Advertisement
  • খাস-কলম
  • সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৫

‘আপনি কিছু দেখেননি মাস্টারমশাই’— প্রান্ত-প্রান্তরে উদয়ন পণ্ডিতের দীর্ঘশ্বাস !

ইমরাজ হাসান
‘আপনি কিছু দেখেননি মাস্টারমশাই’— প্রান্ত-প্রান্তরে উদয়ন পণ্ডিতের দীর্ঘশ্বাস !

সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে চলচ্চিত্র থেকে সংগৃহীত

বর্ষার টইটুম্বুর পুকুর একমনে সাঁতরে পেরিয়ে যাচ্ছে দামাল ছেলের দল। লাল চোখ, থুতনিতে শ্যাওলার প্রলেপ। পুকুর পাড়ে পাঠশালা। বাংলা সাহিত্য, উপন্যাসে, শিল্প, সিনেমায় যেমন কল্পনা, এ তার স্বচ্ছ বাস্তব। পাঁচিলহীন চত্বর, রংচটা, কালো হয়ে যাওয়া চারটে ক্ষয়িষ্ণু ক্লাস ঘর, বিশাল বটগাছের ছায়ায় একচক্ষু ধ্যাণমঙ্গ সন্নাসীর মতো নিশ্চুপ আরামে বসে আছে। বাঁধভাঙা ছাত্রদের দিকে কোমরে হাত দিয়ে এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছেন প্রধান শিক্ষক। সাঁতারুদের হৃদপিণ্ড ধাক্কা মারে বুকে, ডুবসাঁতারে গা-ঢাকা। একটু পরেই বদলে যাবে সব, উচ্ছ্বাসের নামতাপাঠ আর শিক্ষকদের স্নেহমাখা ধমকে মুখর হয়ে উঠবে স্কুলবাড়ির প্রতিটা রন্ধ্র। গত যুগে বাংলার গ্রামে-গ্রামান্তরে এমন স্কুল ও মাস্টারমশাইদের স্মৃতি আজও ফুটে ফুটে বেড় হয় যুগের অজান্তেই। ‘যে পড়ে, সে বড়ো হয়’— এই বড়ো হওয়াটা আসলে কি ! ‘গাড়ি ঘোড়া চড়া’ নয়, লালসার বিশালতা কিংবা বিলাসতা নয়, শিক্ষার নৈতিকতা আর আদর্শে সমাজের উজ্জ্বল জ্ঞাতি হয়ে ওঠা। ক্ষুদ্রতার মধ্যেই বিশালতার সমূহ পাঠ।

সত্যজিতের ‘হীরক রাজার দেশে’ – তখন দেখবার সুযোগ হয়নি গ্রাম-মফঃস্বলের বেশিরভাগ কচিকাঁচাদের। উদয়ন পণ্ডিতের লড়াইয়ের কথা তারা তখন জানে না। জানে না রাজনীতি কিংবা সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয়ের ধোঁয়াটে মেঘের আচ্ছাদন। তারা কেবল বোঝে মাস্টারমশায়ের শাসন, নিয়ামানুবর্তিতার রচনা, পরক্ষণেই নিয়মের ফুৎকার উড়িয়ে মাতোয়ারা ফুটবল, সুর করে পড়া সহজপাঠের গভীরপাঠ, কিশলয়ের সবুজ কচিপাতা, ইংরেজি ব্যাকরণের খটমট অত্যাচার, আর অঙ্কের ভয়াবহতা। বিজ্ঞান ছুঁয়ে যায় কপাল-মাথা, সেখানে আবদারের সীমাপরিসীমা নেই। গোলক-দ্যুলোক ভেদ করে, ফিরে এসে সে পৌঁছে যায় অনাবিল অজানা-রহস্যের দেশে।

