- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- মে ১৫, ২০২২
বিন্তির ন্যাড়া মাথা ও উজানের কই
পর্ব ২
অলঙ্করণ: দেব সরকার
ব।ড়ো।গ।ল্প
দু ই
এই গল্প পড়ারও একটা গল্প আছে, এদের সবারই এক জায়গায় মিল আছে, জুরি আর সুমিতা ছাড়া সবাই গল্প কবিতা লেখে। আর দেবেশচন্দ্র সাগ্রহে শোনেন, একমাত্র মনোযোগী শ্রোতা তিনি। সুমিতা বিবাহ নিবন্ধক হলেও যুবক যুবতিদের খুব পছন্দ করেন, তার বাড়ির আড্ডায় ব্যবস্থা করেন ভুরিভোজের। তবে সবারই এক একটা শর্ত থাকে, সুমিতার শর্তটি হল নন্দিনী।নন্দিনীকে নিতে হবে দলে। সুমিতার বাল্যবন্ধু নন্দিনী কিন্তু শর্তের ধার ধারেনা, সরাসরি ঢুকে যায়দলে গল্পের তাড়া নিয়ে। দেবেশচন্দ্রের অবসর সময়ে এদের সাহচর্যে কেটে যাচ্ছে মন্দ না। ছেলেমেয়ে হীন সংসার এখন ভরভরন্ত। তবে ইদানীং তার শখ হয়েছে একটা ছোটো পত্রিকা করার,যেখানে তারা তাদের লেখালেখি ছেপে বের করতে পারবে, অর্থ চিন্তা যাতে চমৎকার না হয়, তাই তিনি সুমিতার সম্মতি ছাড়াই বিবাহ নিবন্ধকের নামে পাঁচ হাজার টাকার বিজ্ঞাপন ঘোষণা করে দিয়েছেন। কথা হয়েছে গোলকগঞ্জ অধিবেশনেই গল্প কবিতার পাঠ হবে, নির্বাচনও হবে। পত্রিকার নাম ঠিক হবে, প্রকাশকালও স্থির হবে বছরে দুটো না চারটে। তারপর তো ডিটিপি আছে, প্রেস আছে। তবে নন্দিনী এরকম ব্যবস্থায় রাজি নয়, শুধু তাদের লেখা থাকলে পাঠক পাওয়া যাবে না।
— তাহলে উপায়?
— কলকাতা শিলিগুড়ি মাথাভাঙ্গা কোচবিহারের কবি সাহিত্যিকদের লেখা নেওয়া যায়।
মৃন্ময় বলে,
— আমরা তো কাউকে চিনি না।
— চিনতে কতক্ষণ?
বাসবী বলে,
— আমি চিনি কয়েকজনকে উত্তরবঙ্গে।
— বা, কী নাম বলতো, লিখে রাখি?
— আমাদের পাড়ায় বাড়ি সমীরদা, সমীর চট্টোপাধ্যায়, তমসুক সম্পাদক, স্বনামধন্য কবি, প্রলয় নাগ গল্প লেখে, গৌতম গুহরায় কবি, শুভময় সরকার গল্পকার সম্পাদক, সঞ্জয় সাহা একের মধ্যে অনেক কিছু, একেবারে বারুদের প্যাকেট কবি গল্পকার প্রাবন্ধিক তিতির সম্পাদক, রোমান্টিক কবি সঞ্জয় সোম,যুবা কবি ও কথাকার সুবীর সরকার, কবিনী পারমিতা চন্দ ও পাপড়ি গুহ নিয়োগী।
— এদের কাছ থেকে লেখা আনতে পারবে?
— চেষ্টা করতে পারি।
— আর কলকাতার? জয়গোস্বামী,শঙ্খঘোষ,সমরেশ মজুমদার,অমর মিত্র,অভিজিত সেন, অনির্বাণ বসু, সুকান্তি দত্ত, শুভঙ্কর গুহ, হামিরুদ্দিন মিদ্যা । পবিত্র সরকারের লেখাও চাই।
— এই তো! কলকাতা না গেলেই না?
