- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- মে ৮, ২০২২
দশ ইঞ্চি প্রজাপতি
পর্ব ২
অলঙ্করণ: দেব সরকার
উ প ন্যা স
আজ দুপুর থেকেই, কেন জানি, রবিশেখর শহরটার বাতাসে টানা কয়েকটা দিনের সূক্ষ্ণ একটি ঘ্রাণ টের পাচ্ছিল। ভোরবেলা থেকে সূর্য ঠিক মাথায় চড়বার আগে পর্যন্ত কিছুই টের পাওয়া যায় না । অথচ, প্রহর ঠিক ঠিক ঝিমমেরে উঠলেই, নিয়মিত শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্রে মিষ্টি মিষ্টি ঝাঁঝালো কিছুর আভাস । কোনো কারণে ছুটির রাস্তাঘাটে বেরুলে গন্ধটি তীব্র হয়ে ওঠে । গন্ধে আছে গোপন মদিরতার ভাব।
দু-চারজনকে সাক্ষি হিসেবে বলে দেখেছে। অবাক কাণ্ড! শুনে কেউ আকাশ থেকে পড়ে। কেউ রবি শেখরের মুখে এমন ভঙ্গিতে তাকায়, লোকটার মাথা ঠিক আছে তো?
কী গন্ধ পাচ্ছেন? পচাপচা?
না, না, তালে তো আপনারাও টের পেতেন।
তালে?
তালে যে কী, রবিশেখর কিছুই খুঁজে পায় না। সামান্য হেসে পাশ কাটিয়ে, বিনা কারণেই উল্টো পথে হাঁটতে থাকে । হয়তো প্রয়োজন নিয়ে বেরিয়েছিল স্টেশনের ফ্লাইওভারটা দিয়ে, পুব অংশে যাবার, হাঁটা লাগাল দাঁতের কলেজের দিকটায়।
জোত সিং এর বংশধররা এখন খাটাল ব্যবসার পরিবর্তে বিদ্যাদোহনে অধিক আগ্রহী। দুনিয়ার নতুন ব্যবস্থাপনায় দেশের সরকারবাহাদুর কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়দায়িত্ব বিভিন্ন কর্মীদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছেন ।
আর মওকা বুঝে মালিকরা ভেবে নিলেন খাটাল ব্যবসা ও বিদ্যাবাণিজ্যের মধ্যে ইদানীং দ্বিতীয়টাতেই অধিক মুনাফা । দুটোর ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনাতেও তেমন ফারাক কোথায়?
উত্তর ভারতের শ্রদ্ধেয় একজন সন্তের নামে কলেজটি নামাঙ্কিত, মন্ত্রী আমলাদের দিয়ে জাঁকজমের উদ্বোধনের পর বছরে বছরে হরিয়ানার এই কর্মবীর এর শ্রীবৃদ্ধি ।
সমান্তরালে শহরেরও উন্নতি । দূর দূর জিলা ও মফঃশ্বল থেকে ছাত্র-ছাত্রী ভিড় জমাচ্ছে । ক্রমে প্রদেশ ছড়িয়ে দেশ, এমন কি আফ্রিকা, বাংলাদেশ, নেপাল থেকেও । এখানে মেরিট ব্যাংকিং এর কড়াকড়ি ছেড়ে শুধুই রেস্তোর জোরে ভর্তির কোটা টি ক্রমশ খুলে দিতে, বিজ্ঞাপনে শুধুই শহরটার নাম। আর যেহেতু শহরের দক্ষিণ দিকটায় জনবসতির চাপ কম, বন্ধ কটনমিলের বিঘে দশ জমি, মিউনিসিপ্যালিটির ভাগাড় হারিয়ে যেতে, এখানেই সাময়িক ডাম্প করে রাখত । শেষে শহরেরই জনৈক কৃতিবিদদের সঙ্গে জোতসিং-এর ডিল হয়।
