’ করে হেসে উঠল! এতক্ষণ পাতান নামাজের মধ্যে দেখতে পাচ্ছিল, পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে নেকসুদ্দিকে কোর্টে তুলছেন। আর লোকে নেকসুদ্দিকে ছিঃ ছিঃ করছে। বলছে, পরের জমিতে স্যালো বসানোর ঠাপ বুঝ। পাতান আরও দেখছিল, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বেটা নেকসুদ্দি হাত জড়ো করে বলছে, আমাকে এবারের মতন ক্ষমা করে দাও পাতানভাই। আর কোনোদিন তোমার জমির তিন সীমনায় পা দেব না। নেকসুদ্দিকে এমন আকুতি মিনতি করতে দেখে ‘ফিক’ করে হেসে ফেলল পাতান। মনের ভেতরের সে হাসি মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল। নামাজের কাতারে দাঁড়ানো অন্যসব মুসল্লিরা সে হাসি শুনতে পেল। আর সে নিয়েই সেদিন মসজিদে তুলকালাম কাণ্ড। পাতানের সে হাসির শব্দে নাকি তাদের নামাজ দুর্বল হয়ে গেছে। তারা এর হেস্তনেস্ত চায়। ব্যাচারি পাতান বিপাকে পড়ে গেল। গোটা মজলিশ তার বিপক্ষে। অনেকে হাম্বিতাম্বি করলেও শেষমেশ সেদিন ক্ষমা চেয়ে রক্ষা পেয়েছিল পাতান। কথা দিয়েছিল, পরে আর কোন দিন এরকম আচরণ হবে না। মসজিদের হারাম হালালটা মসজিদে মিটলেও ব্যাপারটা পাতানের মন থেকে কিন্তু নামল না। বাতের ব্যামুর মতো মনের ভেতর থেকে গেল। সে উঠতে বসতে ভাবতে লাগল, কী করে নামাজের ভেতর দুনিয়াদারি হারাম করবে। পাতান অনেক আলেম এলেম লোকের সঙ্গে শলাপরামর্শ করল। হাফেজ মুক্তি ক্বারির কাছ থেকে হাদিস কোরানের নিদান নিল। এমনকি পাথরঘাটার নুর পীরের কাছেও গেল। সেখানে সিন্নিও মানত করল। পীরের পানিপড়া খেল। কিছুতেই কিছু হলো না। নামাজে দাঁড়ালে সেই ‘দুনিয়াদারি’ পিছু নিয়েই থাকল। এতদিন ভয়টা অত জাপ্টে ধরেনি। কিন্তু হালের মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই ভয়টা একেবারে দাঁত কামড়ে ধরেছে। ভয় বলতে গেলে জিন-পরি ভূত-প্রেতের ভয় নয়। চোর মস্তানের ভয়ও নয়। ভয়টা হলো ‘পরকালের’। দোযখের। আর সে ভয়টা আরও ধরিয়ে দিয়েছে, নামুপাড়ার মসলেম হাজি। ইদানীং তার সঙ্গে পাতানের ভালোই দহরম মহরম হয়েছে। মসলেম হাজির কথায় তো একদিন ফকির মিসকিনকে খিচুড়ি রান্নাও খাইয়েছে পাতান। পাতান নাকি একটা স্বপ্ন মাঝেমধ্যেই দেখে, তার মৃত বাপ তার কাছে এসে বলছে, পেটে খুব খিদে রে পাতান, এক গাল ভাত থাকলে দে। স্বপ্নের কথা শুনে মসলেম হাজি চোখ গোল্লা পাকিয়ে বলেছিল, “খোয়াব তো ভালো না গ পাতান। পারলে ফকির মিসকিনকে খিচুড়ি রেঁধে খাওয়াও।” সে নিয়েও কম কথা ওড়েনি গেরামে। অনেকে বলেছে, ‘পাতান খিচুড়ি রেন্ধে খাওয়ালো! টাকা খসার শোকে লোকটার ক-রাত যে ঘুম হবে না আল্লাই জানেন!’ ঘুম সেরকম হারাম না হলেও পাতান মসলেমকে আর স্বপ্নের কথা বলত না। সেসব স্বপ্ন চেপে যেতে লাগল। যদি মসলেম তাকে আবারও কোন মিলাদ মেহফিলের কথা বলে! যদি আবারও সে স্বপ্নের হাদিসি নিদান দেখিয়ে টাকা দান খয়রাতের কথা বলে। মনে মনে সেসব পণ প্রতিজ্ঞা করলেও একটা স্বপ্নের কথা মসলেম হাজিকে না বলে পারল না পাতান। স্বপ্নটা পাতান মাঝেমধ্যেই দেখে। তার মরহুম মা তাকে ডেকে বলে, পাতান আমার পরনের একটা কাপড় দে তো। পরনের কাপড়টা ছিঁড়ে গেছে। সে স্বপ্নের কথা শুনে মসলেম হাজি তো জোরে ‘আল্লাহ’র নাম নিয়ে উঠল! আর সঙ্গে সঙ্গে নিদান দিল, ‘শোন পাতানভাই, এ বড়ো খারাপ খোয়াব। এ খোয়াব বলছে, পরকালে তোমার মা খুউব কষ্টের মধ্যে আছে। আল্লাহর আজাব গজবের মধ্যে আছে। তোমার মাকে সে আজাব গজব থেকে উদ্ধার পেতে হলে তোমাকে দ্রুত ফকির মিসকিনকে বস্ত্র দান করতে হবে।’ সে নিদানের কথা শুনে পাতান ক-দিন মসলেম হাজির সঙ্গে আর দেখা সাক্ষাৎ করল না। দেখা হলেই এড়িয়ে চলতে লাগল। মসলেম হাজিও পাতানের সে লুকোনো ছুপোনো ভাব আঁচ করল। ব্যাপারটা আর ঘাঁটাল না। মসলেম ঠাহর করল, বেটা পাতান চাট্টে পয়সা খচ্চার ভয়ে বেমালুম চুপ মেরে গেল। পরে একদিন যখন একটা কথা প্রসঙ্গে পাতানের মায়ের স্বপ্নটার কথা তুলল মসলেম তখন পাতান পাল্টা যুক্তি দেখাল, মানুষের মরার পর কি আর কোনো আমল পরকালে যায়? যা আমল করার জীবনে বেঁচে থাকতে থাকতেই করতে হয়। সেদিন মসলেম হাজিও ছেড়ে কথা বলেনি পাতানকে। হাদিস কোরান টেনে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কিছু আমল আছে যেগুলো মানুষের মরার পরও তার সোয়াব পায় মানুষ। যেমন, দুনিয়ার উপকারের জন্যে সৃষ্টি করে যাওয়া কোনো কাজ, যথা মানুষের হেদায়তে লাগা কোনো বই বা কোনো যন্ত্র বা প্রযুক্তি আর মৃত বাপ মায়ের জন্যে করা সন্তানের আমল বা দোয়া। কিন্তু পাতান মসলেমের সে কথা এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছিল। উল্টে বলেছিল, অত এলেম লোক আমি নই বাছা। অত আলাম কালামও জানি নে। সব স্বপ্নের হাদিসি নিদান করতে গেলে তো পাছার কাপড় উদোম হয়ে যাবে। স্বপ্ন কি কম দেখি! রাতের ঘুম তো স্বপ্নে স্বপ্নেই কাটে। আল্লাহর জমিনের খিদমত করতেই দিন চলে যাচ্ছে তো পরকালের চোদ্দগুষ্ঠির খেয়াল কখন করব? মসলেম অত তর্কে যায়নি। শুধু বলেছিল, ক-দিনের আর দুনিয়াদারি, দুনিয়াদারিটা ঘুচলেই সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে।

