Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মে ২৬, ২০২৬

বন্ধের পথে ‘দুয়ারে রেশন’ পরিষেবা? সরকারের উপর চাপ বাড়াচ্ছে ডিলার সংগঠনগুলি, খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায় যৌথ মঞ্চ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বন্ধের পথে ‘দুয়ারে রেশন’ পরিষেবা? সরকারের উপর চাপ বাড়াচ্ছে ডিলার সংগঠনগুলি, খাদ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চায় যৌথ মঞ্চ

রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফের বিতর্কের কেন্দ্রে তৃণমূল জমানার অন্যতম বহুচর্চিত প্রকল্প ‘দুয়ারে রেশন’। দীর্ঘ দিন ধরেই এ প্রকল্প নিয়ে রেশন ডিলারদের একাংশের ক্ষোভ ছিল।  নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সে বিরোধিতাই আরও সংগঠিত রূপ নিতে শুরু করেছে। সোমবার সদ্যগঠিত ‘জয়েন্ট ফোরাম ফর ওয়েস্ট বেঙ্গল’-এর প্রথম সম্মেলন থেকেই স্পষ্ট ভাষায় দাবি তোলা হয়— ‘দুয়ারে রেশন’ ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রয়োজনে তা বন্ধও করতে হবে।

কলকাতায় আয়োজিত ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সংশোধিত ও বিধিবদ্ধ রেশন এলাকার একাধিক ডিলার সংগঠনের প্রতিনিধিরা। ফোরামের আহ্বায়ক রতন সাউ জানান, ৫ টি পৃথক সংগঠন একত্রিত হয়ে নতুন মঞ্চ গড়া হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বাস্তবে ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্প চালাতে গিয়ে ডিলারদের উপর অসহনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ তৈরি হচ্ছে। রেশন সামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পরিবহণ খরচ যেমন লাগামছাড়া হারে বেড়েছে, তেমনই বহু এলাকায় পর্যাপ্ত কর্মী বা যানবাহনের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল বলে দাবি তাঁদের।

রতনবাবুর অভিযোগ, ‘কাগজে-কলমে যে হিসেব দেখানো হয়, বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বহু ক্ষেত্রে ডিলারদের নিজের পকেট থেকে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে। অথচ কমিশনের অঙ্ক সেই তুলনায় অত্যন্ত কম।’ তাঁর দাবি, বর্তমান কাঠামোয় এ প্রকল্প চালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ ডিলারের পক্ষেই কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠছে।   ফোরামের তরফে জানানো হয়েছে, খুব শীঘ্রই খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হবে। সেখানে ডিলারদের সমস্যা, কমিশন বৃদ্ধি, আর্থিক সুরক্ষা এবং ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ, এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করতে চান তাঁরা।

তবে বিরোধিতা নতুন নয়। রেশন ডিলারদের সর্বভারতীয় সংগঠন অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশন অনেক আগেই এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসু সোমবার বলেন, ‘দুয়ারে রেশন প্রকল্পের ফলে ডিলারদের দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছু হয়নি। সরকারেরও অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। অথচ সাধারণ গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি না।’ তাঁর দাবি, প্রকল্প বন্ধের দাবিতে আগেই সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছে তাঁদের সংগঠন। সে মামলার নিষ্পত্তি শীঘ্রই হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।  

উল্লেখ্য, ২০২১ সালে তৃতীয় বার ক্ষমতায় ফেরার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্য জুড়ে চালু করেছিলেন ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্প। সরকারের যুক্তি ছিল, বহু প্রবীণ, শ্রমজীবী আর প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ নিয়মিত রেশন দোকানে গিয়ে খাদ্যশস্য তুলতে পারেন না। তাই তাঁদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে খাদ্যসামগ্রী। শুরু থেকেই এ প্রকল্পকে জনমুখী উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু প্রকল্প চালুর পর থেকেই আইনি জটিলতা তৈরি হয়। রেশন ডিলারদের একাংশ কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করে দাবি করেন, এ ব্যবস্থা চালু করতে গিয়ে তাঁদের উপর অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে মামলায় প্রথমে ধাক্কা খেয়েছিল রাজ্য সরকার। পরে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য। শীর্ষ আদালতের বিচারপতি সঞ্জীব খান্না এবং বিচারপতি এম এম সুন্দ্রেশের বেঞ্চ কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশের উপর স্থগিতাদেশ জারি করে।

এর পর মামলায় যুক্ত হয় কেন্দ্রীয় সরকারও। কেন্দ্রের অবস্থান ছিল স্পষ্ট— জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গ্রাহকের বাড়িতে গিয়ে রেশন পৌঁছে দেওয়ার কোনও বিধান নেই। সংসদেও কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ‘ওয়ান নেশন ওয়ান রেশন কার্ড’ ব্যবস্থার সঙ্গে ‘দুয়ারে রেশন’ প্রকল্পের বাস্তবিক সংঘাত রয়েছে। কারণ, দেশের যে কোনো প্রান্তে গিয়ে গ্রাহক রেশন তুলতে পারলেও, বাড়ি বাড়ি রেশন পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থায় ওই নমনীয়তা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গত ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টে তিন পক্ষের শুনানি শেষ হয়েছে। রায় এখনো সংরক্ষিত। তবে এরই মধ্যে রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হওয়ায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে, শেষ পর্যন্ত কি বন্ধই হতে চলেছে ‘দুয়ারে রেশন’ পরিষেবা?

রাজ্যের বর্তমান খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আইন ও খাদ্যসুরক্ষা প্রকল্পের কাঠামোর মধ্যে অনুমোদন থাকলে তবেই এ ধরনের প্রকল্প চালু থাকবে। অন্যথায় তা বন্ধও হতে পারে। একই সঙ্গে ‘সবার জন্য রেশন’ নীতিতেও কাটছাঁটের সুর শোনা যাচ্ছে সরকারের অন্দরমহলে। ইতিমধ্যেই সরকারি কর্মচারী, আয়করদাতা এবং আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলিকে স্বেচ্ছায় রেশন কার্ড ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। খাদ্য দফতর সূত্রে খবর, রেশন কার্ডের তথ্যভাণ্ডার খতিয়ে দেখে অযোগ্য উপভোক্তাদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।

বর্তমানে রাজ্যে ২০ হাজারেরও বেশি রেশন ডিলার রয়েছেন। তাঁদের একাংশের দাবি, প্রকল্পের জন্য সরকার অতিরিক্ত ভাতা দিলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে লাভের বদলে ক্ষতির মুখেই পড়তে হচ্ছে অধিকাংশ ডিলারকে। অন্য দিকে, বহু সাধারণ মানুষ আবার ‘দুয়ারে রেশন’ চালু থাকুক বলেই মত দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবীণ ও গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই ব্যবস্থার ফলে রেশন সংগ্রহ অনেক সহজ হয়েছিল। সব মিলিয়ে, এক সময় রাজ্য সরকারের অন্যতম জনমুখী প্রকল্প হিসেবে প্রচারিত ‘দুয়ারে রেশন’ এখন প্রশাসনিক, রাজনৈতিক এবং আইনি টানাপোড়েনের কেন্দ্রে। সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং নতুন সরকারের অবস্থান, আগামী দিনে এই প্রকল্পের ভাগ্য নির্ধারণ করবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!