- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুলাই ২, ২০২৬
জঙ্গি দমনে দ্বিচারিতা চলবে না, রাষ্ট্রপুঞ্জে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক ভারতের
‘একজন জঙ্গির পরিচয়, সে জঙ্গি। তার কোনো ভালো বা মন্দ হতে পারে না।’ রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে আরও একবার ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল ভারত। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে দিল্লির বার্তা, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, কূটনৈতিক সুবিধা কিংবা কোনো বিশেষ অভিযোগকে সামনে রেখে জঙ্গি হামলা বা সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। দ্বিচারিতা ছেড়ে বিশ্বের সব দেশকে একজোট হয়ে এর বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।
বুধবার রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘গ্লোবাল কাউন্টার-টেররিজ়ম স্ট্র্যাটেজি’-এর নবম পর্যালোচনা গৃহীত হওয়ার পর আলোচনায় অংশ নিয়ে এ বার্তাই দেন রাষ্ট্রসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত হরিশ পার্বতনেনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে সীমান্ত-পার থেকে পরিচালিত জঙ্গি হামলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, সন্ত্রাসে অর্থ জোগান বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা, নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর অভাব এবং জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাষ্ট্রসংঘের ভিতরে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রসঙ্গও। রাষ্ট্রদূত স্পষ্টভাষায় জানিয়েছেন, ‘জঙ্গি হামলার বিরুদ্ধে লড়াই কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল বা কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়। এরা মানবতার শত্রু। ফলে কোনো রাজনৈতিক অভিযোগ, কোনো কৌশলগত হিসাব কিংবা কোনো আঞ্চলিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে জঙ্গি হামলার ব্যাখ্যা করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরং যে সব পরিস্থিতিতেই এর বিরুদ্ধে যৌথ লড়াই একান্ত জরুরি।’
রাষ্ট্রপুঞ্জে পার্বতনেনি বলেন, ‘ভারত কয়েক দশক ধরে সীমান্তপারের জঙ্গিদের হামলার শিকার। অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বহু পরিবার চিরদিনের মতো প্রিয়জনদের হারিয়েছেন, বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সমাজের উপর নেমে এসেছে গভীর ক্ষত। এ অভিজ্ঞতাই আমাদের শিখিয়েছে— সন্ত্রাসবাদের কোনো ন্যায্যতা হতে পারে না।’ ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি এ দিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান, সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু হামলাকারী নয়, যাঁরা পরিকল্পনা করেন, অর্থ জোগান দেন, অস্ত্র সরবরাহ করেন বা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও সমান কড়া ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলিকে পরস্পরের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করারও আহ্বান জানান তিনি। এর পরেই তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে একজন সন্ত্রাসবাদী, সমস্ত অজুহাত সরিয়ে রেখে একযোগে সেই ‘হত্যাকারী মতাদর্শ’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’
ভারতের তরফে এ দিন রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়। দিল্লির বক্তব্য, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এমন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ‘প্রেক্ষাপট’ এবং ‘ন্যায্যতা’-কে এক করে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। ভারতের মতে, কোনো অঞ্চলের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কিন্তু সে পরিস্থিতিকে কখনোই সন্ত্রাসবাদকে বৈধতা দেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। মানবাধিকার ও আইনের শাসন অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, মানুষের প্রথম এবং মৌলিক অধিকার হল বেঁচে থাকার অধিকার। আর সন্ত্রাসবাদ সে অধিকারের উপরই সবচেয়ে নির্মম আঘাত হানে। তাই মানবাধিকারের প্রশ্ন তুলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপকে দুর্বল করার কোনও সুযোগ থাকা উচিত নয়। এক্ষেত্রে বক্তব্যের নিশানা স্পষ্টত ছিল পাকিস্তানের দিকে।