— মালদা বালুরঘাটও তো আছে। তৃপ্তি সান্ত্রা, বিশ্বরূপ দে সরকার, বিকাশ রায় গৌহাটি শিলচর থেকেও লেখা পাওয়া যাবে। ভাষাতাত্ত্বিক তপোধীর ভট্টাচার্য সুকুমার বাগচী । অদম্য সাহায্য করবে?
— অদম্য কি আসামের ছেলে নাকি?
— না হলেই বা। আসাম বাদ দিয়ে হবে নাকি?
— ঠিক আছে প্রথম সংখ্যা উত্তরবঙ্গ দিয়েই হোক। কিন্তু এই টাকা দিয়ে তো হবে না, আরও চাই।
মৃন্ময় বলে,
— সে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে কাকু, বাবাকে পটিয়ে বের করব কিছু।
— বাবা কেন? তোমার গৃহিণী পারবে না? জুরি তো ব্যাঙ্ক এ চাকরি করে, বিজ্ঞাপন একটা দুটো পারবি না?
— হু, পারব কাকু।
জুরি মেয়েটি ভালো, গাড়িতে আসতে আসতে আলাপ। কম কথা কয়, কিন্তু হাসে। এরা সবাই উত্তরবঙ্গের বাঙালি। ওপার বাংলা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে, আসামেও আছে বাড়ি, দেশভাগের পর পিতৃপুরুষ এসেছিল বরাকপারে, কেউ কেউ ব্রহ্মপুত্রপারে, সুরক্ষিত একটা স্থায়ী ঠিকানা রাখতে কলকাতা কিংবা উত্তরবাংলায়ও জমি কিনে রেখেছে সবাই। এরা কি তবে পাখির জাতি, পক্ষী এদের কূলচিহ্ন, হেমাঙ্গ বিশ্বাস গানওলা তো তেমনই লিখেছিলেন সিলেটের জালালি কবুতরের কথা, কলকাতায় উড়ে আসার কথা, মাঝখানে ছিল যাত্রাবিরতি বরাকপারে ব্রহ্মপুত্র পারে, চূড়ান্ত গন্তব্য কইলকাত্তা মানে পশ্চিমবঙ্গে, কলকাতা শিলিগুড়ি কোচবিহার আলিপুরদুয়ার। যেমন নন্দিনী এসেছে গুয়াহাটি থেকে, মিশ্র সংস্কৃতিতে মানুষ হয়েছে। ‘উই আর ইন দা সেম বোট ব্রাদার’ হয়ে ‘হাজার টাকার বাগান খাইল পাঁচ সিকার ছাগলে’ থেকে পেপার সুরে টানতে পারে ‘বিহুরেনো বিরিনা ও আইতা’, যেমন অসমিয়া বাঙালির মিলিঝুলি সংসারটা টানতেন ভূপেন হাজারিকা। বাসবীর যেমন গান গাওয়ার প্রস্তুতির দরকার, নন্দিনী কিন্তু এক কথায় রেডি, যেমন রেডি মৃন্ময়ও তার সর্বক্ষণের ডুগি নিয়ে, ট্রেনের কামরা থেকে গ্রামে গঞ্জে হাটে মাঠে যেখানেই গানকে ছুটতে দেখে সেও তার ডুগি নিয়ে দৌড়োয়, সঙ্গত করে। সিদ্ধার্থ কবিতা লেখে এলআইসি অফিসেরগাড়ি চালায়, দেবেশচন্দ্র চাকরিতে থাকাকালীন ঢুকিয়েছিলেন। সে সর্বঘটে কাটালি কলা, সবার সব কাজ করে দেয়, সবাইকে দাদাদিদি ডাকে। মৃন্ময়কে মিনুদা বলা আর হয় না কারণ মৃন্ময় তার থেকে অনেক ছোটো, যদিও জুরিকে যথারীতি বউদি ডাকে, এসব এক্সকারসন হলে সে ছুটি নিয়ে নেয়। বউকে সঙ্গে আনে না দীর্ঘাঙ্গ পুরুষ সিদ্ধার্থ, মৃন্ময়কে বলেছে, বউ খুব বেঁটে তাই কোথাও সঙ্গে নেয় না। হোটেল বলতেও