সুতরাং, সমাজকে নতুন করে গড়ার স্বপ্ন দেখাতেন না মাস্টারমশাইরা। দেখানোর প্রয়োজন হতো না। পাঠ্যবই, স্যার-ম্যাডামদের জীবন পাঠের কর্মশালা, দৈনন্দিনে পরিবার, চারপাশ সব মিলিয়েই বাঙালির চিরকালের চাহিদা ‘অর্থ নয়, যশ নয়, খ্যতি কিংবা ক্ষমতা নয়, হতে চাই মানুষের মতো মানুষ’ – এ ধারণাই বাতাসে লতাপাতার গন্ধের মতোই জুড়ে থাকত আমাদের সবটুকুতে। বাম-জমানার শেষ অধ্যায়ে দুর্গমের আঁচ লাগেনি গ্রামে, লাগলেও শিশুমনকে বর্মের মতো আড়াল করে দাঁড়িয়ে ছিলেন দল-মত নির্বিশেষের বড়োরা। মনে পড়ে যায়, তৎকালীন দোর্দণ্ড প্রতাপ রাজনৈতিক দলের ক্ষমতা হ্রাসের সবরকম লক্ষনই তখন দেখা যাচ্ছে, সরে সরে যাচ্ছে বহু লোক। এমনই এক সময়ে ক্ষুদেদের দলীয় মিছিলে যাওয়ার জন্য হুকুম জারি হয়েছিল, রুখে দাঁড়িয়েছেন বাংলার মাস্টারমশাই। ‘লাঠি’ সিনেমার ভিক্টর ব্যানার্জির অনুকরণেই ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠ, ‘ওরা যাবে না। এটা ওঁদের কাজ নয়।’ সে মুহুর্তে আমাদের শিক্ষক, আমাদের উদয়ন পণ্ডিত সেইরকমই এক চরিত্র। স্বৈরাচারী শাসকের চোখে চোখ রেখে শিক্ষা, মুক্ত চিন্তা ও সত্যের পক্ষে যিনি বুক চিতিয়ে দাঁড়ান। পাঠশালা বন্ধ করার আদেশ অমান্য করে তিনি বিদ্রোহ করেন, ছেলেমেয়েদের দেন বিদ্রোহ-স্ফুলিঙ্গের পাঠ। সেই তো আমাদের বিপ্লবের প্রতীক, আমাদের পাঠশালা।

শিক্ষক মানেই শুধু সিলেবাস পড়ানো নয়। ছাত্রদের কাছে তিনি হবেন আদর্শের ধারক, ন্যায়বিচারের বিচারক এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অটল অনমনীয় মেরুদণ্ড। তেমন শিক্ষকদের সান্নিধ্য পাওয়া ছাত্রদের কাছেও সৌভাগ্যের, জীবনের বড়ো পাওনা। বাংলার ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর তপ্ত-সোঁদা পরিবেশে ভালোবাসা, স্নেহ আর দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে শিক্ষকরাই হয়ে উঠলেন নিবিড় আশ্রয়, কৈশোর-শৈশবের অমূল্য রতন, জীবনরথের অজেয় চাকা। অনেক পরে দেখেছি, বাংলা চলচ্চিত্রে এমন কিছু শিক্ষক চরিত্র উঠে এসেছে, যারা শুধু শ্রেণিকক্ষে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে তাঁদের প্রভাব ফেলেছেন। কখনো বাস্তব জীবনের সাহসী মানুষদের অবলম্বনে, কখনও সাহিত্য বা কাল্পনিক চরিত্রের মাধ্যমে এই শিক্ষকরা হয়ে উঠেছেন সময়ের আয়না। উদয়ন পণ্ডিতের অনাচারী হীরক রাজাকে মাটিতে টেনে আনা, গুপি-বাঘার লোভ-লালসার বাইরে ‘তিন বর’-এর আহ্বান, ‘যন্ত্ররমন্ত্রর ঘর’-এর ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়া এ সবই রাজনৈতিক, সামাজিক, বাংলার প্রাণস্পদনের বায়ু। উদয়ন পণ্ডিতরা ছেলেমেয়েদের মধ্যে বুনে দেন প্রতিবাদের বীজ। পুঁজিবাদী সমাজে, বেসরকারি মোহগ্রাসের বিপরীতে আজও তাই মিছিলে, স্লোগানে ধ্বনিত হয় বাঙালির প্রতিবাদী চেতনার স্বর, ‘আমি পড়াবো।’ তাঁর হাতে গড়ে ওঠে শিক্ষিত এক নতুন প্রজন্ম, যারা কুসংস্কার আর দমননীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায় পাহাড়-চট্টান হয়ে। ছাত্ররা সমসুরে গেয়ে ওঠে, ‘মনের মতন স্কুল যদি পাই, তবে পড়ব হাঁসিমুখে’। উপেন্দ্রকিশোর, সত্যজিতের কল্পিত স্বৈরাচারী রাজ্য ও গণমানুষের প্রতিরোধ আজ আর কল্পনা নয়। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে-গ্রামে আজও বিদ্যালয় বন্ধ করে দিচ্ছেন রাজারাণিরা, কারণ শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়।

