Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • জুলাই ৭, ২০২৫

গুয়াদালুপের ধ্বংসযজ্ঞে মৃত্যুপুরী টেক্সাস, মৃত ৮২, নিখোঁজ বহু। ‘জাতীয় বিপর্যয়’ ঘোষণা ট্রাম্প প্রশাসনের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
গুয়াদালুপের ধ্বংসযজ্ঞে মৃত্যুপুরী টেক্সাস, মৃত ৮২, নিখোঁজ বহু। ‘জাতীয় বিপর্যয়’ ঘোষণা ট্রাম্প প্রশাসনের

চারিদিকে কাদা, বাতাসে পচা মাছের গন্ধ, গাছে ঝুলে আছে মৃত গরুর দেহ, উল্টে পড়ে থাকা ট্রাক, নদীর কূল ভেঙে ধুয়ে যাওয়া শিবির — এই দৃশ্য কোনো যুদ্ধপ্রবন অঞ্চলের নয়, বরং আমেরিকার টেক্সাসের গুওয়াডালুপ নদীর বন্যায় বিধ্বস্ত তীরবর্তী কের কাউন্টির। শুধু কের কাউন্টি নয়, গোটা দক্ষিণ-পশ্চিম টেক্সাস জুড়েই চলছে হাহাকার। মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২, যার মধ্যে ২৮ জনই শিশু। নিখোঁজের সংখ্যা ৪০-এর বেশি। ভয়াবহ এ বিপর্যয়ের দাগ মার্কিন নাগরিকদের মনে রয়ে যাবে বহুদিন।

আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের রাতে টানা বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠে গুয়াদালুপ নদী। মমাত্র ৪৫ মিনিটে গুয়াদালুপে নদীর জল ২৬ ফুট (প্রায় ৮ মিটার) বেড়ে যায়। নদীর দুই শাখা একত্রে ফুলে ওঠায় সমস্ত জল এসে পড়ে মূল চ্যানেলে, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তাণ্ডব। শহর কেরভিলের প্রশাসক ডালটন রাইস বলেন, ‘জলের তোড় এতটাই ছিল যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ।’ নদীর ধারে সামার ক্যাম্পে বেড়াতে যাওয়া একদল ছাত্রী ছিল তাঁবুতে। সেই ‘ক্যাম্প মিস্টিক’-এর ২৭ জন কিশোরীর খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ রয়েছেন তাঁদের এক কাউন্সেলরও। শুধু কের কাউন্টিতে মারা গিয়েছেন ৬৮ জন, যার মধ্যে ২৮ জন শিশু। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট, যিনি জানিয়েছেন, ‘বিপর্যয়ের আঘাত এতটাই প্রবল, যে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’ জলস্তর কমলেও উদ্ধারকার্যের গতি কমেনি। মার্কিন কেন্দ্রীয় প্রশাসনের নির্দেশে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা দলের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এখনো আকাশে চক্কর কাটছে হেলিকপ্টার। নদী পেরোচ্ছে কোস্টগার্ডের বোট। গাছ, গাড়ি, কাদা, পচা দেহের গন্ধ পেরিয়ে উদ্ধারকারীরা পৌঁছাচ্ছেন দুর্গম অঞ্চলে। ১৭টি হেলিকপ্টার কাজ করছে। কেউ বেঁচে আছে কি না — সেই শেষ সম্ভাবনাটুকু নিয়েই চলছে লড়াই।

জানা যাচ্ছে, ওই সামার ক্যাম্পে প্রায় ৭৫০ জন ছিলেন। ছোট ছোট কেবিনের জানালায় হঠাৎ ঢুকে পড়ে হিংস্র জল। কাদায় মাখা কম্বল, বইপত্র, ছিঁড়ে যাওয়া টেডি বেয়ার আর ভাঙা জানালার মধ্যে তখন শুধু বাঁচার আর্তি আর হাহাকার। ক্যাম্পে থাকা এক তরুণী, জয়স ব্যান্ডন, শেষবার পরিবারের কাছে একটি মেসেজ পাঠান, তাতে লেখা ছিল ‘আমরা ভেসে যাচ্ছি।’ তারপর সব নিস্তব্ধ। এরপর শুরু হয় খোঁজ। স্বেচ্ছাসেবকদের এক দল টানা তল্লাশি চালাচ্ছেন তাঁদের খোঁজে। এক স্বেচ্ছাসেবী জানান, ‘একটি দেহ আটকে ছিল গাছে, প্রায় আট-দশ ফুট ওপরে, এতটাই জঞ্জালে ঢাকা ছিল যে একজোড়া চোখে ধরা পড়া সম্ভব ছিল না।’

ঘটনার ভয়াবহতায়, হোয়াইট হাউস ইতিমধ্যেই ‘জাতীয় বিপর্যয়’ ঘোষণা করেছে। আমেরিকার ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি উদ্ধারকার্যে নেমেছে।প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, শুক্রবার দুর্গত এলাকা পরিদর্শনে যেতে পারেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। ঈশ্বর এই কঠিন সময়ে টেক্সাসবাসীর পাশে থাকুন।’ টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট রবিবারকে ‘প্রার্থনার দিন’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘মৃতদের আত্মার শান্তি, নিখোঁজদের ফিরে পাওয়া, উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তার জন্য, আসুন, আজ আমরা একসাথে প্রার্থনা করি।’ রোম থেকে পোপ লিও চতুর্দশও শোকবার্তা পাঠিয়েছেন। তাঁর বার্তা, ‘দুঃখজনক ঘটনা। বিশেষ করে যেসব পরিবার তাঁদের শিশুদের হারিয়েছেন, আমরা তাঁদের জন্য প্রার্থনা করি। ঈশ্বর তাঁদের শক্তি দিন।’

প্রশ্ন উঠছে— কেন কের কাউন্টিতে আগাম সতর্কতা পৌঁছল না? মার্কিন সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, সে দেশের জাতীয় আবহাওয়া দফতর আগেভাগেই নদীর জল বাড়ার সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল। সেই অনুযায়ী বেশ কিছু এলাকার বাসিন্দাদের সরানোও হয়। কিন্তু কের কাউন্টি সেই তালিকার বাইরে থেকে যায়। ফলস্বরূপ, হড়পা বান এসে তছনছ করে দেয় গোটা এলাকা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো জবাব মেলেনি। প্রশ্ন উঠছে এ তাহলে জলবায়ু গবেষণায় কাটছাঁটের পরিণতি? ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ‘নোয়া’-র গবেষণা ও আবহাওয়া পূর্বাভাসের কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। স্পষ্টতই বলা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণায় ‘রাজনৈতিক রং’ মিশেছে বলে প্রশাসন অনীহা দেখাচ্ছে। অথচ এই গবেষণার উপরেই নির্ভর করে যথাসময়ে সতর্কবার্তা ও ত্রাণের পরিকল্পনা। ‘নোয়া’-র প্রাক্তন ডিরেক্টর, জলবায়ুবিদ রিক স্পিনরাড জানিয়েছেন, ‘গবেষণা ও প্রযুক্তির অবনমন পরিস্থিতিকে আরো মারাত্মক করে তুলেছে। কম গবেষণা মানে কম সতর্কতা, কম প্রস্তুতির অভাব। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের উপর।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!