দোতালায় সাকুল্যে পাঁচখানা ঘর। সবকটাই নদী ফেসিং। বণ্টনে একটু অসুবিধা হওয়ার কথা। দেবেশচন্দ্র সুমিতার জন্য বড়ো ব্যালকনির এক নম্বর ঘর, দুনম্বর মৃন্ময় জুরি, দেবেশচন্দ্র বলেছিলেন নবদম্পতিকে এক নম্বর ঘরটা দেওয়ার কথা, মৃন্ময় রাজি হয় নি। ড্রাইভার সিদ্ধার্থের জন্য একঘর, বাসবীর জন্য একটা, নন্দিনীর এক, হয়ে গেল পাঁচ। এবার যখন নলিনী অদম্য ফিরবে, আরও তো দুটো ঘর চাই। তাই বাসবী আর নন্দিনী এক ঘরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।যদিওঅদম্যকে নিয়ে সমস্যা নেই, সে তো হোটেল মালিকের ভাগ্নে,ব্যবস্থা একটা করে নিতে পারবে। আর যদি আজই ওদের বিয়ে রেজিস্ট্রি হয়ে যায় থাকবে একঘরে।তবে এতসব জটিল অঙ্কের বোধহয় আর প্রয়োজনই নেই, কারণ রাত সাড়ে সাতটায়ও যখন ওরা এলো না তখন সবাই ধরে নিল হয়তো আর এলোই আর না। গোলকগঞ্জের মতো গ্রামশহরে সন্ধ্যে হতেই যানবাহন নিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়।
বড়িয়লি মাছ ভাজা আর ঝোল, সঙ্গে ডাল সবজি আর মুরগি কারির জমজমাট নৈশ ভোজের মেনু থেকে শুধু মুরগির ঝোল ভাত খেয়ে সিদ্ধার্থ ঘুমোতে চলে যায় তার নির্দিষ্ট ঘরে। হোটেলবয় মিজানুরকে হাত করে মুরগি ঝোলভাত নয় প্লেট ওয়েটিংএ রেখে দেয় ট্যুর ম্যানেজার মৃন্ময়, যখনই খাওয়া হবে গরম করে দেবে। তবেই টিপস হবে যথাবিহিত । নৈশাহারের ব্যবস্থা হয়ে যেতেই দেবেশচন্দ্র ছ’জনের দল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন শহরের নৈশ দর্শনে, টিপ টিপ বৃষ্টি পড়লেও মন্দ লাগে না ভ্রমণ। হোটেলের পাশেই নদীর পারে কুলেশ্বরী কালীবাড়ি। রাত আটটা পর্যন্ত ভক্ত সমাগম চোখে পড়ার মতো, খুব জাগ্রত মন্দির। কিছু কিছু ভক্ত আবার কারণসিক্ত। ছ’জনের দলকে শহরে নতুন দেখে এক কৃষ্ণদর্শন যুবক মৃন্ময়কে হাত ধরে নিয়ে যায় মন্দিরের ভিতর।বলে, দেখুন,আহা এমনটি দেখেছেন কোথাও? মায়ের এতো রূপ! মৃণ্ময় দেখে মাতৃমূর্তির গায়ে জ্বল জ্বল করছে স্বর্ণালঙ্কার, দক্ষিণাকালীর গায়ে এত গয়না সচরাচর দেখা যায় না। তাই দিগম্বরী মূর্তি হলেওএকটা সম্ভ্রম জেগে ওঠে দর্শণে। দেবেশচন্দ্রও ততক্ষণে সবাইকে নিয়ে পৌঁছে গেছেন অকুস্থলে। ছেলেটির নাম শনি, সারাদিন টোটো চালায়, রাত হলেই মায়ের সেবায় সেবনে হয়ে ওঠে ভক্তপ্রধান , সে মন্দিরেই থাকে। বলে,
— আপনারা এত দেরি করে এলেন কেন? এক্ষুনি মন্দির বন্ধ হয়ে যাবে। শয়ন আরতির পর তালা লাগিয়ে দেওয়া হবে, তখন আর মাকে কেউ দেখতে পায় না।
— আর এত এত ভক্ত?