কেবল ‘হীরক রাজার দেশে’ নয়, সত্যজিতের অমোঘ নির্মাণ ‘আগন্তুক’ কিংবা ‘গণশত্রু’-তে শিক্ষক-সত্ত্বার স্ফুরণ দীর্ঘায়িত হয়েছে বারবার। বাঙালি দর্শক আর পাঠকের সামনে খুলে গেছে অচেনা বিশ্বদর্শন আর জ্ঞান সন্ধানের মরীচিকার পিছনে ধাববান মন-মননের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আবার কেবল বংশ-ঐতিহ্যের পরম্পরার প্রাপক সত্যজিৎ-ই নন, বাংলা সিনেমার ‘জীবন্ত দ্রোহ’ ঋত্বিক ঘটকের একাধিক সিনেমায় বুদ্ধের মতো দিয়ে গিয়েছেন সমাজ-দর্শনের পাঠ। ‘যুক্তি তক্ক গপ্প’-এ নীলকণ্ঠ বাগচী নকশাল ছাত্রটিকে তাই বলতে পারেন, ‘ তোমরা সম্পূর্ণভাবে মিসগাইডেড’ সুবর্ণরেখায় শিক্ষকতা ও শিক্ষার প্রশ্নটি আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে। ঈশ্বর (উৎপল দত্ত) এক উদ্বাস্তু অফিসার, যিনি নিজের বোন সীতাকে লেখাপড়া শেখান, ভালো ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখান। কিন্তু দেশভাগের রাজনৈতিক বাস্তবতা, শ্রেণিগত বৈষম্য, ও সামাজিক সংকীর্ণতা সেই শিক্ষার স্বপ্নকে ভেঙে দেয়।

মহানগরের টালমাটাল সময়ে মৃণাল সেনের ‘একদিন প্রতিদিন’ ছবিতে গৃহশিক্ষকের চরিত্র নগরের মধ্যবিত্ত সংকট, অসহায়তা এবং মূল্যবোধের দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। শিক্ষক জড়িয়ে পড়েন সমাজ পরিবর্তন ও অপমানের বিরুদ্ধে তীব্রকঠিন সংগ্রামে। এর পর আমরা দেখি তপন সিংহ-এর ‘আতঙ্ক’ ছবি। রাজনৈতিক সন্ত্রাসের ছায়া যখন শিক্ষাঙ্গনে পড়ে, তখন শিক্ষকও আর নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। রাতের অন্ধকারে নিজেরই এক প্রাক্তন ছাত্রকে খুন করতে দেখেন। সে ছাত্র এখন এক রাজনৈতিক গুন্ডা। হিমশীতল হুমকিতে শিক্ষককে সে সাবধান করে দেয়—‘আপনি কিছু দেখেননি মাস্টারমশাই।’ শিক্ষক দীর্ঘ মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করেন, কিন্তু তাঁর আদর্শস্পৃহা তাঁকে নিঃশব্দে সবকিছু মুখবুজে সহ্য করতে দেয় না। তাঁর পরিবার আক্রান্ত হয়, তিনি বুঝতে পারেন, নিরপেক্ষ থাকা আর সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি তার এক মেধাবী প্রাক্তন ছাত্রের সহায়তায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। এখানে শিক্ষকের চরিত্রটি অসহায়তা থেকে প্রতিবাদে রূপান্তরের এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। শিক্ষকের চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, আর ছাত্রের ভূমিকায় ছিলেন সুমন্ত মুখোপাধ্যায়। শেষ দৃশ্যে ন্যায়ের জয় ঘটে।

