Advertisement
  • ন | ন্দ | ন | চ | ত্ব | র
  • আগস্ট ২৫, ২০২৫

বরাককন্যার কবিতাগ্রন্থের বিশ্বভ্রমণ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বরাককন্যার কবিতাগ্রন্থের বিশ্বভ্রমণ

২০২৪ সালে আসাম থেকে বাংলা কবিতা লেখার জন্য সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার পান সুতপা চক্রবর্তী। মৌলিক ও সৃষ্টিশীল লেখার জন্য তিনি ই প্রথম এই পুরস্কার পেয়ে আসামের বাংলা কবিতার মুখ উজ্জ্বল করেন। সুতপা পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁর ‘দেরাজে হলুদ ফুল, গতজন্ম ’ (২০২২) বইটির জন্য। কিন্তু পাঠকদের কাছে তাঁর যে বইটি সবচেয়ে বেশি বিখ্যাত সেটির নাম ‘ভ্রমরযান’। ‘ভ্রমরযান’ লেখা হয়েছে সিলেটের বাংলা ভাষায়। বইটির ব্যাপারে সুতপার ভাবনা জানতে গেলে সুতপা আমাদের লিখে জানিয়েছেন –
 
” আমার ঠাম্মা সূচিশিল্প জানতেন। পুরোনো শাড়ির পাড় থেকে সুতো বের করে সোনামুখি সুঁচ দিয়ে এইসব হাতের কাজ করতেন ঠাম্মা। আমি লেপ্টে বসে দেখতাম। ঠাম্মার যুবতী বয়সের করা এরকম বহু হাতের সেলাই করা কাজ ঠাম্মা আমায় দিয়ে গেছেন। যেমন করে দিয়ে গেছেন ঠাম্মার দিদিশাশুড়ির আমলের সন্দেশের সাজ, আমসত্ত্ব বানানোর কাঠের নকশা করা হাতা, বহুকাল ধরে বাড়িতে পড়ে থাকা একটি কালো ভোমরা পাথর আর একটি লালপেড়ে শাড়ি। ঠাম্মা আমার গল্প হত এরকম, মানুষ মারা গেলে কোথায় যায়? ঠাম্মা বলতেন, আমি মারা যাওয়ার পর তোমায় এসে বলে যাব। আমি সেকথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম। ঠাম্মা যে সময় মারা গেলেন তখন তার চারপাশে কেউ ছিল না। সকাল থেকে শরীর খারাপ ঠাম্মার। সবাই ঘিরে রেখেছে।একটা সময় সবাই একটু নিজেদের কাজে অন্যঘরে গেছে। আমার কোলে ঠাম্মার মাথা।ঠাম্মা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি। ঠাম্মার দু-চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।আমি জল মুছতে যাব, ঠিক তখন খুব আস্তে করে আমার দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন! এরপর আর কিছু নেই। আমি সারারাত ঠাম্মার মৃতদেহকে জড়িয়ে শুয়েছিলাম।
 
না ঠাম্মা কথা রাখেন নি। মৃত্যুর পর ফিরে এসে একটিবারও বলেন নি এখন তিনি কোথায় থাকেন। শুধু মৃত্যুর পর বহুদিন আমার মনে হত কেউ খুব অস্পষ্টে কোথাও ‘মণি’ বলে ডাকছে! এখন সেটাও আর মনে হয় না। শুধু মাঝেমধ্যে রাত দুটোয় ঘুম ভেঙে যায়।ঠাম্মা খুব চাইতেন আমি যেন লেখিকা হই।লুকিয়ে কখনও বা প্রকাশ্যে প্রচুর বই পড়তেন। ঠাম্মার এই অদ্ভুত চাওয়ার প্রতি আমার কোনো আগ্রহ ছিল না। আমার মাথায় ছিল আমি ফ্যাশান ডিজাইনার হবো।প্যারিস যাব। আমি দিনরাত ছবি আঁকতাম। ইন্ডিয়ান ওয়েস্টার্ন বিভিন্ন ডিজাইন তৈরি করতাম। চুল কেটে যাচ্ছেতাই করেছিলাম। ওয়েস্টার্ন পোশাক ছাড়া অন্যকিছুতে মন উঠত না। ঠাম্মা বলতেন, চুল বড় রাখলে মুখখানা লক্ষ্মী লক্ষ্মী লাগে। আমি বিদ্রোহ ঘোষণা করতাম।ঠাম্মা নরম মানুষ। চুপ হয়ে যেতেন। এখন , এতবছর বাদে নিজেকে পুরোনো আমির সাথে আয়নার সামনে দাঁড় করালে চিনতে পারি না। একটা মানুষ এমন ভয়ানকভাবে পালটে যেতে পারে নিজেকে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারতাম না।খুব ইচ্ছে করে এখন একবার ঠাম্মার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। আমি শান্ত হয়েছি, চুপ হয়ে গেছি, শাড়ি পরি, চুল বড় রেখেছি, ফ্যাশান ডিজাইনিংকে কোথায় ভাসিয়ে দিয়েছি —এসব ঠাম্মাকে একটিবার দেখাতে চাই।
 
