Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • নভেম্বর ১৯, ২০২৫

সুর-শব্দ-আলোর কক্ষপথে ‘নিরন্তর মিথিলেশ’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সুর-শব্দ-আলোর কক্ষপথে ‘নিরন্তর মিথিলেশ’

সাহিত্যের মৃত্যু নেই, তাই অবধারিত ভাবে শব্দের সৃষ্টিদূতের মৃত্যুও হয় না। তাঁর শব্দ, তাঁর মনন, তাঁর মানুষের প্রতি অনুরাগ রয়ে যায় কাল থেকে কালান্তরে। ১৬ নভেম্বর, রবিবার শিলচর সংগীত বিদ্যালয়ের গোধূলিবেলায় সে অনুভূতিই জেগে উঠল। মিথিলেশ ভট্টাচার্য, বরাকের গল্পভুবনের এক অনন্য নির্মাতা, তাঁকে ঘিরে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠান ‘আবার আসিব ফিরে’ নগরের মায়াসন্ধার গতি থমকে দিল, স্থির চোখে তাকিয়ে থাকল যাবতীয় কোলাহল। সুরের মূর্ছনায়, পাঠের গভীরতায়, আর স্মৃতিচারণের অবক্ত ভাষ্যে সন্ধ্যার রূপ নিল এক ঘন আবেগে বোনা আলোচক্রে।

মুকুন্দদাস–কালিকাপ্রসাদ স্মৃতিমঞ্চে নীলাক্ষ চৌধুরীর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে’ দিয়ে শুরু হয় পর্ব। আরম্ভের শান্ত অথচ দীপ্ত সুর বেঁধে দিল যাপনের মেজাজ। এর পরেই প্রধান আকর্ষণ— ‘শতক্রতু’ ও ‘ঈশান’-এর যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সংকলন ‘নিরন্তর মিথিলেশ’–এর আনুষ্ঠানিক উন্মোচন। একুশ শতকের বরাক সাহিত্যে মিথিলেশের উত্তরাধিকারকে নথিবদ্ধ করার প্রয়াস হিসেবে বইটি যে শুধু প্রাসঙ্গিকই নয়, অপরিহার্য তা উন্মোচন-মুহূর্তের মুখগুলির সম্মিলিত আবেগেই তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অমিতাভ সেনগুপ্ত, সত্যজিৎ নাথ, জয়শ্রী ভূষণ, রাহুল দাস ও দীপক চক্রবর্তীর হাত ধরে বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়। অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণে ধরা দিল মিথিলেশের প্রথম গল্প ‘নষ্টশসা’ প্রকাশের কথা। তপোধীর ভট্টাচার্য জানালেন, সে সময় থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, এ লেখক বরাকের সাহিত্যে নতুন রক্তসঞ্চার করবেন।

দেশভাগোত্তর বরাক উপত্যকার ছিন্নমূল মানুষের ভাঙাচোরা জীবনে তিনি ছিলেন এক নিবিড় শ্রোতা। উদ্বাস্তু জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, প্রতিদিনের ভাঙাগড়ার ইতিহাস, সবই তাঁর গদ্যে জায়গা পেয়েছে। গল্পের নায়ক খুঁজতে তাঁকে কখনও মহানগরের চকচকে প্রেক্ষাপটে পাড়ি দিতে হয়নি; বরাকের মফসসলই ছিল তাঁর সাহিত্যজগতের প্রকৃত ভূগোল। কৃষিজীবী থেকে মৎস্যজীবী, দিনমজুর থেকে কাঠবেগার— যাঁরা সমাজের প্রান্তিক স্তরে ফিরে ফিরে হারিয়ে যান, তাঁদেরই তিনি ফিরিয়ে এনেছেন সাহিত্যভুবনের কেন্দ্রে। নিম্ন-মধ্যবিত্তের ঘনবাস্তবতা থেকে ক্রমশ প্রসারমান শিলচর ও আশপাশের জনপদের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার কোলাজ তৈরি করাই ছিল তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম পছন্দ। নিটোল গল্পের চেয়ে জীবনের অসংগতির ভিতরকার সত্য খুঁজে নেওয়াই তাঁর লেখার মৌল শক্তি। মাটির গন্ধ, মানুষের গোপন বেদনা, আর ছিল সামাজিক বাস্তবতার এমন স্পর্শ, যা তাঁকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করেছিল। শেখর দাস, স্বপ্না ভট্টাচার্যের সংস্পর্শের কথাও উঠে আসে তাঁর কথনভঙ্গিতে। তপোধীরবাবুর মতে, মিথিলেশের শব্দচিহ্ন আগামী প্রজন্মের লেখনীতে থেকে যাবে আজন্ম, মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই।

