- Uncategorized খাস কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ
- আগস্ট ২১, ২০২৬
ইয়েস স্যর, উৎপল হাজির
মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়াকে তিনি একবার বলেছিলেন – ‘আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। আমি মনে করি, আমি প্রথমত, দ্বিতীয়ত, তৃতীয়ত, প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার পরিচয়।’
উৎপল দত্তের বর্ণময় প্রতিভা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা, আচার্য – এরকম চতুর্মুখ সৃজনে উৎপল বারবার সৃষ্টিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে উৎপলের নাট্যসৃষ্টির ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। তিনি মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ও একাঙ্ক নাটক, অনুবাদনাট্য, যাত্রাপালা ও পথনাটক সহ বহু গ্রন্থের রচয়িতা। পাশাপাশি, তিনি কবি ও ছোটগল্পের লেখক।
পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম, ১৯২৯ সালের ২৯ মার্চ, বাংলাদেশের বরিশাল জেলার কীর্তনখোলায়। তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল কুমিল্লায়। তিনি নিজে তাঁর জন্মস্থান শিলংয়ে, তাঁর মামার বাড়িতে বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। উৎপলের বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা রায়ের পাঁচ পুত্র, তিন কন্যার মধ্যে উৎপল ছিলেন চতুর্থ। পারিবারিক ডাকনাম শঙ্কর। বাবা গিরিজারঞ্জন ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের উচ্চকোটির মানুষ। পরবর্তী কালে জেলার হিসেবে ইংরেজ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক (কমান্ড্যান্ট) নিযুক্ত হন। উৎপলের স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল শিলং-এর সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে। পরে গিরিজাশঙ্কর বদলি হয়ে আসেন বহরমপুরে। এখানেই উৎপলের ছেলেবেলা বিকশিত হতে থাকে। ছোটো ভাই নীলিন ও তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র।
১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি, সফল পালাকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একচ্ছত্র নায়ক। বলেছিলেন ‘নাটক ও যাত্রা আমাকে সৃষ্টির আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্র দিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ।
মেজদা মিহিররঞ্জন কিশোর উৎপলকে শেক্সপিয়রের নাটকের গল্প পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাটক শোনার চল ছিল। উৎপল সে সব নাটক মন দিয়ে শুনতেন। মাত্র ছ-বছর বয়সেই শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলতে পারতেন। পরে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের ছাত্রাকালে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেন। চেয়েছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট হতে। ১৯৩৯ সালে গিরিজাশঙ্কর কলকাতায় বদলি হলে দত্ত পরিবার দক্ষিণ কলকাতার রয় স্ট্রিটে বসবাস শুরু করে। কলকাতায় আসার পরেই বাবা-মায়ের সঙ্গে উৎপলের পেশাদার থিয়েটার দেখা শুরু।
কিংবদন্তি অভিনেতা রবি ঘোষ বলেছিলেন, উৎপল দত্তর জীবন জুড়ে রয়েছে আরও এক বিশেষ অধ্যায়, তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপালা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি, সফল পালাকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একচ্ছত্র নায়ক। বলেছিলেন ‘নাটক ও যাত্রা আমাকে সৃষ্টির আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্র দিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ। হিন্দি চলচ্চিত্র আমাকে সর্বভারতীয় অভিনেতা হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল।’ মধু বসুর ‘মাইকেল’ ছবিতে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উৎপলের চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা।
ফ্লোরে মেকআপ নিয়ে পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হতেন। হাতে থাকত মোটা মোটা বই। শটের ফাঁকে পড়তেন। ডাক পড়লেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘ইয়েস স্যর, উৎপল হাজির’।