একজন শিক্ষক নিজের আত্মমর্যাদা, আদর্শের সূর্যবেলা নিয়ে কতদূর এগোতে পারেন ? নারায়ণ সান্যালের উপন্যাস ‘প্যারাবোলা স্যার’ অবলম্বনে পিনাকীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘রুদ্রবীণা’ ছবির সত্যবান চক্রবর্তী সেই প্রশ্নের উত্তর। অনিল চট্টোপাধ্যায়ের অভিনীত এই চরিত্রটি এক আপসহীন, সৎ ও নীতিবান শিক্ষক, যিনি সারা জীবন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন, কখনো সম্মান পেয়েছেন, আবার কখনো হয়েছেন উপেক্ষিত। সত্যবান চক্রবর্তী সংসারের চাপে, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে হেরে যাননি। অন্যায়, দুর্নীতি ও শঠতার বিরুদ্ধে লড়াই করেন নিঃশব্দে, আর সেই আদর্শের টানেই শেষ পর্যন্ত সংসারত্যাগ পর্যন্ত করেন। বাংলা সিনেমায় ‘প্রলয়’ ছবিতে বরুণ বিশ্বাসের চরিত্র বাস্তব জীবনের এক শিক্ষক এবং সমাজকর্মীর উপর ভিত্তি করে নির্মিত। কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস সুটিয়ার গণধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিবাদ মঞ্চ, এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক লুম্পেনদের প্রাণ হারান। এ ছবি প্রমাণ করে, শিক্ষকতার বাইরেও একজন শিক্ষক কীভাবে সমাজ পরিবর্তনের পথিকৃৎ হতে পারেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই লড়াই এগিয়ে নিয়ে যান আরেক প্রবীণ শিক্ষক বিনোদবিহারী দত্ত, যার মাধ্যমে শিক্ষকের প্রতিবাদী রূপ আরো দৃঢ়, সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছবিগুলির শিক্ষকরা হয়ত সময়, সমাজ, পরিস্থিতিতে আলাদা, তাঁদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি আলাদা, কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে—তাঁরা কেউ অন্যায়, অপরাধ, অবক্ষয়ের কাছে মাথা নত করেননি। শিক্ষকতা তাঁদের কাছে কেবল চাকরি নয়, বরং নৈতিক দায়িত্ব। বাংলা সিনেমা বারবার এই শিক্ষকদের মাধ্যমে সমাজকে শেখায়—শিক্ষা কেবল তথ্য নয়, শিক্ষা মানেই চরিত্র, প্রতিবাদ, আদর্শ, আর প্রয়োজনে বিপ্লব।