ঈশানের সম্পাদক অমিতাভ সেনগুপ্ত স্মরণ করালেন, ঈশান পত্রিকার জন্মলগ্ন থেকে মিথিলেশ কেমন মগ্নতায় গভীর আর নিবিড়তায় জুড়ে ছিলেন। তাঁর নিজের লেখা কবিতা ‘কক্ষপথে নিরন্তর মিথিলেশ’ পাঠ করতে করতে তিনি বললেন—বরাকের গল্পভুবন নির্মাণে মিথিলেশের মতো স্থপতি আর কেউ নেই। এরপর মনোজ দেব সঘন কণ্ঠে পরিবেশন করলেন ‘আবার আসিব ফিরে’। আসন্ন শীতের মেদুর সন্ধ্যার পরিবেশ আরো ঘনীভূত হয়ে উঠল। একে একে মঞ্চে উঠে এল বহুকাল অপ্রস্তুত থাকা স্মৃতি। কবি দীপক চক্রবর্তী পাঠ করলেন শতক্রতুর প্রথম পর্যায়ে ছাপা মিথিলেশের তিনটি কবিতা। কবিমনকে চিনিয়ে দেওয়ার জন্য এ পাঠ ছিল অমোঘ। সমান আবেগে সুদীপ্তা ভট্টাচার্য গাইলেন জীবনানন্দ-সুরারোপিত দু’টি গান—‘হায় চিল’ ও ‘বুনোহাঁস’ । মনে হল, মিথিলেশের গল্পের আবহ আর জীবনানন্দের কাব্যিক ধ্বনি মিশে গেল অদৃশ্য শান্ত জলে।

মনোজ দেব পাঠ করলেন ‘আট বছর আগের একদিন’, আর নীলাক্ষ চৌধুরী শোনালেন ‘নদীর নাম…’। দু’টি পাঠই যেন মিথিলেশের লেখা আর তাঁর অন্তর্চেতনার মধ্যে এক অনির্বচনীয় সংযোগ অনুভব করাল। রাতের শেষ পর্বে পঙ্কজ নাথের গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত— ‘শুধু তোমার বাণী নয় গো’ ও ‘আমার খেলা যাক’ মিথিলেশের কক্ষপথ জড়িয়ে ধরল আশ্লেষে। এরপর স্মৃতিচারণের পর্ব—‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম’। দীপক চক্রবর্তী জানালেন, পঞ্চাশ বছরের দীর্ঘ সখ্যে তিনি দেখেছেন, মিথিলেশ ছিলেন মানুষের লেখক। সমাজের নীচুতলার মানুষের সংগ্রামই ছিল তাঁর গল্পের প্রধান উপাদান। কোনো অলংকার নয়, মেদ নয়, দৈনন্দিন জীবনের তীব্র বাস্তবতাই ছিল তাঁর সাহিত্যরস। কবি মৃন্ময় রায়ের স্মৃতিচারণ, ‘মিথিলেশকে স্মরণ করা মানে মানুষের ভেতরকার গভীর আলাপ শুরু করা। সম্পর্কের জটিলতা, দুঃখের নিভৃত রং, মিথিলেশের গল্পগুলি এইসব দিয়ে তৈরি।’ সত্যজিৎ নাথ স্মরণ করালেন প্রয়াত কবির অবিচল বিশ্বাসের কথা। তিনি বলতেন, গল্প কখনো মিথ্যে থেকে লেখা যায় না। জীবনই গল্পকে তৈরি করে। অধ্যাপক রাহুল দাসও দেখেছিলেন তাঁকে এক বহুমাত্রিক স্রষ্টা হিসেবে। যাঁর লেখায় ছিল কবিমনের কোমলতা এবং জীবনানন্দের প্রতি গভীর অনুরাগ। পরবর্তী আলোচনায় অধ্যাপক সুমিতা ঘোষ, বিশ্বতোষ চৌধুরী এবং দেবাশীষ ভট্টাচার্য বললেন, মিথিলেশ ছিলেন এক স্বপ্নতাড়িত সাহিত্যমানব। তাঁর সাহিত্য-গতি, তাঁর কক্ষপথ আগামী দিনের লেখকদের দিশা দেখাবে। ছোটো কিন্তু আবেগঘন এই আলোচনায় যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল, মিথিলেশ আর নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আছে, তাঁর মানবিকতা আছে, আর আছে পাঠকের মনের ভিতর তাঁর অমোঘ উপস্থিতি।

এদিন উন্মোচিত সংকলন ‘নিরন্তর মিথিলেশ’ উত্তরপ্রজন্মের লেখকদের প্রতিনিধি হিসেবে রাহুল দাস, সত্যজিৎ নাথ, জয়শ্রী ভূষণ, অমিতাভ সেনগুপ্ত ও দীপক চক্রবর্তী উন্মোচন করেন—যা প্রতীকী অর্থে উত্তরাধিকারের হাতবদলেরই ঘোষণা। এর মধ্যেই বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কাছাড় জেলা সমিতি ঘোষণা করেছে, আগামী শনিবার বিকেল চারটেয় বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা—‘ব্যক্তিত্বে ও সৃজনশীলতায় মিথিলেশ ভট্টাচার্য’। বক্তা অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য ও অধ্যাপক রমাপ্রসাদ বিশ্বাস। সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বরাকের গদ্যচর্চায় মিথিলেশ উজ্জ্বল নক্ষত্র; তিনি প্রয়াত হলেও রেখে গিয়েছেন অমূল্য সাহিত্যসঞ্চয়, যা বাংলা সাহিত্যের সম্পদ হয়ে থাকবে অমর, অক্ষয় হয়ে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!