- পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
- মার্চ ৮, ২০২৬
‘ ফাইভ এম সিন্ড্রোম’ কী ? কর্পোরেটে লিঙ্গসাম্য ও শ্রমের মূল্যে কোথায় নারীরা ?
২৪ বছরের বি.টেক উত্তীর্ণ মেয়েটি প্রথম কর্পোরেট অফিসে ঢুকে বেশ অবাক হলো । এযাবৎকাল সে যতগুলো শপিং মলে গেছে তার থেকে অনেক বেশি ঝাঁ চকচকে, পরিষ্কার বাথরুমে লাগানো দামি টাইলস, অটোমেটিক কল, অত্যাধুনিক হাত শোকানোর মেশিন এবং সর্বোপরি সেভেন স্টার হোটেলের থেকে কম কিছু নয় । বিলাসবহুল জায়গায় কাজ করতে কার না ভালো লাগে, এই আনন্দবোধ সঙ্গে নিয়েই যখন সে ইন্টারভিউ হলে ঢুকলো, বসে পড়লো নিজের সিটে, কয়েক মিনিট পড়শোনা ও ডিগ্রি নিয়ে কথা বলার পরেই ধেয়ে আসলো এমন কিছু প্রশ্ন যার জন্য সে প্রস্তুত ছিলো না । তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আগামীতে ফ্যামিলি প্ল্যানিং কী রয়েছে ? বিয়ে করার সিদ্ধান্ত আছে কি খুব শিগগরি ? নিয়মমাফিক কিছু ছুটি বরাদ্দ থাকলেও একনাগাড়ে বিবাহ বা মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়ায় কিছু সমস্যা রয়েছে, কোম্পানির ভবিষ্যত ইত্যাদি ইত্যাদি… !
এতক্ষণ এই বিবরণ পড়ে যদি মনে হয় কোনো ছোটগল্পের ভূমিকা তৈরি হচ্ছে, তাহলে সেই ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসাই শ্রেয় । কারণ শুনতে গল্পের মতো লাগলেও এই জবানবন্দি একবারে নিতান্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই ধার করা । বিবিসির একটি প্রতিবেদন (২০১৮ সালের) অনুযায়ী ১১০৬ জন কর্পোরেট সিনিয়র এক্সিকিউটিভের সাক্ষাৎকারে জানা গেছে যে তাদের মধ্যে অর্ধেক মনে করে একজন মহিলাকর্মীর ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় তার পারিবারিক গঠন, বিয়ে, সন্তান নিয়ে প্রশ্ন করা ন্যায্য । এমন বিষয় নিয়ে কর্পোরেট কাঠামোয় আলোচনা যদিও বে-আইনি, তবু এই সম্বন্ধীয় প্রশ্ন একরকম স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে । আইনের কথা যখন উঠলোই তখন একে একে দেখে নেওয়া যাক যে ভারতের আইন-আদালত কর্পোরেটে মহিলাদের সুরক্ষা, স্বাস্থ্য বা কাজের জায়গায় সমান সুযোগের জন্য কী কী নিয়ম বরাদ্দ করেছে গত দশ/পনেরো বছরে ?