দুই

দুনিয়াদারিটা ঘুচেই যেত যদি না ঠিক সময়ে অপারেশনটা হতো। এভাবে যে হুট করে চোখে ঝাপসা নেমে আসবে তা আন্দাজই করতে পারেনি পাতান। ছানিটা পড়েছিল অনেকদিন আগেই। ডাক্তার বলেও দিয়েছিলেন, ছানিটা কেটে নিতে। কিন্তু কয়েক হাজার টাকার জন্যে আর সে মুখো হয়নি পাতান। বলেছিল, বয়স হলে ওসব এট্টুআট্টু ঘোলা টোলা হয়। কালিটালি পড়ে। আমার চোদ্দগুষ্ঠি কেউ কোনোদিন চোখ কাটেনি তো আমি কেন কাটব? খালি চোখেই তো সব দেখতে পাই। তাহলে কেন আবার চোখে ক্ষুর চালানো? কিন্তু শেষমেশ সে চোখে ক্ষুর চালাতেই হলো। বিশ হাজার টাকা খরচ করে নতুন লেন্স বসানো হলো পাতানের ডান চোখে। ছানিটা পেকে গেছিল। আর কিছুদিন ফেলে রাখলে চোখ আর ফিরে পাওয়া যেত না। বললেন ডাক্তারবাবু। ছেলে রহিসই তোড়জোড় করে অপারেশনের ব্যবস্থাটা করল। পাতান বেটাকে বলেছিল, মাঠে এখন কাটা ধান পড়ে আছে। ফসলের মরসুম। এদিকে আবার মেঘও কুহারা করছে। মনে হয়, বৃষ্টি হবে। এই সময়ে বৃষ্টি হলে তো ধানের বারোটা বেজে যাবে। ধানগুলো মাঠ থেকে ঝাড়াই মাড়াই করে নিয়েই না হয় চোখের অপারেশনটা করাব। এই অসময়ে বৃষ্টির ছুতো ছাড়াও অন্য যুক্তিও ফেঁদেছিল পাতান। সে বলেছিল, আল্লাহর হাতে বানানো লেন্স ফেলে দিয়ে মানুষের বানানো লেন্স দিয়ে দুনিয়া দেখব! তওবা! তওবা! ও চোখ দিয়ে যা দেখব তা সবই যে পাপ। গুনাহতে গোটা গা ঢেকে যাবে। রহিস বাপের কথা পাত্তা দেয়নি। সে মনে মনে একটা জিনিস আশঙ্কা করেছিল, বাপটা যদি অপারেশনের অভাবে অন্ধ হয়ে যায় তাহলে সে বদনাম তার গায়েও লাগবে। লোকে তখন বলবে, দুটো টাকা খরচের মায়ায় বাপটা তো চোখ কাটালোই না আবার রোজগেরে মস্ত বেটাও বাপটার তখিদ করল না! সে দুর্নামের ভয়ে একরকম জোর করেই বাপের ছানির অপারেশনটা করাল রহিস।