— ভক্তজন একমনে মাতৃ আরাধনা করে চলে যাবে নটার মধ্যে। সবই তো লোকাল।
— আর মায়ের পুজো?
— ওসব সন্ধেবেলা শেষ হয়ে গেছে।
— কালীপূজা তো শেষ রাতে হয়।
— কূলেশ্বরী মায়ের পুজো তাড়াতাড়ি হয়ে যায়।
— মা শয়নে চলে যান।
— না স্যার, মায়ের ঘুম হয় না, সারারাত জেগে থাকেন।
— সে কী রকম?
— দেশভাগের সময় থেকে হয়ে আসছে। একই নিয়ম । ওপার রংপুর থেকে নৌকো বোঝাই শরণার্থীরা এপারে আসে রাতে। মা কাউকে ফেরান না। মা তখনও ছিলেন জাগ্রত এখনও তাই। শরণাগত শরণার্থীকে পৌঁছে দেন যার যার ঠিকানায়।
— কিন্তু তিনি তো তালা বন্ধ মন্দিরে?
— কাকু, আপনার বুদ্ধি আছে।
— এখন তোমার বুদ্ধি দেখাও।
— তাই দেখাতেই তো নিয়ে এলাম, ওই দেখুন তাকিয়ে ছাদের দিকে।
শনি মাতৃ মূর্তির উপরে মন্দিরের গম্বুজের দিকটা দেখায়, ছয় জোড়া চোখ তাকায় কিন্তু কিছুই দেখে না। তবু শনি বলে,
— মায়ের আসনের ঠিক উপরের ছাদে আছে এক মানুষ সমান ফাঁক।
— কোথায়?
— ওই যে দেখুন।
— কিছুই তো দেখছি না হে বাপু ।
— অভক্ত দেখতে পায় না, তাই আপনারা দেখতে পাবেন না। কাকীমা দেখুন তো?
— হ্যাঁ হ্যাঁ দেখা যাচ্ছে।
সুমিতা দুষ্টুবুদ্ধিতে বলেন দেখতে পারছেন, তাঁর দেখাদেখি বাকি পাঁচজনও অভক্ত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চায় না। তখন শনি বলে,
— তাহলে বলুন, কালী মাইকি জয়।
সমবেত ধ্বনি শুনে সে বলে,
— ওই ফাঁক দিয়ে মা চলে যান, আবার ফিরে আসেন ভোরে।
— এখন তো কিছু নেই, দেশভাগ তো হয়ে গেছে কবে?
— না, এখনও আসে আসাম থেকে। আসে ডি ভোটার হয়ে, ট্রাইব্যুন্যালের চিঠি পেয়ে, এনারসি ফেইল করে গোলকগঞ্জ চলে আসে রাতের অন্ধকার, ভোরের আগে মা তাদের পশ্চিম বাংলার ভিতর ঢুকিয়ে দিয়ে আসেন নিরাপদে ।
— পশ্চিমবাংলায় তো তেমন খবর নেই, কোনো শরণার্থী শিবিরও নেই।
— ওরা পশ্চিমবাংলায় থাকে না, চলে যায় বোম্বাই ব্যাঙ্গালুর হায়দ্রাবাদ চেন্নাই।
তবে টলটলায়মান শনিঠাকুরকে দেখে সুমিতা দেবেশচন্দ্রকে ডাকেন চুপিচুপি। বলেন,
— দেখো, আমার ভাইপোর কেমন উচাটন হচ্ছে।
— কে ? মৃণ্ময় ? বলব নাকি নিয়ে আসতে?
— কোথায় পাবে এত রাত্রে? সব বন্ধ এফএল অফ শপ।
— তাহলে?
— শনি আছে না, ওকে বলো ম্যানেজ করতে।
সুমিতা স্বামীর প্ররোচনায় মৃন্ময়কে কিছু একটা বলতেই সে উৎসাহিত হয়। শনিকে নিয়ে বেরিয়ে যায়, ফিরেও আসে হোটেলে সরাসরি বোচকা বুচকি নিয়ে, থামস আপ ফান্টা ভদকা হুইস্কি আর বাদাম চানাচুর চিপসের প্যাকেট সহ।
ক্রমশ..
❤ Support Us








