- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৫
শান্তিপুরী শাড়ি এবং ঈশ্বর সঙ্গ
পর্ব ৩
আগের বছরগুলোতে পুজোর কেনাকাটা করতে গেছি গড়িয়াহাট, বড়বাজার, বেগমপুর, ধনেখালি, ফুলিয়া, শান্তিপুর এবং আরো কিছু জায়গায়। এদের মধ্যে শাড়ি কেনা-র সেরা জায়গা শান্তিপুর। ট্রেনও আছে শেয়ালদা থেকে। কিন্তু গতবছরের মতো আমরা বেরিয়ে পড়ি গাড়িতে। দু-বছর যাচ্ছি ১৫ই অগস্ট-এ। মধুমিতা ও ময়ূরাক্ষীর ছুটি বলে। এবার সঙ্গে আছে মধুছন্দা এবং তার মেয়ে মলিও। সঙ্গে আছে হাল্কা ভ্রমণ। গতবছর ছিল শান্তিপুরের সঙ্গে মায়াপুর। এবার কৃষ্ণনগর। আর জি কর ঘটনার পরপর দু-বছর ১৪ ই অগস্ট কলকাতায় ও অন্যত্র চলল রাত দখল। তাতে আমার সায় নেই তেমন, যদিও ‘লেখক শিল্পী সংহতি মঞ্চে’র হয়ে প্রতিবাদ করেছি দুই বছরই মিছিলে হেঁটে।
প্রকৃতপক্ষে দুর্দান্ত অস্ত্র তো প্রত্যেক নাগরিকের হাতেই আছে। যথাসময়ে এবং যথাযথ প্রয়োগে অনায়াসে সরিয়ে দেওয়া যায় দুর্বিনীত এই সরকারকে-ই। যে সরকার বাঙালির অস্মিতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে, টের পাই অন্য রাজ্যে গেলে।
যাইহোক সকালে বাড়ির ছাদে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেই যাত্রা শুরু। বাইপাস হয়ে বিরাটিতে ছিমছাম ‘পারিজাত’ রেস্টুরেন্টে জলযোগ গরম পরটা ও গরম জিলিপি। এবার কল্যাণী এক্সপ্রেস ধরে টানা দৌড়। দৌড় শেষে অন্যবারের মতো ডানদিকে না বেঁকে বাঁদিকে ভাগীরথী নদীর ওপর নক্সাকাটা ‘ঈশ্বর গুপ্ত ব্রিজ’ পেরিয়ে হুগলির ত্রিবেণী। কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের থেকেও আট বছরের বড়ো । ঈশ্বর গুপ্তের নামে ব্রিজ থাকলেও, কোথাও নেই তাঁর মূর্তি এবং তাঁর নামে রাস্তা, কারণ কবি তাঁর কবিতায় অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করতেন বলে বিস্তর অভিযোগ। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য, মনে খুব ক্রোধ জন্মালে অশ্লীল শব্দ বেরিয়ে আসে। তাঁর জন্মস্থান কাঁচড়াপাড়া হলেও মাত্র দশ বছর বয়সে মা-কে হারান। এরপর বাবা, সৎমা, ঠাকুরদার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ভাইকে নিয়ে চলে আসেন জোড়াসাঁকোয় মামাবাড়ি।
ঈশ্বর গুপ্তের অসাধারণ কীর্তি ‘সংবাদ প্রভাকর’ প্রকাশ। এই পত্রিকায় হাতে খড়ি হয় বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ভাই রামচন্দ্র থেকে দীনবন্ধু মিত্রসহ বহু দিকপালের। ঈশ্বর গুপ্ত শুধু বাংলা কেন ভারতীয় সাহিত্যে মোগলদের বাদ দিলে প্রথম জীবনীকার। তিনি-ই লেখেন রামপ্রসাদ সেনের জীবনী। তিনি প্রথম ভ্রমণ কাহিনির লেখকও
এজন্য তিনি ভ্রমণ করেছেন উড়িষ্যা, পশ্চিম ভারত এবং নৌকোয় করে পূর্ব বঙ্গের রাজশাহী, বরিশাল, ঢাকাসহ বহু জায়গা। লিখেছেন প্রত্যেক জেলার বৈশিষ্ট্য যেমন রোদ না উঠুক বৃষ্টি না পড়ুক, বরিশালীরা যে কোনও ঋতুতে সঙ্গে রাখতো ‘ছাতাধারী’ সামর্থ না থাকলেও ঠাটবাট বজায় রাখতে। ভ্রমণ কাহিনি লেখায় বাংলাদেশে হিন্দুদের থেকে মুসলিমগণ এগিয়ে। উদাহরণ, নদীয়ার মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনের লেখা ‘শিগার্ফ-নামা-বিলায়েত’। যে গ্রন্থে আছে ১৭৬৫ থেকে ১৭৬৮ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনি। যদিও তা ফারসি ভাষায় ।

মির্জা শেখ ইতিসামুদ্দিনের লেখা ‘শিগার্ফ-নামা-বিলায়েত’
মা-কে হারিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রদের মতো লেখাপড়ায় মন দিতে পারেননি ঈশ্বর গুপ্ত। তা সত্ত্বেও চাকরি না করে রাজানুগ্রহ না নিয়ে শুধু কলমের সাহায্যে সংসার চালিয়ে পরের উপকারে অর্থ ব্যয় করতেন। প্রতি ১লা বৈশাখে বসাতেন সাহিত্যসভা যেখানে আসতেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মনীষীগণ। নিমন্ত্রণ দিয়ে মহাভোজ দিতেন চার-পাঁচশ অতিথিকে। সিপাহি বিদ্রোহে সিপাহিদের পক্ষে ছিলেন না। অবশ্য হরিশ মুখার্জি ছাড়া কে-ই বা ছিলেন ? মহারানি ভিক্টোরিয়ার উদ্দেশ্যে লেখেন কবিতা: ‘তুমি মা কল্পতরু, আমরা সব পোষাগরু’। যে কোনো বিধবা বিবাহে ছিল না তাঁর সমর্থন। সমর্থন ছিল কেবল অক্ষতযোনি বিধবার বিবাহে। সাহসের সঙ্গে ‘সংবাদ প্রভাকরে’ প্রকাশ করেছেন: নীল-অফিসাররা তদন্তে গিয়ে নীলকুঠিতে-ই খাওয়া দাওয়া শয়ন সবই করতেন। নীলকুঠির রাখা হাতির পিঠে চড়ে শিকারে যেতেন তাহলে কি করে প্রজারা পাবে সুশাসন ?