প্রথমেই উল্লেখ্য ২০১৩ সালের পিওএসএইচ অ্যাক্ট (Prevention of Sexual Harassment of Women in Workplace), যেখানে বলা হচ্ছে ভারতীয় ভূখণ্ডে গড়ে ওঠা কোনো কোম্পানি, যাদের ১০ এর বেশি কর্মী থাকবে, আইসিসি (Internal complain committee) তৈরি করা তাদের জন্য আবশ্যক । যে কোনো কর্পোরেট কাঠামোয় কোন যৌন হয়রানির ঘটনায় যাতে সেই কমিটির নিরপেক্ষ তদন্তে এক সুরক্ষিত পরিবেশ বজায় রাখা সম্ভব হয় । অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪ সালের গবেষণা বলছে (Centre for Economic Data and Analysis) যে ভারতে অবস্থিত জায়েন্ট কর্পোরেট কোম্পানিগুলি, ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে র্যাঙ্কিং-এ যারা প্রথমদিকে, তারাই কেবল এই পিওএসএইচ অ্যাক্টের আওতায় জানানো অভিযোগকে গুরুত্ব দেয় । আকাশি চাওলা, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই নীতির কার্যকারিতা বা কর্পোরেট মহিলাদের অবস্থা নিয়ে কাজ করে চলেছেন, দেখাচ্ছেন যে ভারতের বেশিরভাগ মাঝারি বা ছোট কোম্পানিগুলিতে পিওএসএইচকে কেন্দ্র করে কোনো অভিযোগ নথিবদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না । অভিযোগ একেবারে না আসাও ইঙ্গিত করে যে যৌন হয়রানি বা লিঙ্গসাম্য নিয়ে যে পরিমাণ সচেতনতা থাকা উচিত, তা নেই বলে অফিসিয়ালি অভিযোগ দায়ের করা, সেই নিয়ে লড়ে যাওয়ার পরিবেশ সমস্ত কোম্পানিতে বিদ্যমান নয় ।
ভারতের মতো দেশে এই ধরনের আর্থিক প্রকল্পকে পুরুষদের বোধগম্যের বিষয় ভাবা হয়। বেসরকারি সংস্থায় প্রমোশনের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব নজরে আসে, কর্পোরেটে সিনিয়র পদগুলিতে মাত্র ১৮% মহিলা রয়েছে, যা মূল কর্মরত মহিলাদের তুলনায় বেশ অনেকটাই কম । চল্লিশোর্ধ পুরুষরা যে পরিমাণ পদোন্নতির সুযোগ পায়, মহিলারা কেন তা পায় না
বিবিসির প্রতিবেদনের কথা প্রথমেই বলেছি যেখানে বিবাহ, পরিবার বা সন্তান সম্পর্কিত প্রশ্ন সাক্ষাৎকারে ন্যায়সঙ্গত বলে ধরা হয়। আসলে এ কথা অস্বীকার করার জায়গা নেই যে কর্পোরেট / ক্যারিয়ার / পাবলিক লাইফ আমাদের পারিবারিক / ব্যক্তিগত জীবনের নীতি, নৈতিকতা বা মূল্যবোধের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। মনে রাখা দরকার, যে মানুষগুলি বোর্ড অফ ডিরেক্টরস এর আসনে বসে ইন্টারভিউ নেন তারা সমাজেরই বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে উঠে এসেছেন। আমাদের বাড়িতে, পাড়ায় বা আশেপাশে মহিলাদের ডোমেস্টিক বার্ডেন, সন্তান, পরিবার নিয়ে যে সমস্ত কথা একপ্রকার স্বাভাবিক বলে মনে করা হয় (পুরুষকর্মীর ক্ষেত্রে একেবারেই তা ব্রাত্য থাকে) তারই একটা লজিকাল এক্সটেনশন আমরা কর্পোরেট বোর্ড এ দেখতে পাই। কোনটা যৌন হয়রানি, ভার্বাল অ্যাবিউস কী জিনিস, কনসেন্ট কাকে বলে, শারীরিক ছোঁয়া ছাড়াও যে হ্যারাসমেন্ট হতে পারে, এই সম্পর্কিত সচেতনতা আমাদের দেশে নেই। আকাশি চাওলা দেখিয়েছেন যে সচেতনতা তৈরি না করে শুধু আইন পাশ করলে অবস্থাটা লায়বিলিটি বা দায়ের পর্যায় চলে যায়। তখন লিঙ্গ সুরক্ষা মানে কিছু ফর্মে নীল টিক আর সার্ভে করেই থেমে যেতে হয়।