‘ডিল’ শব্দটি বিদেশী। চলতি বুলিতে বোঝাপড়া। রবিশেখর জানেনা, এইসব ইতিহাসের কথা। শব্দের অর্থসংক্রান্ত ইতিহাস । যেমন, বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর ছাত্রসম প্রভাত কুমার অধিকারীকে, জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে সুতো কল বসাতে সফল । ১২০ কাউন্টের সুতো—যা সে যুগে কোনো স্বেশীর পক্ষে শ্লাঘার বিষয় ।
তাহলে, উদ্বুদ্ধ শব্দটি এখন বোঝাপড়া হয়ে ডিল এ পরিণত ।
ছুটির দিনে দুপুরে চারতলার স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যেই নাসারন্ধ্রে গন্ধটি পেয়ে রবিশেখর প্রমাদ গুনল ।
উৎপলা তখন বেরুবার পথে। কোথাও বেরুবার মুখে উৎপলাকে খুব লোভনীয় মনে রবিশেখরের । যেন বাতাসে ভাসন্ত শিমুলের ফাটা তুলোর দল । হেসেহেসে, ভেসেভেসে মাটির যে কোনো কোলের ইশারায় ঢলে পড়তে জানে । অথচ, স্বামী হিসেবে সে কখনো কৌতূহল প্রকাশ করতে অমনি বলতে পারেননা, নিজেরই শহর! …এত সাজুগুজুর দরকার কি?
খুব কি প্রসাধনপ্রিয় উৎপলা? এখন তো মামুলি রিবক-এর একটা সানগ্লাস, হালকা প্রিন্ট-এর শাড়ি, ম্যাচিং টিপ, মধ্যাহ্নের রোদ্দুরকে হার মানিয়ে যেন উৎপলার ধবধবে রংটি দাউদাউ জ্বলছে ।
দাঁতের পাটির ঔজ্জ্বল্য যেন কোনো টুথ পেস্টের বিজ্ঞাপন ।
গল্পটি নাসারন্ধ্রে অনুভব হতেই, রবিশেখরের সামান্য দুশ্চিন্তা হয়। ঘরের নিরাপত্তা ছেড়ে দুপুরের খোলা বাতাসে যে বেরিয়ে পড়ছে, গন্ধটি কি অনুভব করতে শেখেনি?
বেরুচ্ছ তুমি? না বেরুলে হত না?
কেন?
কিছু টের পাচ্ছ না?
উৎপলা সামান্য ভুরু কোঁচকায়।
ঘোরে আছ নাকি? রবিশেখরকে বলে।
কেন? বাতাস থেকে নাকে কিছু যাচ্ছেনা?
ধ্যাৎ ! বুবাই রইল, দেখো! উৎপলা লিফট এর দরজায় এগোল।
রবিশেখরের হঠাৎ রসিকতার ঝোঁক। উৎপলাকে শুনিয়ে বলে, গন্ধ পাবে কি! মার্কেটিংয়ে যাচ্ছ তো! …এসিতে ঢুকবে।
উৎপলা পাল্টা দিল না।
সুতির নাইটি কিনব একটা একটা…ফুটের দোকান থেকে।
একেবারে শ্বেতপুষ্ট দাঁত । রঙমাখা রসালো কোমল ঠোঁট উজ্জ্বলতায় ঘেরা। দুষ্টুমির ফাঁক পেয়ে, উৎপলা বাতাসে আঙুলের সাহায্যে বক্ষ আবরণীর ইঙ্গিত করে।
রবিশেখর গম্ভীর।
কার ধ্যান করছ? উৎপলা ফের পেছনে লাগে।
ধ্যান ট্যান তোমার ওব্যেস! …নিজের শহর তো !