‘ভ্রমরযান ’ আমি দু’দিনে লিখেছি। আমি আমার জীবনে আর দ্বিতীয় কোনো ‘ভ্রমরযান’ লিখতে পারবো না। দাদুভাইয়ের মৃত্যুর পর অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। আমার তখন বারবার মনে হচ্ছিল আমি দাদুভাই ঠাম্মা’র কাছে যাব। ঠিক যেভাবে একবার দাদুর বাড়ির বড়রাস্তার সামনে দিয়ে মা-বাবার সাথে মেলায় যাওয়ার সময় আমি মা-বাবা’র হাত ছেড়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে দাদুভাই ঠাম্মার কাছে চলে গেছিলাম ঠিক সেরকম ছুটে যেতে ইচ্ছে করছিল। সেই তীব্র ইচ্ছে থেকেই এই ‘যান’ টি তৈরি হয়েছে।আমার পৃথিবীর সাথে আমার দাদুভাই ঠাম্মার পৃথিবীতে যাওয়ার একমাত্র বাহন ‘ভ্রমরযান’! ”
 
অতি সম্প্রতি ইংরেজি ভাষার ভারতীয় কবি ও অনুবাদক রাজর্ষি পত্রনবিশের অনুবাদে সুতপার ‘ভ্রমরযান’ ইংরেজি ভাষায় ‘The Hornet’s Trail’ নামে প্রকাশিত হল আমেরিকা টেক্সাস এর নামী প্রকাশনা Transcended zero press থেকে। যে প্রকাশনের কর্ণধার আমেরিকার একজন বিখ্যাত কবি ডাস্টিন পিকেরিং। প্রসঙ্গত, আমাদের জানা মতো সুতপাই আসামের প্রথম কোনো বাঙালি কবি যাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ বের হল আমেরিকা থেকে।
 

 
অনুবাদক রাজর্ষি পত্রনবিশ আমাদের জানিয়েছেন তিনি নিজে wiccan দর্শনে বিশ্বাসী আর প্রায় তাঁর ১০ টা ইংরেজি কবিতার মৌলিক কবিতার গ্রন্থ আছে, তার সাথে এ ছাড়া প্রায় ৪ টে অনুবাদের বই আছে। তিনি অসমীয়া কবিতা থেকে ইংরেজি বাংলা দুই-ই অনুবাদ করেছেন। তা ছাড়া বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় এর Gas Chamber নামক উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। তবে তারপরের গুলোতে তিনি নিজেই নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। শবরী রায়ের বুদ্ধ ও শূন্য, যা অনূদিত হয়ে Buddha and Void হয়েছিল। এটি ছিল তাঁর সাম্প্রতিককালের অনূদিত সবচাইতে শক্ত কাজ। শক্ত কারণ ওই কবিতাগুলোকে আক্ষরিক অনুবাদ, ভাবানুবাদ কিছুই করা যায় না। তাঁকে সেগুলোকে Transcreate করতে হয়েছে। অংশুমান কর সম্পাদিত The Lost Pendant যা কিনা পার্টিশন কবিতার অনুবাদ, সেটিও একটি অনবদ্য সংকলন। ৬ জন অনুবাদক মিলে কিছু বিখ্যাত বাংলা কবিতাকে ইংরেজিতে রূপ দিয়েছিলেন। তাঁর কথায়, সেটি Satisfying experience বললে কম বলা হয়। তবে ‘ভ্রমরযান’ তাঁকে সবচেয়ে বেশি বেগ দিয়েছে। রাজর্ষি পত্রনবিশের শেকড় শিলং -এর। বাবার লেখাপড়া শিলং-এ। সিলেটের ভাষা খানিকটা খানিকটা করে বোঝেন।
 