অশোকা ইউনিভার্সিটি বিগত দশ বছরের পরিসংখ্যান নিয়ে একটি গবেষণা চালায়, সেখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসছে যেমন, যে পরিমাণ অভিযোগ দায়ের হয়েছে প্রত্যেক বছরে, তার তুলনায় সেই কেসগুলি আইসিসির অধীনে এসে কোনো সুরাহা পায়নি । অর্থাৎ রিপোর্টেড কেসের নম্বর বেশি হলেও, রিসলভড কেসের সংখ্যা অনেক কম । যেহেতু ন্যায় বা সমাধানের পথটি আশার আলো দেখায় না, তাই পিওএসএইচ এর মাধ্যমে লিঙ্গ সুরক্ষা সম্ভব, এ কথা হলফ করে বলা মুশকিল ।
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পিওএসএইচ কে খানিক পরিমার্জন করে এনডিএ সরকার এনেছে শি-বক্স (SHe Box) পোর্টাল । এটি একটি সেন্ট্রালাইজড ডিজিটাল রিপোজিটরি হিসেবে কাজ করবে, ইলেকট্রনিক বক্সের মাধ্যমে এখানে অভিযোগ দায়ের করা যাবে, সবটাই অনলাইন এবং কেন্দ্র দ্বারা পরিচালিত। সুতরাং আইসিসি, যেখানে কোম্পানির ভিতরেই অভিযোগের তদন্ত, সত্যতা যাচাই বা সুরাহা নিয়ে কাজ হতো, এখন সেটির সাথে যুক্ত হলো সরকারি সংস্থার ভূমিকা । এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের মতো ১০০ কোটির দেশে, কেন্দ্রীয় সরকার সুসংবদ্ধ ভাবে সারা ভারতের কর্পোরেট মহিলাদের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে, এই বিশ্বাস ধরে রাখা কঠিন । তাই পশ থেকে শি বক্সে এসে কতটা এগিয়ে মেয়েরা, সেই প্রশ্ন বিচার্য ।
২০২২ এ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম পেশ করেছিল গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট । এই রিপোর্টে সারা পৃথিবীর ১৪৬ টি দেশের মধ্যে ভারত লিঙ্গ সাম্যে অবস্থান করেছে ১৩৫ এ । এদিকে আইনের দিকে তাকালে পস, শি-বক্স ছাড়াও ১৯৪৮ এর মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট, ১৯৬১ সালে পাশ হওয়া মেটারনিটি বেনিফিট অ্যাক্ট এবং ইকুয়াল রেম্যুনারেশন অ্যাক্ট ভারতের মতো দেশে অনেক আগেই বলবৎ করা হয়েছে ।
স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিকে কর্পোরেটে বিশেষ সুবিধা বলে দাগিয়ে অত্যন্ত বাঁকা চোখে দেখা হয় । ‘বিশেষ সুবিধা ‘, এই শব্দদ্বয়ের মধ্যেই যদিও বিষম সমস্যা রয়েছে। গবেষকরা প্রায়শই বলেন যে, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা পিরিয়ড লিভকে ‘বিশেষ সুবিধা ‘ বলে চিহ্নিত করা মানে বকলমে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে ওয়ার্কিং স্পেস আসলে একটি পুরুষপ্রধান জায়গা এবং তাদের কথা মাথায় রেখেই এখানে নিয়মনীতি নির্দিষ্ট করা হবে
২৪ বছরের সদ্য বিটেক পাশ করা মেয়েটির ইন্টারভিউ অভিজ্ঞতা দিয়ে প্রবন্ধ শুরু করেছিলাম । এবার দেখে নেওয়া যাক মধ্যবয়সী কর্পোরেট মহিলাদের অবস্থা; ২০১৭ সালে মেটার্নিটি বেনিফিট অ্যাক্ট এ (১৯৬১ র আইনে বলা) ১২ সপ্তাহ সবেতন ছুটি বাড়িয়ে ২৬ সপ্তাহ ছুটি মঞ্জুর করা হয় । কোভিড লকডাউনের সময় ওয়ার্ক ফ্রম হোম একরকম স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায়, প্রসবকালীন ছুটিতে বাড়ি বসে কাজকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । এমনকি ২০১৭ র আইন অনুযায়ী পঞ্চাশের বেশি কর্মী থাকা কোম্পানিদের অফিসের চৌহদ্দির মধ্যে (বা খুব কাছে) একটি আলাদা ক্রেশের ব্যবস্থা করতে হবে । ওয়ার্কিং মাদার সেই ক্রেসে সারাদিনে চারবার যেতে পারেন । ২০২০ সালে, দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটি সমীক্ষা বলছে যে মেটার্নিটি বেনিফিট অ্যাক্ট কাজের জায়গায় সমানাধিকারের বদলে অসাম্য তৈরি করেছে অনেক বেশি । ১২ থেকে ২৬ সপ্তাহ সবেতন ছুটি মঞ্জুর হওয়াতে কর্পোরেট কোম্পানিগুলি বিবাহযোগ্য বা অদূরেই সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, এমন মহিলাদের নিয়োগ প্রায়শই এড়িয়ে চলেন । কর্মক্ষেত্রে এটি খুবই প্রচলিত ধারণা যে বিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব, সন্তান প্রতিপালন, মাতৃত্বকালীন ছুটি: এইসব ঝক্কির থেকে রেহাই পেতে একজন পুরুষকর্মী নিয়োগ করলেই হয়। ৩৫ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে মহিলারা কর্পোরেটে একপ্রকার অচ্ছুত, বলা হয় তারা ‘5 M syndrome’ এর শিকার: মেনস্ট্রুয়েশন, ম্যারেজ, মাদারহুদ, মবিলিটি ও মেনোপজ । সম্প্রতি কিছু কিছু রাজ্যে (কেরালা) যুক্ত হয়েছে মেনস্ট্রুয়াল লিভ, প্রাইভেটেও কতিপয় কোম্পানিতে মাসে দু-দিন ছুটি দেওয়া হয়, এছাড়া ৪৫ এর পর থেকে মেনোপজ সংক্রান্ত নানা শারীরিক জটিলতা, পরিসংখ্যান বলছে প্রভূত সংখ্যায় মহিলারা ৫০ এর পরে হিস্টরেক্টমি করতে বাধ্য হন । এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলিকে কর্পোরেটে বিশেষ সুবিধা বলে দাগিয়ে অত্যন্ত বাঁকা চোখে দেখা হয় । ‘বিশেষ সুবিধা ‘, এই শব্দদ্বয়ের মধ্যেই যদিও বিষম সমস্যা রয়েছে । কর্পোরেট আইন বা মেয়েদের সুরক্ষা / সমানাধিকার নিয়ে কথা বলা গবেষকরা প্রায়শই বলেন যে, মাতৃত্বকালীন ছুটি বা পিরিয়ড লিভকে ‘বিশেষ সুবিধা ‘ বলে চিহ্নিত করা মানে বকলমে এটা স্বীকার করে নেওয়া যে ওয়ার্কিং স্পেস আসলে একটি পুরুষপ্রধান জায়গা এবং তাদের কথা মাথায় রেখেই এখানে নিয়মনীতি নির্দিষ্ট করা হবে ।
২০২২ এর গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে সারা পৃথিবীর ১৪৬ দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান ১৩৫ । এই আইনের দিকে তাকালে পস, শি-বক্স ছাড়াও ১৯৪৮ এর মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট, ১৯৬১ সালে পাশ হওয়া মেটারনিটি বেনিফিট অ্যাক্ট এবং ইকুয়াল রেম্যুনারেশন অ্যাক্ট ভারতের মতো দেশে আগেই বলবৎ হয়েছে ।
আমরা সকলেই জানি যে আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত, চিন বা বিশ্বের প্রতিটি দেশের ইতিহাসে অফিসকর্মী বলতে প্রথমেই মহিলারা উঠে আসেননি । আমেরিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন প্রচুর সিভিলিয়ানরা সৈন্য হিসেবে চলে যায়, তখন সেখানকার কারখানা, দোকানপাট বা ব্যাংকে ফার্স্ট জেনারেশন মহিলারা গিয়ে চাকরি নেন । যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও তারা বুঝতে পারে যে একই কাজ করে তাদের সমবেতন দেওয়া হয় না কিংবা পাবলিক টয়লেট থেকে মেটার্নিটি লিভ, কোনকিছুই তাদের কথা মাথায় রেখে তৈরি হয়নি, কারণ গোড়া থেকেই অফিসের নিয়ম তৈরি হয়েছে কেবলমাত্র একটি লিঙ্গের চাহিদার কথা মাথায় রেখে। এই সব দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ একশো বছর ধরে পশ্চিমের দেশগুলিতে আন্দোলন চলেছে । কর্পোরেট অফিস, সরকারি অফিস, কারখানা, বাজার বা যে কোনো পাবলিক স্পেস যে শুধুমাত্র পুরুষদের