Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ১২, ২০২৬

জোগানে টান, ক্যানসার-সহ জীবনদায়ী ওষুধের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন কেন্দ্রের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
জোগানে টান, ক্যানসার-সহ জীবনদায়ী ওষুধের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন কেন্দ্রের

ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম ভরসা সিসপ্লাটিন ও কার্বোপ্লাটিন। বহু ধরনের ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসকদের প্রথম পছন্দের তালিকায় থাকা এই দুই কেমোথেরাপির ওষুধ গত কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রমশ দুর্লভ হয়ে উঠছিল। বাজারে জোগানের ঘাটতি, হাসপাতালগুলিতে মজুত কমে আসা এবং রোগীদের হাহাকার, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ানোর পথেই হাঁটল কেন্দ্র সরকার। কেন্দ্রের নীতিগত অনুমোদনের পর এ বার এই জীবনদায়ী ওষুধগুলির দাম ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে সূত্রের খবর।

কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তের আওতায় রয়েছে মোট চারটি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ। তার মধ্যে দু-টি প্ল্যাটিনাম-ভিত্তিক কেমোথেরাপির ওষুধ সিসপ্লাটিন ও কার্বোপ্লাটিন। বাকি দুটি অ্যান্টি-টিটেনাস ইনজেকশন। দীর্ঘ দিন ধরে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে চললেও মূল্যনিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ির কারণে দাম বাড়াতে পারেনি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলি। ফলে একাধিক সংস্থা উৎপাদন কমিয়ে দেয়, কেউ কেউ কার্যত উৎপাদন বন্ধও করে দেয়। তারই জেরে দেশ জুড়ে তৈরি হয় সরবরাহ-সংকট।

গত ৭ জুন ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যালস (ডিওপি) একটি চিঠিতে ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (এনপিপিএ)-কে জানায়, মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডার (ডিপিসিও)-এর ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগের জন্য রসায়ন ও সার মন্ত্রকের অনুমোদন মিলেছে। এ অনুচ্ছেদ সরকারকে বিশেষ পরিস্থিতিতে ওষুধের দাম নির্ধারণ বা সংশোধনের ব্যতিক্রমী ক্ষমতা দেয়। সাধারণত কোনো ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা বা জনস্বার্থে বাজারে হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে হলে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। এর আগে, ৪ জুন এনপিপিএ ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যালসকে জানিয়েছিল যে, বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার কাছ থেকে মূল্যবৃদ্ধির অসংখ্য আবেদন জমা পড়েছে। মোট ৮২টি ওষুধের ফর্মুলেশন পরীক্ষা করে দেখে সরকারি কমিটি। সেই পর্যালোচনার ভিত্তিতেই চারটি ওষুধের ক্ষেত্রে অবিলম্বে দাম বাড়ানো জরুরি বলে মত দেওয়া হয়। কারণ, এই ওষুধগুলির বাজারে প্রাপ্যতা উদ্বেগজনক ভাবে কমে গিয়েছিল।

প্রসঙ্গত, সিসপ্লাটিন ও কার্বোপ্লাটিন তৈরির প্রধান কাঁচামাল হল প্ল্যাটিনাম। পশ্চিম এশিয়ার চলমান অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে প্ল্যাটিনামের দাম হঠাৎই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি ও মুদ্রার বিনিময় হারের অস্থিরতা। ফলে উৎপাদন খরচ এমন মাত্রায় পৌঁছয় যে, মূল্যনিয়ন্ত্রিত দামে ওষুধ উৎপাদন আর লাভজনক থাকেনি। এই দুই ওষুধ ‘জাতীয় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’-এর তালিকাভুক্ত হওয়ায় তাদের মূল্য কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। ড্রাগ প্রাইস কন্ট্রোল অর্ডার, ২০১৩ অনুযায়ী, এ ধরনের ওষুধের দাম বছরে একবার পাইকারি মূল্যসূচকের ভিত্তিতে সংশোধন করা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আগের নিয়মে উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলানো সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে সংস্থাগুলির একাংশ ব্যবসায়িক কারণে উৎপাদন সীমিত করে দেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে ওষুধের অভাবের নেপথ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যর্থতা নয়, মূল কারণ অর্থনৈতিক অচলাবস্থা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় ক্যানসার হাসপাতাল ও চিকিৎসকরা গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এ সংকট নিয়ে একাধিক বার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। দিল্লির এআইআইএমএস, টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার হাসপাতাল, স্যার গঙ্গারাম হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সিসপ্লাটিন ও কার্বোপ্লাটিনের ঘাটতির কারণে বহু রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর কেমোথেরাপি দেওয়ার যে চিকিৎসা-পদ্ধতি, তা ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও ওষুধের মাত্রা কমাতে হচ্ছে, কোথাও আবার বিকল্প ওষুধের সাহায্য নিতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের বক্তব্য, বিকল্প ব্যবস্থায় সব সময়ে একই ফল মেলে না। বরং রোগীর চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে, খরচও বেড়ে যায়। হাসপাতালগুলিকেও অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে মুখগহ্বর, ফুসফুস, জরায়ুমুখ, খাদ্যনালী, ডিম্বাশয়, স্তন, অণ্ডকোষ এবং পিত্তথলির ক্যানসারের চিকিৎসায় এই ওষুধগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে এগুলিই প্রথম সারির কেমোথেরাপি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

স্যার গঙ্গারাম হাসপাতালের মেডিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. শ্যাম আগরওয়াল সম্প্রতি মন্তব্য করেছিলেন, ‘সিসপ্লাটিন এবং কার্বোপ্লাটিন কেমোথেরাপির মেরুদণ্ড। এ ওষুধ ছাড়া বহু ক্যানসারের চিকিৎসা কার্যত কল্পনাই করা যায় না।’ তাঁর মতে, কেন্দ্রের অবিলম্বে এমন ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন ছিল যাতে সস্তা অথচ অত্যন্ত কার্যকর ওষুধগুলির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায়। অল ইন্ডিয়া অর্গানাইজেশন অব কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস (এআইওসিডি)-এর সাধারণ সম্পাদক রাজীব সিংঘলও জানিয়েছেন, গত কয়েক মাস ধরে প্ল্যাটিনাম-ভিত্তিক কাঁচামালের বিশ্বব্যাপী ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এহেন পরিস্থিতিতে মূল্যবৃদ্ধির অনুমোদন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।

ডিওপি-র নির্দেশ অনুযায়ী, এনপিপিএ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির দেওয়া কাঁচামালের ব্যয়বৃদ্ধির তথ্য যাচাই করে মূল্যবৃদ্ধির হার চূড়ান্ত করবে। সূত্রের খবর, শেষ নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় ১০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মূল্যবৃদ্ধির আবেদন জানানো অন্যান্য ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও অনুরূপ মূল্যায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তে স্বল্পমেয়াদে রোগীদের উপর কিছুটা আর্থিক চাপ বাড়তে পারে। তবে উৎপাদন স্বাভাবিক হলে বাজারে ওষুধের জোগান বাড়বে, ফলে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা কমবে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!