উৎপলা নেমে গেল । হাতে সময় নেই । নইলে রবিশেখরকে নানা ভাবে যৌনসংক্রান্ত লেগপুলিং করে চুপ করিয়ে দিতে পাঁচমিনিটও লাগে না ।
উৎপলা জানে নিজের জোর কোথায় এবং যুগপাৎ মানুষটার দুর্বলতাও। গম্ভীর স্বভাব, জ্ঞানবুদ্ধি উপার্জন বেসরকারি অফিসের স্ট্যাটাস ইত্যাদিতে যতখানি গরিমা বোধ, খাদহীন অতিশয় মূল্যবোধক্রান্ত না হলে, স্ত্রী হিসেবে অতৃপ্ত আপারহ্যান্ড নিতেও পারত না ।
বিয়ের পরে পরেই উৎপলা টের পেয়েছিল তার প্রতি রবিশেখরের অপ্রত্যাশিত দুর্বলতা অথচ চাপা ঈর্ষা।
উৎপলার চল্লিশেও সুঠাম শরীর। চারতলার এই নিরিবিলিতে মাঝে মধ্যেই যখনই যেচে সে একজন ম্যাচো পুরুষকে কল্পণা করে কাছে এসছে, প্রতিপক্ষ নীতিবাগিশ ক্লান্ত, স্বতঃস্ফূর্ততাকে মনে করেছে একধরণের অনৈতিকতা ।
লিফটটার সুইচ মারার আগে উৎপলা শুনতে পেল ‘শোনো’!
রবিশেখর দুপা এগিয়ে ।
বলো!
দেশি হবে ফিরতে?
কেন?
সঙ্গে জল নিয়েছ?
লাগলে কিনে নেব!
সফটড্রিংকস খেওনা আবার! …বিশ্বাস তো করলে না, এ গন্ধটা খুবই ক্ষতিকর ।
যাক্ সাবধান করে দিলে? …ফিরে এসে প্রাইজ দেব!
অবিশ্বাস করাই তোমাদের মজ্জায়! রবিশেখর বলে ।
ঢপের চপ বন্ধ করবে? উৎপলা ধমকায়।
সত্যি বলছি…ফুটে যাদের সংসার … ভাতের হাঁড়িতে গন্ধটা মেখে যাচ্ছে…
রবিশেখর তথ্যটি শেষ করতে পারল না। ইদানিং একটা ইংরিজি জার্নালে কী ভাবে অচেনা এই গন্ধে আফ্রিকা ও এশিয়ার কত লক্ষ মানুষ আক্রান্ত, তথ্যটি বিস্তারিত জানাবার আগেই উৎপলা অনুকম্পার একটা ফ্লাইং চুমু ছুঁড়ে দিয়ে, ‘বুবাই যেন দুপুরে ঘুমোয়, দেখবে!’ বলে নীচে অদূশ্য হয়ে গেল ।
বুবাই তার ঘরে গেম খেলছিল । বাপি এ ঘরে ঢুকতেই জিজ্ঞেস করল-
মাম কোথায় বেরুল বাপি?
খেয়ে উঠে গেম খেলতে নেই, বলেছিনা বাবু!…ঘুমোতে হবে।
বলনা, মাম কোথায় বেরুল?
তোমার কি দরকার? কাজে বেরিয়েছে, ফিরে আসবে এক্ষুণি!
ছাই এক্ষুণি! …রোজ দুপুরেই বুঝি মাম এর কাজ থাকে?
আচ্ছা, আচ্ছা ! ফিরলে জিজ্ঞেস করব ক্ষণ। …you must have fiesta !