কবি ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্ত
প্রকাণ্ড স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ত্রিবেণীর কাগজকল। এখানেই জন্ম জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের। দেওয়ানি লাভের পর ইংরেজ রাজপুরুষ যেমন কোলব্রুক, উইলিয়াম জোন্স, ক্লাইভ, হেস্টিংস প্রমুখরা পণ্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের কাছে নিতেন আইনি পরামর্শ। তাঁর গুণমুগ্ধ ছিলেন নবকুমার দেব, মহারাজা নন্দকুমার প্রমুখ। ইংরেজ রাজপুরুষগণ তর্ক পঞ্চাননকে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে মনোনীত করলে তিনি সে পদ নিতে রাজি হননি।
ঘন সবুজের আভা মেখে চলেছি এবং একে একে পেরিয়ে যাচ্ছি কুন্তীঘাট, বেহুলা, বলাগড়, গুপ্তিপাড়া ইত্যাদি। বর্ধমান ঢুকে অম্বিকা-কালনায় এসে খোঁজ পাই যে, গৌরাঙ্গ সেতু অনেক উত্তরে। তাই এখানেই নদী পার হই। ভাগীরথীর জল উঠে গেছে দুপাড়েই। বিস্তীর্ণ পারাপার! ওপারে শান্তিপুর। শান্তিপুরে এলেই শুনতে হয় ‘আপনারা তো আজই ১৫ ই অগস্ট স্বাধীনতা দিবস আজই পালন করলেন, আমাদের স্বাধীনতা দিবস তো দুদিন পরে ১৭ ই অগস্ট’। কার ভুলে? রেডক্লিফ সাহেব না কি নেহেরুর না কি দু-জনের ভুলেই নদীয়ার একটি বড়ো অংশ চলে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানে?
ঘুরছি শান্তিপুরের পাড়ায় পাড়ায়, ছুটির দিনে খোলা থাকে না হাট এবং বহু শাড়ির আড়ত। কিন্তু তাঁত বোনা চলছে খটাখট। আলুর মাঠ পেরিয়ে কিছু শো-রুম খোলা, তাতেই হলো কেনাকাটা। এখন চালু করেছি প্রবাদবাক্য ‘একের বোঝা দশের লাঠির’ বাস্তব প্রয়োগ অর্থাৎ আমি কিনছি আমাদের দিকের শাড়ি, স্ত্রী কিনছে ওদের দিকের যাবতীয় শাড়ি । মেয়ে দায়িত্বে নিয়েছে পরিবারের সব ছোটোদের পোশাক কেনার। শান্তিপুর শহর শান্ত এবং মনোরম। একটি ঘরোয়া হোটেলে ছোটো ছোটো মাছের তরকারি দিয়ে দুপুরের খাওয়া হলো তৃপ্তি করে। শান্তিপুরের রাস উৎসব যেমন বিখ্যাত তেমনি কীর্তনের মেলাও। কীর্তনের মাঠে বিজ্ঞাপন ঝুলছে শ্রীকৃষ্ণের ৫২৫১তম জন্মদিবস উপলক্ষে কীর্তনের প্রতিযোগিতা। এখানকার আনারসের খ্যাতি আছে। শান্তিপুরে শৈশব কাটানো দু-জন প্রয়াত প্রিয় মানুষ: পদ্মশ্রী দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রনণম্য প্রকাশক বামাচরণ মুখোপাধ্যায়। আবৃত্তিশিল্পী ও আকাশবাণী -রত্ন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মিশে দেখেছি যেমন তাঁর ব্যক্তিত্ব তেমনই খুবই উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি। শান্তিপুরেই পিসির আদর যত্নে বড়ো হয়েছেন বামাচরণ মুখোপাধ্যায়। তাই বামাচরণ যখন কলেজস্ট্রিটে প্রকাশনী সংস্থা খুললেন, নাম রাখলেন করুণাপিসির নামে ‘করুণা প্রকাশনী’। কলেজস্ট্রিট পাড়ায় পিসির নামে নেই আর কোনো প্রকাশনী। বামাবাবুর সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যেত মনের আরাম। তেমনি কতো যে সাড়া জাগানো উপন্যাস প্রকাশ করেছেন: সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’, মহাশ্বেতা দেবীর ‘অরণ্যের অধিকার’, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়াপাতার নৌকো’, ‘সীমারেখা মুছে যায়’, ‘শতবর্ষের যুদ্ধ’, ‘উত্তাল সময়ের ইতিকথা’, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’, ‘অলৌকিক জলযান’, ‘ঈশ্বরের বাগান’, অমর মিত্রের ‘ধ্রুবপুত্র’, ‘অশ্বচরিত’, মীর মোশাররফ হোসেনের প্রবন্ধ ‘জমিদার দর্পণ’, ‘ভারতের সাধক ও সাধিকা’ ইত্যাদি বাংলা সাহিত্যের মহাআখরগুলি…
♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦•♦
❤ Support Us