‘ভ্রমরযান’ সম্পর্কে রাজর্ষি পত্রনবিশের অনুভব তাঁর ভাষায় এরকম,
 
” সুতপার সঙ্গে আমার চাক্ষুষ আলাপ আজও হয় নি। সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু ছবি আর দুই একবার ফোনে কথা বলা ছাড়া ওর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয় নি বললেই চলে। তবে আমিও কবি। যদিও ইংরিজিতে সাধারণত লিখি, তবু কবিতার সাথে খুব ওতপ্রোত ভাবে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে আছি, আর সেই সুবাদেই বলি: সুতপাকে আমি খুব অন্তরঙ্গ ভাবে চিনি কারণ ওর ভ্রমর আমার মধ্যে বাস করে। ওর শৈশব, ওর ঠাকুমা, ওই বাড়ি সব কিছুই আমার ভেতরে একটা গ্রামীণ চিত্র তৈরি করে রেখেছে। আমি যদি এই দৈহিক জীবনে কবিকে নাও দেখি, আমি বুক ফুলিয়ে বলতে পারবো যে হ্যাঁ, আমি কবিকে চিনি। কতটা চিনি? যেমন এক সন্তান তার মাকে চেনে, ঠিক ততটাই আমার কবির সঙ্গে পরিচিতি। ভ্রমরযান কবির সন্তান বটে, কিন্তু তাকে অন্য একটা পরিচিতি দিয়ে সমগ্র বিশ্বের সামনে নিয়ে আসার যে অমোঘ অনুভূতি তাও ওভারলুক করলে কিন্তু চলবে না। ওই কবিতাগুলি তো কবির শৈশবের ছবি, সেগুলোকে নেড়ে কেটে আমি নিজের মতো করে নিয়েছি। আর আপনারা বলবেন আমি সুতপাকে চিনি না?
 
The Hornet’s Trail হল সেই চেনার পরিণতি। প্রথমবার যখন বইটা পড়ি, আমি প্রায় ডুবেই মরে যাচ্ছিলাম। কি ভীষণ গভীর লেখা, শুধু অনুভূতিই যে আসলে কবিতার আত্মা, এই বইতে তা প্রমাণ হয়। আর ভাগ্যিস আমি Wicca নিয়ে চর্চা করি, সুতপার কবিতার গভীর ইমোশনগুলি নিজের মতো করে ঢালতে পেরেছি। The Hornet’s Trail এর পিছনে প্রচুর মেহনত আছে, কিন্তু যেটা খুব বেশি করে আছে, হয়ত একটু overdose এ আছে, সেটা হলো ভালোবাসা। কবির আমার ওপর বিশ্বাস আর আমার কবিতাগুলির প্রতি অন্ধ প্রেম, এই দুই না থাকলে এই কাজ এরকম হয় না।
 
আমি চিরকাল মনে করি ট্রান্সলেশন একটি one man job, specially যদি আমরা কবিতার কথা বলি। কবিতা অনুবাদ করতে হলে তাকে কবি নিশ্চয়ই হতে হবে, তার সঙ্গে সোর্স ভাষা ও টার্গেট ভাষায় সমানভাবে পারদর্শী হতে হবে। তবেই কাজের মান বাড়বে। রিসোর্স পার্সন দিয়ে আর যাই হোক কবিতার আনুবাদ হয় না। তার থেকে না করাটাই শ্রেয়।
 
শেষে বলি, The Hornet’s Trail নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে খুব আশাবাদী। ভ্রমর খুব সরল ভাষায় শিলচরের গণ্ডি পেরিয়ে Hornet হয়ে বিশ্বের দিকে পাড়ি দিয়েছে। Let us all be a part of this journey. যানে চেপে চলুন trail টাকে trace করি। সুতপা, তুমিও চলো আমাদের সাথে…।”
 
চলুন, আমরাও সফরসঙ্গী হই


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!