Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • নভেম্বর ২০, ২০২৫

দিল্লিতে দূষণ, পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’— বন্ধ স্কুলপড়ুয়াদের খেলাধুলা, শৈশব হারাচ্ছে নয়া প্রজন্ম?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দিল্লিতে দূষণ, পশ্চিমবঙ্গে ‘এসআইআর’— বন্ধ স্কুলপড়ুয়াদের খেলাধুলা, শৈশব হারাচ্ছে নয়া প্রজন্ম?

স্কুলগুলিতে আজও পড়ানো হয়, পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা। কচিকাঁচাদের চারিত্রিক গঠনে, মানসিক দৃঢ়তা, সংবেদশীলতা আর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এটি। যুগের বিবর্তনে, মহামারির গ্রাসে ক্রমশ ফাঁকা হয়েছে মাঠ। নয়া প্রজন্ম ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, কবাডি, দৌড়, হাইজাম্প, লংজাম্প-এর বদলে হাতে তুলে নিয়েছে মোবাইল। ভার্চুয়াল গেমের আশক্তিতে হারিয়েছে সজীব বন্ধুত্বের গল্প, কল্পনার মায়াময় জগৎ, হারাতে বসেছে শৈশবের সারল্যমাখা কাণ্ডকারখানার স্মৃতি। নতুন ভারতে প্রযুক্তির গুঁতোর বাইরেও রয়েছে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী, পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব আর রাজনৈতিক প্রভাব। গ্রাম-মফস্বল থেকে শহর, খেলার মাঠ দখল করেছে মানুষের সীমাহীন লোভ। অবিভাবকরা খেলাধুলা-শরীরচর্চার পরিবর্তে যান্ত্রিক পড়াশোনাতেই অভ্যস্ত করিয়েছেন সন্তানদের। অদ্ভূত এক সামাজিক বিপর্যয়, আর এর মুখোমুখি ভগ্নদেহ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেশের লাখ লাখ শিশু-কিশোর।

দেশের রাজধানীতে দূষণ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ‘হাইব্রিড’ পদ্ধতিতে চলছে স্কুল। অর্থাৎ রোজ স্কুলে গিয়ে আর কোলাহলে মাতছে না উদ্যাম পড়ুয়ারা। শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে সরাসরি বিনিময় হচ্ছে না ভাবনা-চিন্তার। বদলে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপের ছোট্ট দিগন্তে তারা গড়ে নিচ্ছে নিজেদের আবদ্ধ জগত। আরো বিচ্ছিন্ন হচ্ছে সে চারপাশের মানুষ, প্রকৃতির থেকে। বেসরকারি সংস্থা ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’ অনুযায়ী, দিল্লি-এনসিআরের বাতাসে দূষণ পরিমাপক মান ইতিমধ্যেই ৬০০-এর ওপরে পৌঁছেছে। সরকারি তথ্য বলছে, দিল্লিতে দূষণ সূচক ঘোরাফেরা করছে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৩০-এর মধ্যে। ফলে দিল্লির বায়ুর মান এমন বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে যে, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এটি জীবনঘাতী। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে ক্রমশ দূষণ বাড়তে থাকলে, শহরে ‘হেলথ ইমার্জেন্সি’ জারি করতে হতে পারে। এ সংকটের প্রেক্ষাপটে বুধবার সুপ্রিম কোর্ট দিল্লি সরকারকে এক কঠোর বার্তা দিয়েছে। আদালত সাফ জানিয়েছে যে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্কুলগুলিতে কোনো ক্রিড়া প্রতিযোগীতা বা খেলাধুলার আয়োজন করা যাবে না। প্রধান বিচারপতি বি.আর. গাভাই এবং বিচারপতি কে. বিনোদ চন্দ্রনের বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, শিশুদের সুরক্ষার জন্য সিএকিউএম জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সুপ্রিম কোর্টে মামলাকারী আইনজীবী অপরাজিতা সিং জানিয়েছেন, প্রতিবছর এ সময়ে দিল্লি সরকার অনূর্ধ্ব-১৪ ও অনূর্ধ্ব-১৬ স্কুল পড়ুয়াদের জন্য ইন্টার-জোনাল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে, অথচ এ সময়েই শহরে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, বিগত ২০ বছরে দিল্লির সরকার অনেকবার পরিবর্তিত হয়েছে, অথচ দূষণ সমস্যার সমাধান হয়নি। আদালত পরামর্শ দিয়েছে, প্রতিযোগিতা দূষণ-নিরাপদ মাসে আয়োজন করা হোক। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি জানান, কেন্দ্র ইতিমধ্যেই দূষণ মোকাবিলার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবু, দিল্লি-এনসিআরের দূষণ গত কয়েকদিন ধরে বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছে যে, শিশুদের উন্মুক্ত স্থানে খেলাধুলার জন্য এখন অনুপযুক্ত সময়।

এদিকে, পশ্চিমবঙ্গেও প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নিয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। রাজ্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় বোর্ড জানিয়েছে, ১৭ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রাথমিক স্কুল স্তরের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। রাজ্যের সব জেলার ডিপিএসসি চেয়ারম্যানদের নোটিস পাঠানো হয়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুরের চেয়ারম্যান অনিমেশ দে জানিয়েছেন, অধিকাংশ শিক্ষকরা বর্তমানে ব্লক লেভেল অফিসার হিসেবে নিযুক্ত, যার ফলে স্কুল পরিচালনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা একসাথে করানো সম্ভব নয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি বড়ো অংশ অবশ্য এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। ডব্লিউবিপিটিএ-এর জেলা নেতৃত্ব জানিয়েছেন, একদিকে স্কুল চালানো, অন্যদিকে ভোটার তালিকা সংশোধনের দায়িত্ব পালন, এর সঙ্গে ক্রীড়া প্রতিযোগিতা মানে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ত। খেলা স্থগিত হওয়ায় শিক্ষকেরা অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেছেন, পর্ষদ ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাতিল করেছে, তাই জেলা পর্যায়েও পূর্ব ঘোষিত সূচি বাতিল করা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ অনুসারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এমন সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজাও। বিজেপি অভিযোগ করেছে, তৃণমূল সরকার ‘দুমুখো নীতি’ অনুসরণ করছে। তাদের দাবি, সরকার প্রথম দিন থেকেই এসআইআর প্রকল্প নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। ভ্রান্তি ছড়াচ্ছে যে, ‘এসআইআর’-এর জন্য রাজ্য স্তরের ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বাতিল করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, চলতি মাসে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ নির্দেশ দিয়েছিল, চলতি শিক্ষাবর্ষের মধ্যে সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শেষ করতে হবে। ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে জেলাস্তরের প্রতিযোগিতাও সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু এসআইআর প্রকল্পের কারণে প্রাথমিক শিক্ষকদের একটি বড়ো অংশ বিএলও হিসেবে নিযুক্ত থাকায় খেলার আয়োজন সম্ভব হয়নি। গত ৩ বছর ধরে জানুয়ারিতে শিক্ষাবর্ষ শুরুতেই প্রাথমিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। চলতি বছরও শিক্ষকদের অনেকেই জানুয়ারির দিকে ধারাবাহিকতার আশা করেছিলেন। কিন্তু পর্ষদ এই বছর ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ১৭ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ দিলে শিক্ষক ও স্কুল প্রশাসনে সমস্যা তৈরি হয়।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!