- দে । শ
- আগস্ট ১১, ২০২৬
‘গোর্খাল্যান্ড’-এর দাবিতে ফের সরগরম পাহাড় ! নভেম্বরের মধ্যে প্রক্রিয়া শুরু না হলে গণআন্দোলনের হুঁশিয়ারি
৯ বছর পর আবারও গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে উত্তাল দার্জিলিংয়ের রাজপথ। রবিবার ‘গোর্খাল্যান্ড সংকল্প’ সমাবেশে পৃথক রাজ্যের দাবিকে সামনে রেখে সরব হলো ‘নয়া পার্টি নির্মাণ সমিতি’। তাদের স্পষ্ট দাবি— গোর্খাল্যান্ড ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা মেনে নেওয়া হবে না। নভেম্বরের মধ্যে পৃথক রাজ্য গঠনের প্রক্রিয়া শুরু না হলে বৃহত্তর গণআন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি। ফলে পাহাড়ের রাজনীতিতে ফের গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে ঘিরে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হবে এমনটাই আশঙ্কা ওয়াকিবহাল মহলের।
রবিবার, দার্জিলিং রেল স্টেশনের কাছ থেকে মিছিল শুরু হওয়ার কথা ছিল। গন্তব্য ছিল চৌরাস্তা। কিন্তু সেখানে পুলিশের একটি পূর্বনির্ধারিত থাকায় শেষ মুহূর্তে মিছিলের পথ বদলাতে হয়। শেষ পর্যন্ত মিছিল গিয়ে পৌঁছয় জিডিএনএস ময়দানে। পরে জিডিএনএস হলে সভা হয়। মিছিলে কয়েকশো মানুষ অংশ নেন। তাঁদের হাতে ছিল একাধিক প্ল্যাকার্ড। কোথাও লেখা— ‘গোর্খাল্যান্ড চাই’, কোথাও আবার স্পষ্ট করে জানানো হয়, ‘জিটিএ’ কিংবা ‘বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন’ ধাঁচের কোনো ব্যবস্থা নয়, পাহাড়ের দাবি একটাই— পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ‘এনপিএনএস’ নেতা সঞ্জয় থুলুং বলেন, ‘আমরা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে রাস্তায় নেমেছি। এটা এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে আর পিছু হটার প্রশ্ন নেই। আজ যে স্ফুলিঙ্গ দেখা যাচ্ছে, তা যে কোনো সময় দাবানলে পরিণত হতে পারে। সরকারের বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।’ গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে কোনও সমঝোতার সম্ভাবনাও নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। থুলুংয়ের দাবি, ‘গোর্খাল্যান্ড নিয়ে কোনও আপস হবে না। পৃথক রাজ্য ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।’
নির্বাচনী প্রচারে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথাও রবিবারের সভায় তুলে ধরেন থুলুং। তাঁর দাবি, নির্বাচনী প্রচারের সময় শাহ বলেছিলেন, বাংলায় ক্ষমতায় আসার ছ–মাসের মধ্যে গোর্খাদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা হবে। সে প্রসঙ্গ টেনে থুলুং বলেন, ‘ইতিমধ্যেই তিন মাস কেটে গিয়েছে। আমরা আরও তিন মাস অপেক্ষা করব। এ সময়ের মধ্যে গোর্খাল্যান্ডের প্রক্রিয়া শুরু না হলে গণআন্দোলনে নামব। তার পরে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে, তার দায় সরকারের।’ আর কোনো আশ্বাসে তাঁরা ভুলবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ‘এনপিএনএস’ নেতা। তাঁর দাবি, ‘আর কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের বোকা বানানো যাবে না।’
শুধু দার্জিলিঙে সভা করেই থেমে থাকার পরিকল্পনাও নেই সংগঠনটির। আগামী ২০ আগস্ট মিরিকে একই ধরনের কর্মসূচি করার কথা জানিয়েছেন থুলুং। তাঁর বক্তব্য, নভেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের কর্মসূচি চলবে। পাহাড়ের সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে একত্রিত করা হবে। তাঁর দাবি, গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে বাস্তবায়িত করতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক পরিবর্তন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা গোর্খারাও সে প্রয়োজনীয়তা বুঝতে শুরু করেছেন বলে তাঁর দাবি। গোর্খাল্যান্ডের নামে রাজনৈতিক দল তৈরি করে বার বার পাহাড়বাসীর আবেগ নিয়ে খেলা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন থুলুং। তাঁর অভিযোগ, ‘গোর্খাল্যান্ডের নামে দল তৈরি করা হয়, তার পরে আমাদের স্বপ্ন বিক্রি করে দেওয়া হয়। এটা আর হতে দেওয়া হবে না।’