দুপুরের ঘুম হলে ফিয়েস্তা! মাসখানেক আগে জার্নলে পড়েছিল, লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো দেশে অফিস কাছারি মানুষও দুপুরে ঘুমোয়। ঘুমের জন্য ছুটি দেওয়া হয়। শহর তখন দুপুর রাতের মতো শুনশুন ।
রবিশেখর অডিট ও বাণিজ্য জগতের একজন কৃতবিদ, নানা চেম্বার অব কমার্সের অভ্যন্তরীন খবরা খবর থাকে তার কাছে । সরকারি বাজেট সে খুনিনাটি বুঝতে পারে ।
নিজের ঘরে ঢুকে হঠাৎই একবার ব্যালকানিতে দাঁড়াল । সৈকতে একটা ঢেউ আছড়ে পড়েই ফিরে গেল। উৎপলার ওপর সন্দেহের ঝাপটা সরে যেতেই মনে হয় সন্দেহ ও অবিশ্বাস আমাদের মনের আটআনা শক্তিকে খেয়ে ফেলে। এ শহরটাতেই জন্মেছে, বড় হয়েছে—চল্লিশটা বছর এর আলোবাতাসে থাকলে, তার তো বহু কাজই থাকতে পারে—যা সকাল, দুপুর, বিকেলের যে কোনো সময়জুড়েই ছড়ানো । ছলনাই বা ভাবছি কেন!
শেষ চৈত্রের রোদ দূরে দূরে ছড়িয়ে। দুপুরের টাইমটেবিলে একটু ফাঁকফোঁকড় থাকে। অত ঘন ঘন ট্রেন নয়। তবু ডাউন এবং আপ ট্রেনের শব্দে এখন মনে হয় মানুষের লক্ষ্য ও কর্মব্যস্ততার কোনোও সীমা পরিসীমা নেই জগতে ।
রবিশেখর শহরটা সম্পর্কে মানসিকস্তরে দ্বান্দ্বিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। কখনও কোনো দুর্বল মুহূর্তে ভেবে বসে, এ শহরে কি উৎপলার কেউ পছন্দের অতীত হয়ে নেই? কেউ বা কেউ কেউ? এতদিনেও সে শহরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে শিখল না।
দূরে দূরে বন বড় জলাধারের কক্রিটমাথা, টাওয়ার আর জনবসতির চিহ্ন। গাছপালার চিহ্নও আছে । আকাশের ধার ঘেঁষে সাদা ছাইয়ের ছোপ । এ-বছর এখনও কালবোশেখি হয়নি। চৈত্র ক্রমশ উগ্র হচ্ছে বোঝা যায়। মাঝেমধ্যে হাওয়ার ঘুরপাক শরীরে তাপের ছ্যাঁকা অনুভূত হচ্ছে ।
গন্ধটা পুনরায় ভেসে এল । বেশ জানান দিয়েই যেন রবিশেখরের চেতনায় ফিরে এল ঘ্রানের বিপদটি । উৎপলার রহস্যময় চটুলতায়, বুবাইএর নিষ্পাপ অনুযোগে হঠাৎ একটা ক্ষোভের ঢেউ বুকে আছড়ে পড়েছিল বটে, এখন শান্ত।
উৎপলার চটুল ছলনায় যে কিছুটা ‘ঢেউ আছড়ে পড়া ও চলে যাওয়া’ সৈকতের মতো সাদা বালিতে ভরাট হয়। হয়তো একতরফা সন্দেহে সে অনৈতিকতার কাজ করছে। হয়তো উৎপলা তার ওপর গভীর আস্থাশীল বলেই চটুলতার দুর্মোহ বাতাবরণ সৃষ্টি করে। এটা তার স্বভাব। যে কোন বিষয়ে রবিশেখরকে বা তার মতামতকে উড়িয়ে দেওয়া ওর একপ্রকার স্বাভাবিক খেলা । আসলে, রবিশেখরের মধ্যে দ্বিতীয় যুক্তিটি মাথা তুলে জানায় মেয়েরা একটু চটুল স্বভাবের হলেই, বিশেষত আকর্ষণীয় সুন্দরী হলে, পরিবার, প্রতিবেশী, পুরুষধর্মী সমাজ এমন কি স্বামীটিও ভেতরে ভেতরে সন্ধিহান হয়ে একপ্রকার মরবিড আনন্দপায় । এটা আমাদের সংস্কৃতিতে সতীত্বের মিথ রক্তে বইছে বলে ।