‘জন অরণ্য’ (১৯৭৬)
তিনি যে কত বড়ো কৌতুকাভিনেতা, সে পরিচয় ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছবিতে। মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের ছবিতে তাঁর অভিনয় সম্পুর্ণ অন্য গোত্রের। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’, তাঁকে চলচ্চিত্রের আশ্চর্য অভিনেতার পরিচয় দিয়েছিল। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎকে লেখা তাঁর আবেগরুদ্ধ চিঠি অমর হয়ে থাকবে। সত্যজিৎকে তিনি ডাকতেন ‘স্যর’ বলে। সত্যজিৎও মুগ্ধ ছিলেন উৎপলের প্রতিভায়। বলেছিলেন, ‘উৎপল যদি রাজি না হতো, তবে হয়তো আমি আগন্তুক বানাতামই না।’
বাংলা নাটকে যেমন মাইকেলকে নতুন ভাবে এনেছিলেন গিরীশ ঘোষ, তেমনই বার্টোল্ড ব্রেখটকে এখনকার চোখ আর মননের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন তিনি। যখন আমাদের অনেকে ব্রেখটের নামই শুনিনি, তখনই উৎপল তাঁর কর্মে আর মর্মে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন — এ পথেও ছুটতে হবে বাংলা নাটককে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলতেন, সিনেমা নয়, উৎপলের প্রকৃত পরিচয় চিনিয়েছে নাটক। উৎপল দত্তের সঙ্গে নাটকে কাজ করতে চেয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন সৌমিত্র। আন্তন শেফারের ‘স্লিউথ’ নাটকটি তাঁকে অনুবাদ করতে দেন উৎপল। কথা ছিল, নাটকে দু-জনে অভিনয় করবেন। তা আর হয়ে ওঠেনি।

টিনের তলোয়ার (১৯৭১)
উৎপল দত্তের সঙ্গে কাজ করবার অভিজ্ঞতা আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে নাটক, চলচ্চিত্র ও যাত্রার অনেকানেক অভিনেতা ও পরিচালকের স্মৃতিতে। কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার মনে হতো, ‘মহলার সময় বাবা যেন যুদ্ধের রণংদেহি সেনানায়ক।’ তরুণ মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, ‘ওঁর ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির রায় সাহেবের চরিত্রটা এত পছন্দ হয়েছিল যে, এগ্রিমেন্ট পেপারে সই করে পারিশ্রমিকের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ফেরত পাঠিয়েছিলেন উৎপল। ফ্লোরে মেকআপ নিয়ে পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হতেন। হাতে থাকত মোটা মোটা বই। শটের ফাঁকে পড়তেন। ডাক পড়লেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘ইয়েস স্যর, উৎপল হাজির’।

মৃণাল সেনের ‘কোরাস’-এর দৃশ্য। (১৯৭৪)
১৯৯৩ সালের ১৯ আগস্ট, হঠাৎ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, ৬৪ বছর বয়সে সমস্ত দৃশ্যের আড়ালে চলে গেলেন উৎপল দত্ত। সত্যি কি তাঁকে ভুলে গেছেন ভারতীয় সিনেমা আর বাংলা নাটকের আম-দর্শক। মনে হয় না। তাঁর ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘টিনের তলোয়ার’, ‘কল্লোল’, ‘ঘুম নেই’, ‘অঙ্গার’, ‘মানুষের অধিকার’, ‘তিতুমির’ ঘনবর্ষার মতো, গহীন শীতের মতো , যে কোনো ঋতুচক্রের প্রাক্ আর উত্তর মুহূর্তের মতো, আমাদের চিন্তায়, আমাদের স্মৃতিতে উৎপলের অনিঃশেষ প্রতিভার সঙ্গী হয়ে জেগে থাকবে। তাঁকে শেষ দেখার একটি ঘটনা, শুয়ে আছেন রবীন্দ্র সদনে। বন্ধ দুটি চোখ। রুদ্ধ চোখের ওপর হাত বুলিয়ে বললেন বিদেশি লেখক, ‘প্রতিভার শেষ নেই, মৃত্যু নেই।’
ভারতীয় চলচিত্রে, বাংলা নাটকের আলোচনায় বারবার উচ্চারিত হবে একটি নাম, উৎপল দত্ত। এমন এক অন্তহীন প্রতিভা ছিল তাঁর, যাঁর হয়ে ওঠা, যাঁর যৌবন, যাঁর গুরুগম্ভীর, রসময় সংলাপ আমাদের ভাবিয়ে তোলে, জাগ্রত করে তোলে আজও। শুধু অভিনয়ে নয়, শেক্সপিয়র থেকে মাইকেল — দুনিয়ার সব আজব প্রতিভাকে ছুঁয়ে গেছেন তিনি। শেক্সপিয়রের সময় আর সম সাময়িক তাৎপর্য নিয়ে তাঁর অদ্বিতীয় আলোচনার উদ্ভাস কি খুঁজে পাব অন্য কারও লেখা আর বিশ্লেষণে ? ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস ব্যাখায়ও তিনিই তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী।
♦•–•♦•–•♦ ♦•–•♦•–•♦
❤ Support Us