জায়গা নয়, মহিলাদের শারীরিক এবং সামাজিক চাহিদা অনুযায়ী এই সমস্ত স্থানে পরিবর্তন আনতে হবে, এই ইনক্লুসিভিটির ধারণা এসেছে প্রথম বিশ্বে অনেক আগেই। কিন্তু মুশকিল হল এই পিওএসএইচ, শি-বক্স, মেটার্নিটি লিভ বা ক্রেসের ধারণা পশ্চিমের দেখাদেখি ভারতীয় আইনে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো ঠিকই, কিন্তু তা আদৌ কতটা কার্যকরী, কিভাবে তা ফলপ্রসূ করা যায়, সেই নিয়ে আলোচনা বা কাজ প্রায় হয় না বললেই চলে । ২০২৪ সালের দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদন বলছে, অফিসে ক্রেস না থাকায় কাজ ছেড়ে দেওয়া, সরকারি অফিসে ক্রেস নেই বলে বৃদ্ধ বাবা মায়ের কাছে সন্তানদের রেখে আসা, এমন অনেক দৃষ্টান্ত দেখা যায় । আইনের ধারায় ক্রেশ তৈরি করার কথা থাকলেও তা বর্তমানে হাতে গোনা কর্পোরেট কোম্পানিতে বিদ্যমান । এখন প্রশ্ন হলো ক্রেশ, মেটার্নিটি বেনিফিট বা পিরিয়ড লিভ যে বিশেষ সুবিধা নয়, বরঞ্চ খুব সাধারণ নূন্যতম কিছু চাহিদা, এই সচেতনতা পুরুষ কর্পোরেট কর্মীদের মধ্যে যতদিন না আসবে, ততদিন আইন পরিবর্তন করেও খুব একটা সুফল আশা করা যায় না ।
১৯৯১ এর মনমোহন পরবর্তী অর্থনৈতিক উদারনীতিবাদের হাত ধরে এই ইন্ডাস্ট্রি যখন সবে সবে গজিয়ে উঠছে, তখন যারা প্রথম প্রজন্মের মহিলা চাকুরে, তারা আজ সকলেই ষাট বছরের দোরগোড়ায় । কর্মী সুরক্ষা আইন, পেনশন বা আরও নানা বিষয় এই প্রবীণ মহিলা কর্মীদের কীভাবে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখা যায় না। বেসরকারি কর্মীদের পেনশন নেই, ঠিক তেমনই মহিলাকর্মীরা, যারা আগামী ১০ বছরে অবসর নেবেন, তাদের কীভাবে বয়সকালে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে ভাবা দরকার
কর্পোরেট চাকরিতে ঢোকার একেবারে শুরুতে আর মধ্যবয়সে এসে পরিবার, সন্তানজনিত দায়িত্বের সঙ্গে বনিবনা করে কীভাবে ভারতীয় মহিলারা কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকেন তার একটা অতি সংক্ষিপ্ত চিত্র দেওয়ার চেষ্টা করলাম । আইন বা নিয়মকানুন প্রবর্তন হলেও, তা সঠিকভাবে লাগু হওয়ার ক্ষেত্রে যে অসুবিধা রয়েছে তারও কিঞ্চিৎ আভাস দেওয়া গেল । একদম শেষে কথা বলবো এমন এক কর্মরত গোষ্ঠীকে নিয়ে, যাদের কথা একেবারে ব্রাত্যই থেকে যায় আলোচনায় । আশি বা নব্বই দশকের শেষে যারা ঢুকেছিলেন মাল্টিন্যাশনাল ফার্মে, প্রথম প্রজন্মের মহিলা চাকুরে, যারা সরকারি চাকরি বা শিক্ষিকার (সহজেই এই ধরনের পেশাগুলিকে মেয়েলি বলে ভাবা হয়) পদে না গিয়ে বেছে নিয়েছিলেন আইটি, টেলিকম বা ফার্মাসিউটিকাল ইন্ডাস্ট্রি । ১৯৯১ এর মনমোহন পরবর্তী অর্থনৈতিক উদারনীতিবাদের হাত ধরে এই ইন্ডাস্ট্রি যখন সবে সবে গজিয়ে উঠছে, তখন যারা প্রথম প্রজন্মের মহিলা কর্পোরেট কর্মী, তারা আজ সকলেই ষাট বছরের দোরগোড়ায় । কর্মী সুরক্ষা আইন, পেনশন বা আরও নানা বিষয় এই প্রবীণ মহিলা কর্মীদের কীভাবে প্রভাবিত করে, সেই নিয়ে কোথাও কোনো আলোচনা দেখা যায় না । বেসরকারি কর্মীদের পেনশন নেই, ঠিক তেমনই কর্পোরেট মহিলাকর্মীরা, যারা আগামী ১০ বছরে অবসর নেবেন, তাদের কীভাবে বয়সকালে সুরক্ষিত রাখা যায়, তা নিয়ে ভাবা দরকার । ঘরে ঘরে ইন্টারনেট কম্পিউটার আসার আগে, মোবাইল ফোনের আগে, এমনকি সমাজমাধ্যম