প্রায় আট দশ বছরেই রবিশেখর শ্বশুড়বাড়ির শহরটা সম্পর্কে মানসিকস্তরে দ্বান্দ্বিক বিচ্ছিন্নতায় ভুগছে। কখনও কোনো দুর্বল মুহূর্তে ভেবে বসে । এ শহরে কি উৎপলার কেউ পছন্দের অতীত হয়ে নেই? কেউ বা কেউ কেউ? এতদিনেও সে শহরটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিতে শিখল না। বুবাইকে এখানে জন্ম দিয়েও নয় । বাইরের রক্ত মানুষ নিজের শরীরে আপন করে নিতে জানে । রবিশেখর কেন পারছে না? অথচ, ভাগলপুরের সঙ্গে তার সম্পর্ক অনেক বছর ধরেই ছিন্ন ।
আজ উৎপলা যে-ভাবে গন্ধর ব্যাপারটা দুহাতে ঠেলে, বেরিয়ে গেল—ঠিক কাজ করেনি। একটা সুতির নাইটি কিনতে যাওয়া কতটা আশুপ্রয়োজনের? নাকি এসব তার অজ্ঞতার পরিচয়। মানুষ বচায় না সর্বদাই আধুনিক চারপাশে আমরা ব্যাধির শিকারের অপেক্ষা করছি। বলা চলে, আমাদের ব্যাধিগ্রস্ত না করে কোনো আধুনিকতা টিকতে পারে না ।
ওর তো আবার ফাস্টফুডের ওপর লোভ। সকাল, বিকেল রাত বোলে কোনো বিশেষ সময় নেই । চাই, মোগলাই, রোল ,ফুচকা । ইদানীং দেখা যাচ্ছে বার্গারের ওপর নজর পড়েছে । হুকুম দিলে কোনো কোনো সময়ে রবিশেখকে বেরিয়ে টাটকা কিনে আনতে হয় । আর তেমনই হয়েচে বুবাইটা । মায়ের ইচ্ছায় সংক্রমিত হচ্ছে ।
ফের ঘরে এসে দেখতে পায় বুবাই বিছানায় মাথা রেখে চোখ বুজে । মাঝে মধ্যে ছোট ছোট হাই। রবিশেখর নিশ্চিত হয়। বউএর কাছে ছেলেকে ঘুম পাড়ানোর সাফল্যে প্রাইজ প্রত্যাশা করে।
রবিশেখর আপন রিডিং রুমটায় এসে ধপধপে ভুঁড়িটাকে ঘিরে পা-জামার আলগা বাঁধনটায়, ঈষৎ ঝুলন্ত চর্বির বুক দুলিয়ে সোফায় বসল। মুখোমুখি একটা আয়নায় মসৃণ টাকটির প্রতিচ্ছবিতে অবশিষ্ট কয়েকগাছা চুল ঠিকঠাক বসিয়ে দিল ।
পেজমার্কিং করা সেক্স-ম্যাগাজিনটায় ফের চোখ বোলাতেই গত রাতের শঙ্কাটি মনের মধ্যে কিলবিলিয়ে ওঠে। ভিখিরি হয়ে যাচ্ছে ভেতরে ভেতরে ? পুরুষালি কলকব্জাগুলো নিছকই ফাঁপা খোলসে পরিণত? গোপন চিকিৎসার একটি বিজ্ঞাপনে চোখ যেতেই মনে হল, একটু আগেই উৎপলার উড়ন্ত চুমুর ভঙ্গিটিতে কিছু আশ্রয় মিললেও ধীরে ধীরে গভীর সন্দেহ ঘিরে ধরে ।
ভিখিরিকে দুটো টাকা দিতে পারলে, বিবেক শুদ্ধি ঘটে যেমন, উৎপলা যেন ছলনায় কৃপা করল । এ শহরটা উৎপলার । এর সকল রহস্য উৎপলার উচ্ছলতা ওর বাপের বাড়ির প্রতাপ, পয়সা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ —রবিশেখর বুঝতে পারে জীবনের কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মেরামতি করা যায় না । তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল ।
ঘুমুচ্ছিলে চক্রবর্তী? দাশগুপ্ত বলছি ।
হলটা কি? ঘুমুব কেন?