পিঠ খাড়া করে বসল পাতান। পিছনের খোলা জানালা দিয়ে দুপুরের পেকে ওঠা তামাটে রোদ ঠিকরে পড়ছে ভেতরে। ভেতরের টিউবলাইটের সাদা আলো আর বাইরের পাকা রোদ মিশে ঘরটা ধবধব করছে। ডাক্তারবাবু এসে গেছেন। নার্স দিদিমণি আগেই এসেছেন। চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হবে পাতানের। এই কয়েক ঘণ্টা সে এক চোখেই দুনিয়া দেখল। পাতানের সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ছেলে রহিস, রহিসের ছেলে আলিফ, আলিফের বোন জুঁই। ডান দিকে রয়েছে পাতানের মেয়ে আর জামাই। আর তাদের থেকে কিছুটা পিছনে হ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে বাড়ির কিষেন আসান। সবার মধ্যে কৌতূহল নতুন চোখ দিয়ে প্রথম কাকে দেখবে পাতান! প্রথম দৃষ্টি পড়বে কার ওপর! প্রথমবার তাকিয়ে নিশ্চয় আল্লাহর নাম নেবে। দুনিয়াদারি ভুলে মিনমিন করে দোয়া পড়বে। তারপরে গালে ঠোঁটে হাসি মাখিয়ে বলবে, এবার সব ফর্সা ফর্সা দেখতে পাচ্ছি। এই তো রহিস। ওই তো আলিফ। ওই তো মুখ লুকিয়ে আছে আমার দাদি জুঁই। কিন্তু নাহ, সেসবের কিছুই ঘটল না। চোখ খুলেই পাতান প্রথম তাকাল আসানের দিকে। তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল, “আছান, মাঠের ধানগুলেনের খবর কী রে? গুটাতে পেরিছিস?”

 

♦–♦♦–♦♦–♦

গল্পকারের পরিচিতি: জন্ম ১৯৮৫ সালের ৩ মার্চ, মুর্শিদাবাদ জেলার হরিহরপাড়া থানার অন্তর্গত দস্তুরপাড়া গ্রামে| প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় স্কুল ম্যাগাজিনে| গল্পের পাশাপাশি কবিতা, রম্যরচনা ও উপন্যাসও লেখেন| ‘দেশ’ পত্রিকায় গল্প, কবিতা ও রম্যরচনা প্রকাশিত হয়েছে| এছাড়াও দৈনিক এইসময়, সাপ্তাহিক বর্তমান, গল্পগুচ্ছ, একুশ শতক, নতুন কৃত্তিবাস, কালি ও কলম, নন্দন, আরম্ভ, দৈনিক পুবের কলম, দৈনিক দিনদর্পন, গল্পপাঠ, আপনপাঠ  ইত্যাদি পত্রিকায় তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে| আরম্ভ, নন্দন এবং সৃষ্টির একুশ শতক পত্রিকায় উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। লেখালেখির পাশাপাশি তাঁর শখ বইপড়া ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা| পেশায় স্কুল শিক্ষক| ‘আকাশবাণী মুর্শিদাবাদ” বেতার কেন্দ্রে ক্যাজুয়াল হিসেবে অনুষ্ঠান সঞ্চালকের কাজও করেন| তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘কমরেড ও অন্যান্য গল্প’, ” জমিনের আরশ” । এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি ২০২২ এ প্রকাশ করেছে “নবস্পন্দন গ্রন্থমালা” বিভাগে “সৌরভ হোসেনের গল্প” গ্রন্থ।
চিত্রি পরিচিতি: সার্থক দাসের জন্ম ২৯মে ১৯৯৯এ। সার্থক দাস বারাসাত আকাদেমি অফ কালচারের ছাত্র। উত্তর চব্বিশ পরগণার বাসিন্দা।

 


গল্পের সমস্ত চরিত্র এবং ঘটনা কাল্পনিক । বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই, কেউ যদি মিল খুঁজে পান তাহলে তা অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয় ।



❤ Support Us
error: Content is protected !!