- দে । শ পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- জুন ২৮, ২০২৬
বলাগড় বন্দর : কৃষি ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা, সংকটে গ্রামীণ অর্থনীতি?
• পর্ব ৫ •
গত পর্বে জমি অধিগ্রহণের জটিল অঙ্ক এবং পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় মডেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কিন্তু বলাগড়ের মতো কৃষিনির্ভর, নদী-সংলগ্ন অঞ্চলের অর্থনীতি কেবল দলিলি জমির মালিকানার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এখানে বিরাট সামাজিক অংশ জুড়ে রয়েছেন বর্গাদার, খেতমজুর ও প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা, যাদের হয়তো নিজস্ব কোনো কাগজের জমি নেই, কিন্তু এই গঙ্গার জল আর পাড়ের মাটিই তাদের একমাত্র বংশানুক্রমিক জীবন-জীবিকা। পঞ্চম পর্বে তাই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হলো প্রস্তাবিত বন্দর হলে বলাগড়ের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষত দীর্ঘদিনের সফল কৃষি ও মৎস্যজীবীদের প্রাত্যহিক জীবনে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন বা সংকট ডেকে আনতে পারে সে সম্পর্কে নিবিড় পর্যালোচনা।
হুগলি নদীর উর্বর পলিমাটি সমৃদ্ধ বলাগড় অঞ্চলটি উন্নতমানের কৃষিকাজের জন্য গোটা রাজ্যে সুপরিচিত। এখানকার উৎপাদিত হরেক রকমের মরশুমি শাকসবজি, ধান পিয়াঁজ আলু আম মাছ প্রভৃতি স্থানীয় গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বন্দরের সংযোগকারী রাস্তা বা লজিস্টিকস পার্কের জন্য যদি এই উর্বর বহুফসলি জমি চলে যায়, তবে তা কেবল খাদ্য সুরক্ষাতেই আঘাত করবে না, গ্রামীণ আয়ের স্থায়ী উৎসও চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
আরও একটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার, জমি অধিগ্রহণ করা হলে জমির আইনী মালিকেরা হয়তো এককালীন মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়ে যান, কিন্তু সে জমিতে যে খেত মজুরেরা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন, তারা সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে যান, ক্ষতিপূরণের কোনো তালিকায় তাদের নাম থাকে না। ফলে, এই প্রান্তিক মানুষদের নতুন বন্দরে বিকল্প কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে, কারণ তাদের আধুনিক কোনো কারিগরি শিক্ষা বা দক্ষতা এদের নেই।
জমি অধিগ্রহণ করা হলে জমির আইনী মালিকেরা হয়তো এককালীন মোটা টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়ে যান, কিন্তু সে জমিতে যে খেত মজুরেরা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করতেন, তারা সম্পূর্ণ আড়ালে থেকে যান, ক্ষতিপূরণের কোনো তালিকায় তাদের নাম থাকে না
কৃষির চেয়েও সরাসরি এবং বড়ো ধাক্কাটি আসতে চলেছে মৎস্যজীবীদের জীবনে। বলাগড় ও সংলগ্ন চরের কয়েক হাজার পরিবার প্রতিদিন হুগলি নদীর মাছ ধরার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন। বন্দর তৈরি হলে মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জীবিকা চরম সংকটের মুখে পড়বে। প্রথমত, বন্দরে বড়ো বার্জ, কার্গো ভেসেল এবং ড্রেজারের অনবরত যাতায়াত এবং তেল-কালি নিঃসরণের ফলে নদীর এ অংশের মাছেরা তাদের প্রাকৃতিক চারণভূমি হারাবে। বিশেষ করে পোনা মাছ এবং বাংলার আবেগ ইলিশের মতো সংবেদনশীল মাছের পরিযান রুট বা ডিম পাড়ার পথ বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে জালে মাছ ওঠার পরিমাণ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বন্দর ও জেটি সংলগ্ন এক বিস্তীর্ণ জলভাগে নিরাপত্তার কারণে সাধারণ মৎস্যজীবীদের নৌকা ঢোকার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। ফলে, মাছ ধরার ক্ষেত্র অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়বে। তাছাড়া বড়ো বড়ো জাহাজের প্রপেলারের ধাক্কায় বা তাদের ঢেউয়ের তীব্রতায় মৎস্যজীবীদের পেতে রাখা দামি জাল ছিঁড়ে যাওয়া বা নৌকা উল্টে যাওয়ার মতো আর্থিক ক্ষতি নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিকে যদি আমরা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি, তবে এটি আসলে প্রাথমিক খাত অর্থাৎ কৃষি ও মৎস্যের সাথে দ্বিতীয় ও তৃতীয় খাত অর্থাৎ শিল্প ও লজিস্টিকসের এক ঐতিহাসিক সংঘাত।
বন্দরে বড়ো বার্জ, কার্গো ভেসেল এবং ড্রেজারের অনবরত যাতায়াত এবং তেল-কালি নিঃসরণের ফলে নদীর এ অংশের মাছেরা তাদের প্রাকৃতিক চারণভূমি হারাবে। বিশেষ করে পোনা মাছ এবং বাংলার আবেগ ইলিশের মতো সংবেদনশীল মাছের পরিযান রুট বা ডিম পাড়ার পথ বিঘ্নিত হতে পারে।
তত্ত্বগতভাবে বলা হয় শিল্পায়ন হলে রাজ্যের জিডিপি বাড়ে, সমাজ প্রগতির দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু, প্রগতি যদি কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম অর্থনৈতিক ভিতকে উপড়ে ফেলে, তবে তা গ্রামীণ সমাজে চরম বৈষম্য আর ক্ষোভের জন্ম দেয়। বলাগড় বন্দর যদি কেবল পুঁজিপতিদের পণ্য পরিবহনের করিডোর হয়ে ওঠে এবং স্থানীয় মানুষের অধিকার চলে যায়, তবে তা হবে চরম সামাজিক বিপর্যয়।
ঐতিহ্যবাহী এই ক্ষেত্রগুলোর বিকল্প হিসেবে গ্রামীণ যুবকদের জন্য অন্যতম ভরসার জায়গা হতে পারে বন্দরের চারপাশের পরিষেবা ক্ষেত্র। চাষ বা মাছ ধরা কমলে সেই উদ্বৃত্ত গ্রামীণ শ্রমকে নতুন করে গড়ে ওঠা গ্রামীণ বাজার, লরি টার্মিনালের পাশে নতুন হোটেল-খাবারের দোকান, গাড়ির মেকানিক ও স্পেয়ার পার্টসের ব্যবসা বা ছোটখাটো সাপ্লাই ও কুরিয়ারের কাজে যুক্ত করার জন্য সরকারি স্তরে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা আজ সময়ের দাবি। স্থানীয় মানুষ যদি বন্দরে বড়ো চাকরি নাও পান, ছোটো ছোটো ব্যবসার সুযোগগুলো যেন তাদের হাতছাড়া না হয়, তা নিশ্চিত করাই হবে প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us