সিরিয়াস ব্যাপার! একটু বেরুতে পারবে?
এই দুপুর রোদে! হঠাৎ ?
দাশগুপ্ত বলে, হঠাৎ-হঠাৎই কখনো এইসব মোকাবিলা করতে হয় ।
খোলসা করো, সংকেতে সবকিছু চট করে ধরতে পারি না ।
দাশগুপ্ত বলে, এটা তোমার বিনয় জামাই! … যাকগে! … শহরের ফ্লাইওভারটা যতই ঝকঝক করুক, নাল সাদার কোটিং পড়ুক …নিচে ভিখিরিগুলোর সংসার তো পুরোটা উচ্ছেদ করা যায়নি ! তাড়া খেয়ে ফের এসে জোটে ! …খোলা অবস্থাতেই জন্ম হাগামোগা…রোদের মধ্যেই ভাত ফোটানো, থালা বেরে খাওয়া …গন্ধটা যে ঝোল ভাতে চটকে যাচ্ছিল কেউ খেয়াল করেনি !
‘জামাই’ সম্বোধনে পরিশেখর চটপট পরিহাস মনে হলেও—যদিও দাশগুপ্তর মতো দু-চারজন তাকে সম্পর্কের এ সম্বোধনে প্রায়ই চিহ্নিত করে—গন্ধ এবং খাদ্য মিশে শারীরিক থ্রেটের আশঙ্কায় রবিশেখর বলে, গিলেছে? …তারপর টনসিল ফুলে …কথা বন্ধ …ভেতরের কথা জানাতে পারছে না তাই তো?
ঠিক-তাই! …ফুল বোবা … একটিবার আসতে পারবে? তোমার তো গাড়ি আছে! গাড়ি সার্ভিসে ভাই! …তাতে আটকাত না…ফ্ল্যাটে একা যে? ছেলে একা!
মিসেস?
মার্কেটিং! …জরুরি ছিল।
ফিরতে ফিরতে !
রবিশেখর চক্রবর্তী এবার ছোট্ট খোঁচা দেয়।
ডাক্তারবাবু, তোমারওতো ঘরে ‘একটি মাত্রর’ মিসেস! …মার্কেটিং এ গেলে কখন ফিরবে জানতে পারো?
যাক, এটা তো সিরিয়াস কথা বললে…চিকিৎসা শুরু হয়েছে?
দেখছি । …ভাইস প্রেসিডেন্টকে জানাই এবার!
দাশগুপ্ত কেটে দিল । প্রেসিডেন্ট চক্রবর্তীর আর ম্যাগাজিনে চোখ বোলানো হল না । কমজুরি পৌরুষের দুর্মর আশঙ্কাও চট করে প্রসঙ্গন্তরে হারিয়ে যায়।
দুপুর থেকেই রবিশেখর বাতাসে বিপজ্জনক গন্ধটি টের পাচ্ছিল । তাইতো উৎপলাকে জানানো । সে পাত্তা দেয়নি । তাচ্ছিল্যে উপরন্তু ছেলেমানুষ ভাব দেখিয়ে চলে গেছে । যদি বাইরে গিয়ে হুজুকে কোনো ফুটের খাবার —ফুচকা, রোল বা ভাজাভুজি খেয়ে ফেলে? বাঁচোয়া লাঞ্চ সেরে বেরুনোয় সন্ধ্যে অবধি নিশ্চিত । কিন্তু ওর যা স্বভাবের মতিগতি, হয় তো রাত করে ফিরল। আর ফাস্ট ফুডের আকর্ষণে গোপনে অসুস্থ হতে থাকে যদি?