আসার পূর্বে যে মহিলা কর্মচারীরা কর্পোরেটে কাজ শুরু করেছিলেন, তখন ICC ছিল না; abuse, consent, বা গ্লাস সিলিং এর মতো শব্দগুলিও ভারতবর্ষের প্রচলিত হয়নি, কিন্তু তা বলে লিঙ্গ অসাম্য যে ছিলনা তা তো নয়। আমাদের দেশে মহিলাদের সাধারণত জমির অধিকার বা ল্যান্ড রাইটস দেওয়া হয় না (কিছু বছর আগে সেই আইন পরিবর্তিত হয়েছে বটে কিন্তু আবারও তার প্রয়োগ নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা আছে, পণপ্রথার মতই এই আইন শুধু খাতায় কলমে থেকে যায়), সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে, কর্মরত মহিলাদের অবসর পরবর্তী সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা জরুরি । কর্মরত বলতে এখানে ওয়েজ বা পারিশ্রমিক প্রাপ্ত মহিলাদের কথা বলা হচ্ছে, বিশেষ করে বেসরকারি কোম্পানিতে কুড়ি / তিরিশ বছর টানা কাজ করে যাওয়া চাকুরীজীবীরা । কাজের জায়গায় সুরক্ষা, পারিশ্রমিক বা সাম্যের প্রশ্ন যেমন অত্যন্ত স্বাভাবিক, তেমনই জরুরি অবসরকালীন ভাতা, মেডিকেল ইন্সুরেন্স বা বিমা / ট্র্যাক্স সংক্রান্ত বিষয় সচেতনতা । ভারতের মতো দেশে এই ধরনের আর্থিক প্রকল্পকে পুরুষদের বোধগম্যের বিষয় ভাবা হয় । এছাড়াও বেসরকারি সংস্থায় প্রমোশনের ক্ষেত্রেও পক্ষপাতিত্ব নজরে আসে, কর্পোরেটে সিনিয়র পদগুলিতে মাত্র ১৮% মহিলা রয়েছে, যা মূল কর্মরত মহিলাদের তুলনায় বেশ অনেকটাই কম । চল্লিশোর্ধ পুরুষরা যে পরিমাণ পদোন্নতির সুযোগ পায়, মহিলারা কেন তা পায়না তা M syndrome এর মাধ্যমে আগেই উল্লেখ করেছি । সর্বোপরি এটা বোঝা খুব সহজ যে ভারতের মতো দেশে কর্পোরেট, এমনিতেই যা সুলভ লেবার সরবরাহ করে পশ্চিমী দেশগুলির জন্য, যেখানে দিনে আট ঘণ্টা কাজও যথেষ্ট মনে করা হচ্ছে না আজকাল, যে কোনো পাবলিক হলিডেতে কাজ করা একপ্রকার বাধ্যতামূলক, সেখানে লিঙ্গসাম্য কতটা ধরে রাখা যাবে, তা নিয়ে সন্দেহ হয় ।
ভারতে মহিলা কর্পোরেট কর্মীরা আসলে দুদিক থেকে নিষ্পেষিত হয়, একদিকে নব্য-উদারনৈতিক অর্থনীতিতে তারা তৃতীয় বিশ্বের লেবার, সেখানে শ্রমের মূল্য, জীবনযাত্রার মান বা কাজের নিশ্চয়তা, কোনোটাই নেই । অপরদিকে মহিলা হওয়ার কারণে তারা ডোমেস্টিক বার্ডেন, মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব ইত্যাদির জন্য এমনিতেই পিছিয়ে থাকে দৌড়ে। অর্থনৈতিক এবং লিঙ্গগত বৈষম্য কাটিয়ে আজকের মেয়েরা যে তাদের সমস্যাগুলি সমাধান করতে পারবে, তার জন্য যে পরিমাণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও জনচেতনা দরকার, তার কোনোটাই না থাকায় এক অসম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । প্রত্যেক বছরই মহিলা কর্মীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে সারা দেশে, এখন শুধু দেখার যে সংখ্যায় বেশি হলে এই সমস্যাগুলি নিয়ে যথাযথ চর্চা হয় কি না আগামীতে।
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
লেখক পরিচিতি : যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের গবেষক এবং মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞানের শিক্ষক । গবেষণার পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয় প্রবন্ধ লেখেন নিয়মিত।
❤ Support Us