জঙ্গি হামলার পিছনে অর্থ জোগানের প্রশ্নেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছে ভারত। পার্বতনেনির বক্তব্য, যতদিন পর্যন্ত জঙ্গি সংগঠনগুলির আর্থিক উৎস বন্ধ করা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত সন্ত্রাস নির্মূল করা সম্ভব হবে না। সে কারণেই আর্থিক গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান আরও জোরদার করা, ‘ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স’-এর নির্দেশিকা কঠোরভাবে কার্যকর করা এবং এমন কোনো দেশ বা গোষ্ঠী যাতে এ ধরনের অর্থ জোগানের নিরাপদ করিডর হয়ে না ওঠে, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায় ভারত। এ দিন প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রদূত বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ ব্যবস্থা, ড্রোন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম-সহ নতুন প্রযুক্তি জঙ্গিদের হাতে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলি এখনো কোনো সর্বসম্মত অবস্থানে পৌঁছতে পারেনি। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ না করা গেলে আগামী দিনে জঙ্গি হামলার ধরন আরও জটিল আকার নিতে পারে।
হরিশ পার্বতনেনি বলেন, এ বছরের ‘গ্লোবাল কাউন্টার-টেররিজ়ম স্ট্র্যাটেজি’-র পর্যালোচনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় কুড়ি বছর আগে রাষ্ট্রসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলি প্রথম বার একযোগে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল গ্রহণ করেছিল। সে সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একমত হয়েছিল যে, জঙ্গি হামলা মানবতার বিরুদ্ধে এক সর্বজনীন হুমকি, ফলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া একে পরাস্ত করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, সে লক্ষ্য পূরণে এখনো বড়ো ধরনের ঘাটতি রয়ে গিয়েছে। রাষ্ট্রপুঞ্জে এখনো ‘কমপ্রিহেনসিভ কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল টেররিজম’ (সিসিআইটি) গৃহীত হয়নি। পার্বতনেনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০০৬ সালে ‘জিসিটিএস’ কার্যকর হওয়ারও প্রায় এক দশক আগে ভারত এই আন্তর্জাতিক কনভেনশনের প্রস্তাব দিয়েছিল। অথচ তিন দশক কেটে গেলেও এখনো এই আইনি কাঠামো বাস্তবায়িত হয়নি। ভারতের বক্তব্য, এই কনভেনশন কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক স্তরে সন্ত্রাসবাদের অভিন্ন সংজ্ঞা তৈরি হবে। বিচার, প্রত্যর্পণ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা, নিরাপদ আশ্রয় রোধ, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ— সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। ফলে দ্রুত সদিচ্ছা দেখিয়ে এই কনভেনশন দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।
জঙ্গিদমনে ভারতের ভূমিকাও এ দিন দৃঢ় ভাষায় পেশ করা হয়। দিল্লির দাবি, জঙ্গিবিরোধী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করতে তারা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছে। নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধের রূপরেখা তৈরি থেকে শুরু করে, জঙ্গিদের অর্থ সরবরাহ বন্ধ করতে যে আয়োজন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত নেতৃত্ব দিয়েছে। তবে ২০২৩ সালের ‘জিসিটিএস পর্যালোচনায় এসব উল্লেখ না থাকায় অসন্তোষও প্রকাশ করেছে ভারত। পার্বতনেনির অভিযোগ, রাষ্ট্রসংঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ কখনো কখনো তুচ্ছ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের জিম্মি হয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, এ প্রবণতা শুধু দুর্ভাগ্যজনকই নয়, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবিরোধী সহযোগিতার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ধর্মীয় বিদ্বেষের প্রশ্নেও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথা তুলে ধরে ভারত। পার্বতনেনি বলেন, ‘ইসলামোফোবিয়া’, ‘খ্রিস্টানবিদ্বেষ’ এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষ’— সব ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষকেই ভারত সমানভাবে নিন্দা করে। তবে রাষ্ট্রসংঘের মতো সর্বজনীন মঞ্চে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বা ঘৃণাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে স্বীকার করা প্রয়োজন। বক্তব্যের শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে কার্যত সতর্কবার্তা শোনান ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি। তাঁর মতে, সন্ত্রাসবাদকে পরাস্ত করতে গেলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকতে হবে, দ্বিচারিতা চলবে না, ‘ভাল’ ও ‘খারাপ’ এ হিসাবে জঙ্গি কার্যকলাপকে বিভাজন করা যাবে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক করতে হবে। এই নীতিগুলিই যদি সমানভাবে অনুসরণ করা হয়, তা হলেই বিশ্বের দেশগুলি যৌথভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর সাফল্য অর্জন করতে পারবে। অন্যথায় রাজনৈতিক সুবিধা, দ্বিচারিতা আর আইনি ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়েই সন্ত্রাস নতুন নতুন রূপে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকবে।
❤ Support Us