বাঁচোয়া, শত-তাপ নিয়ন্ত্রণে এইসব গন্ধ খুব ক্রিয়াশীল থাকে না । আর শহরটার উন্নয়নের জোয়ারে দোকানপাট ইদানিং অধিকাংশই সেন্ট্রাল এ.সি —কিন্তু উৎপলা চটুল, একটু বেপরোয়া, ফুটে কিছু দেখলেই লোভ সামলাতে পারে না ।
এদের ছোট্ট সংসারটির নাম ‘ফিউচার’ — বাংলায় তো ‘আগামি’ ‘ভবিষ্যৎ’ ‘অনগত’ ইত্যাদি শব্দে অনুদিত হতে পারে । একবার সদস্যদের কোনো বছরের ভাষাদিবসে একটা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল । কিন্তু ‘ফিউচার’ এর ঠিকঠাক বিকল্প স্থির হয়নি । তাই ছোটখাট বেসরকারি সেবামূলক সংস্থাটি ‘ফিউচার’ হিসেবে সাধারণ মানুষের ‘কটাক্ষ’, ‘সন্দেহ’ বা প্রশংসা ভালোবাসার চৌদ্দটি বছর কাটিয়ে দেয়। গড়ে উঠেছিল যখন, সারা দেশের কৃষিজমি ও শিল্প আন্দোলনের চাপান উতোর তুঙ্গে চলছিল ।
‘ফিউচার’ -এর কার্যকল্পনা, কর্মসূচী খুব জাঁকজমকপূর্ণ নয়। বলা চলে ছোটখাট একটি সংস্থা। রেজিস্টার্ড ও ছোটখাট একটি অফিসও আছে । শহরের স্টেশন এলাকার ব্যস্ততম অঞ্চলে নয় তা, পরের রেলস্টেশনটির অপেক্ষাকৃত কম দ্রুত বদলানো অঞ্চলে (G+4) টাইপের ফ্ল্যাটে ছোট একটি ঘর ভাড়ায় আছে । গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে একটু উঁচুতে —বলতে গেলে দেড় তলায় । ঘরটি পরিকল্পনার ত্রুটিতে বা উদ্দেশ্যেই হোক — কোনো কোচিং সেন্টার বা দোকান ঘরকে ভাড়া দেওয়া সম্ভব ছিল না । এরিয়াটা একটি মারোয়াড়িদের সোসাইটি একশ বছর ধরে প্রায় একশ একর জমিতে গো-পালনের সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত । দেশভাগের পর, বাস্তুত্যাগীদের ঝাঁকে ঝাঁকে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে, বড় বড় সাতাশটি কলোনি বলনে গেলেও, সংস্থার একছটাক জমিতেও কেউ কোনো তাঁবু ফেলতে পারে নি ।
ষাট-সত্তরের দশকে শহর ক্রমশ ছড়াতে, অপেক্ষাকৃত ছোট রেলস্টেশনটি ঘিরে জনবসতি বৃদ্ধি পেতে থাকলে, সোসাইটির কর্তৃপক্ষ পাঁচিশ-ত্রিশ একর জমি বিক্রি করে দিলে, দোকানপত্তর, ঘরবাড়ি নতুন নতুন পাড়া জন্মে এলাকাটি জমজমাট এবং শহরের পৌরসভার অভ্যন্তরেই তিন চারটি ওয়ার্ড । তারকেশ্বর দাশগুপ্ত হাজারিবাগের মানুষ, একসময় সোসাইটির পশুর ডাক্তারহিসেবে কর্মরত ছিল । এখন রিটায়ার্ড । শহরে এখন কুকুর-বিড়ালের ক্লিনিক বাড়বাড়ন্ত । ডাক পেলে অপারেশন করতে যায় । বাকি সময়ে মানব সন্তানদের —বিশেষত ফুটপাত, রেলস্টেশন, বাজার আশ্রয় হীনদের সেবায় ‘ফিউচার’ এনজিওটি গড়েছে ।
ক্রমশ…
❤ Support Us








