- দে । শ
- জুলাই ৯, ২০২৬
অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে বাড়ছে ক্ষোভ, ভ্রান্তি এড়াতে পোর্টালে আসছে ‘এডিট’ অপশন
অন্নপূর্ণা যোজনার অর্থ না-পাওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ ও বিক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে । কোথাও বিডিও অফিসে কাঁচা ডিম ছোড়া হয়েছে, কোথাও পুরকর্মীদের ঘেরাও করা হয়েছে । পঞ্চায়েত প্রধান থেকে শুরু করে পুরসভার আধিকারিক — অনেকেই ক্ষুব্ধ আবেদনকারীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছেন । এই পরিস্থিতিতে নবান্ন জানিয়েছে, প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই । পাশাপাশি অন্নপূর্ণা যোজনার পোর্টালে খুব শীঘ্রই চালু হতে চলেছে নতুন ‘এডিট’ অপশন, যার মাধ্যমে আবেদনকারীরা নিজেদের তথ্য সংশোধন করতে পারবেন এবং আবেদন বাতিল হওয়ার নির্দিষ্ট কারণও জানতে পারবেন ।
ভোট-পরবর্তী সময়ে যেমন একাধিক তৃণমূল নেতা, সাংসদ, বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী ও কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে ডিম ছোড়ার ঘটনা সামনে এসেছিল, তেমনই এবার সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে সরকারি আধিকারিক ও কর্মীদের বিরুদ্ধে । বিজেপি সরকারের এই প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন বহু মহিলা । অনেকের আশঙ্কা, এই জটিলতার কারণে মাসিক আর্থিক সহায়তার প্রকল্পই বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবে নবান্ন স্পষ্ট জানিয়েছে, এমন আশঙ্কার কোনও ভিত্তি নেই। ইতিমধ্যেই রাজ্যের এক কোটিরও বেশি মহিলা মাসিক ৩,০০০ টাকা পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও পাবেন ।
নবান্ন সূত্রের দাবি, রাজ্যের কোষাগারের অবস্থা নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও অন্নপূর্ণা যোজনার অর্থ বরাদ্দে কোনও সমস্যা হবে না । বিজেপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটেই এই প্রকল্পের জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে । প্রকল্প অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে ।
এর আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ মহিলা গড়ে মাসে দেড় হাজার টাকা করে পেতেন । শুধু ওই প্রকল্পেই সরকারের মাসিক ব্যয় ছিল প্রায় ৩,৩০০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৩৯,৬০০ কোটি টাকা । নবান্নের ব্যাখ্যা, তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে যে বহু অযোগ্য আবেদনকারীও সেই সুবিধা পাচ্ছিলেন । সরকারি কর্মী, আয়করদাতা কিংবা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল মহিলাদের অন্নপূর্ণা যোজনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে । প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন । প্রত্যেককে মাসে ৩,০০০ টাকা দিলে সরকারের মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে আনুমানিক ৫,১০০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৬১,২০০ কোটি টাকা । তবে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবিধায় এই অতিরিক্ত ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব বলেই বিজেপি নেতৃত্বের দাবি ।
গত রবিবার মুখ্যসচিব মনোজকুমার অগ্রবাল জানিয়েছিলেন, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য মোট ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে । তার মধ্যে ১ কোটি ২২ লক্ষ আবেদন অনুমোদিত হয়েছে, আর ২৭ লক্ষেরও বেশি আবেদন বাতিল করা হয়েছে । আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বাতিল হওয়া আবেদনগুলির পুনরায় যাচাইয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ।
প্রশাসনের আশা, নতুন ‘এডিট’ অপশন চালু হলে আবেদন বাতিল নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হবে । যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরা পোর্টালে লগ-ইন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করতে পারবেন। প্রথমবার আবেদন করার সময় যদি কোনও তথ্য ভুল দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটি সংশোধনের সুযোগও থাকবে ।
নবান্নের একাধিক আধিকারিক জানিয়েছেন, আবেদন বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ আধার কার্ড ও মোবাইল নম্বর সংক্রান্ত অসঙ্গতি । অনেক আবেদনকারীর আধারের সঙ্গে নিজের মোবাইল নম্বর সংযুক্ত ছিল না। আবার অনেকেই লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সময় যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছিলেন, অন্নপূর্ণার আবেদনে অন্য নম্বর দিয়েছেন । এমন ঘটনাও সামনে এসেছে, যেখানে আধারের সঙ্গে যুক্ত একই মোবাইল নম্বর অন্য কেন্দ্রীয় প্রকল্প — যেমন পিএম কিষান — এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে । ফলে তথ্য যাচাইয়ের সময় একাধিক অসঙ্গতি ধরা পড়ছে এবং প্রকৃত যোগ্য আবেদনকারী চিহ্নিত করতে কিছুটা সময় লাগছে ।
তবে প্রশাসনের বক্তব্য, আয়করদাতা ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল আবেদনকারীদের বাদ দেওয়া হলেও সেই সংখ্যা তুলনামূলকভাবে খুব বেশি নয় । অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রযুক্তিগত বা তথ্যগত ভুলের কারণেই আবেদন বাতিল হয়েছে । তাই যোগ্য আবেদনকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই । যাচাই সম্পূর্ণ হলে তাঁরা অবশ্যই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন ।
জেলায় জেলায় আরেকটি অভিযোগও সামনে এসেছে। অনেক মহিলা জুন মাসে পূর্ববর্তী প্রকল্পের অর্থ পেলেও জুলাই মাসে অন্নপূর্ণার টাকা তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েনি । এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে । নবান্নের ব্যাখ্যা, পূর্ববর্তী প্রকল্পের তথ্যের ভিত্তিতে জুন মাসে অর্থ পাঠানো হলেও পরবর্তী যাচাইয়ে বিভিন্ন অসঙ্গতি ধরা পড়েছে । কিছু ক্ষেত্রে অর্থ পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও প্রযুক্তিগত কারণে তা সফল হয়নি । প্রশাসনের এক আধিকারিকের কথায়, “এমন অনেক ক্ষেত্রে টাকা পাঠাতে গিয়েও পাঠানো যাচ্ছে না । ‘এডিট’ অপশন চালু হলে আবেদনকারীরা তথ্য সংশোধন করতে পারবেন এবং সমস্যার সমাধান হবে ।”
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এতদিন আবেদন বাতিল হলেও তার কারণ জানতে পারতেন না আবেদনকারীরা। নতুন ব্যবস্থায় তাঁরা পোর্টালে লগ-ইন করে জানতে পারবেন কেন তাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরা প্রকল্পের যোগ্য কি না এবং কোন তথ্য সংশোধন করলে পুনরায় আবেদন গ্রহণযোগ্য হতে পারে । প্রশাসনের আশা, এর ফলে বিভ্রান্তি কমবে এবং প্রকৃত যোগ্য মহিলারা দ্রুত অন্নপূর্ণা যোজনার মাসিক ৩,০০০ টাকার সুবিধা পাবেন ।
❤ Support Us