বাংলা সাহিত্যে মাস্টারমশাইয়ের আদর্শিক চেহারাখানি কালো অক্ষর ফুঁড়ে তীক্ষ্ণ হয়ে গেঁথে গেছে পাঠকের সুলুক-সন্ধানে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে অপুর ছোটবেলার স্কুলজীবনের আচার্য মশাই একজন স্নেহশীল, মমতাময় শিক্ষক। ঠিক যেন আমাদের পাঠশালা। গ্রাম্য প্রেক্ষাপটে এক শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এখানে গভীরভাবে উঠে আসে। শরৎচন্দ্রের ‘পরিণীতা’-তে গুরুমশাইয়ের চরিত্রও উল্লেখযোগ্য। তিনি ছোটদের পড়াতে গিয়ে তাদের সঙ্গে গড়ে তোলেন এক আন্তরিক সম্পর্ক। শাসন ও স্নেহের ভারসাম্যই এই শিক্ষক চরিত্রকে বাস্তবসম্মত করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’-য় লাবণ্যর বাবার চরিত্র একজন যুক্তিবাদী ও আদর্শবাদী অধ্যাপক। তিনি মেয়ের চিন্তাভাবনায় এক গভীর প্রভাব ফেলেন। রবীন্দ্রনাথের বহু সাহিত্যে এমন শিক্ষক চরিত্র দেখা যায়, যারা আলোর দিশারী। শুধু চলচ্চিত্র ও উপন্যাসেই নয়, বাংলা নাটকেও শিক্ষকের ভূমিকা স্পষ্ট। ‘রক্তকরবী’-তে নন্দিনী সরাসরি শিক্ষক না হলেও, তাঁর চরিত্র প্রতিবাদী বিবেকের প্রতীক। তিনি প্রতীক হয়ে ওঠেন সেই শিক্ষার, যা দাসত্ব মানে না, শৃঙ্খলা মানে না, অজানার খোঁজে চিন্তার উত্তাল স্রোত জাগিয়ে তোলে, বইয়ে নিয়ে চলে।

এ তো গেল, যা ঘটেছে, যা নিয়ে গর্ব আর আহ্লাদ সেসব কথা। কিন্তু আজকের সমাজে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে, উদয়ন পণ্ডিতদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া প্রায় দুঃসাধ্য। উদয়ন পণ্ডিতরা আজ আবার নিখোঁজ। গুহাবাসী। অন্তরে অন্তরীন। কেবল তার দীর্ঘশ্বাস প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। প্রতিবাদের তারা ঢাকা পড়ে যায় কড়াল কালো মেঘে। ক্লাসরুমের সুদৃশ্য কোলাহল নয়, তাকে সামলাতে নানান প্রশাসনিক দায়-দায়িত্ব, খিচুড়ি বিতরণ, ভোট কর্মী, কখনো বা করোনা টিকাদানে সহকারী হয়ে ওঠেন। বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন নয়, বরং রাজনীতির, প্রশাসনের এবং সমাজের চাপে শিক্ষকতা আজ ‘কম্প্রোমাইজড পেশা’। শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে সে হারিয়েছে শিক্ষক-পদের গরিমা, ছাত্র-অভিভাবক-রাজনৈতিক নেতাদের কাছে প্রতিপদে সে অপমানিত, লাঞ্ছিত, প্রহৃত। একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ, সমাজ গরার কারিগড়ের প্রতি সমাজের আস্থা ফুরিয়ে আসছে। মেধা দিয়ে, দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, তারা এখন বাতিলের তালিকায়। আবার এমন অনেকে রয়েছেন, যারা রাজনৈতিক সম্পর্ক ও ঘুষের জোরে পদে বহাল থেকেছেন। এইসব ঘটনা শিক্ষার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। বহু প্রবীণ শিক্ষকও আজ আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
প্যারা-টিচাররা মাসে সল্প বেতনে মধ্যেই তাদের সংসার চালাতে বাধ্য হন। উন্নয়নের এ এক নির্মম পরিহাস। তাই সময় এসেছে, আবার সেই উদয়ন পণ্ডিতকে ফিরিয়ে আনার। যিনি নিজের মূল্য বুঝবেন, অন্যদের শেখাবেন সম্মান দিতে, প্রশ্ন করতে এবং ভয়হীনভাবে চিন্তা করতে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!