সভা থেকে ‘জিটিএ’ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। থুলুংয়ের প্রশ্ন, ‘জনসাধারণ যখন জিটিএ-কে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তখন এখনো সে ব্যবস্থা চালানো হচ্ছে কেন?’ পৃথক রাজ্য গঠনের সাংবিধানিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সংবিধানের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে রাজ্য পুনর্গঠনের ব্যবস্থা রয়েছে। সে প্রেক্ষাপটে গোর্খাল্যান্ডের দাবি কেন বিবেচনা করা হচ্ছে না, তার ব্যাখ্যা সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলিকেই দিতে হবে বলে দাবি করেন তিনি। রবিবারের সমাবেশে গোর্খাল্যান্ডের দাবিকে একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ নেন সমর্থকেরা। ‘এক দাবি, এক লক্ষ্য’—এ বার্তাই বার বার উঠে আসে তাঁদের বক্তব্যে।
দার্জিলিঙের বিজেপি সাংসদ রাজু বিস্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সভায়। বক্তা সন্দীপ প্রধান বলেন, রাজু বিস্তা অতীতে একাধিক বার পৃথক রাজ্যের দাবির কথা বলেছেন। এমনকি রাজ্যে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় সংসদেও গোর্খাল্যান্ডের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। কিন্তু এখন রাজ্য ও কেন্দ্র দুই জায়গাতেই বিজেপি ক্ষমতায়। তা হলে এখন তিনি কেন একই ভাবে পৃথক রাজ্যের দাবি তুলছেন না, সে প্রশ্ন তোলেন প্রধান। ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ বলতে সরকার ঠিক কী বোঝাচ্ছে, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি ওঠে।
রবিবারের এই সমাবেশের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। ২০১৭ সালে বিমল গুরুংয়ের নেতৃত্বে ১০৪ দিনের সাধারণ ধর্মঘটের পর পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে এমন বড়ো আকারের রাস্তার আন্দোলন দেখা যায়নি। সে আন্দোলনের প্রায় ৯ বছর পরে ফের রাস্তায় পৃথক রাজ্যের দাবিকে সামনে রেখে জমায়েত হলো। ফলে পাহাড়ের রাজনীতিতে গোর্খাল্যান্ডের পুরনো ইস্যু নতুন করে কতটা জায়গা করে নেয়, সে দিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। থুলুং এক সময় বিমল গুরুংয়ের ‘গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে জিটিএ-র নির্বাচিত সভাসদও হন। বর্তমানে তিনি যে নতুন গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি শীঘ্রই একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে বলে জানা যাচ্ছে।
এ আবহে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের পুরনো প্রতিশ্রুতিও ফের আলোচনায় এসেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের ইস্তাহারে বিজেপি গোর্খাল্যান্ড সমস্যার ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর কথা বলেছিল। বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের পর সে প্রতিশ্রুতি নিয়ে পাহাড়ে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দার্জিলিং পাহাড় সফরের সম্ভাবনাও রয়েছে। গত ১৮ জুন বিধানসভায় দেওয়া ভাষণে বাংলার রাজ্যপাল আর এন রবি গোর্খাল্যান্ড সমস্যার ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’-এর কথা বলেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে রাজ্য সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নতুন বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনে রাজ্যপালের এ মন্তব্য পাহাড়ের রাজনীতিতে যথেষ্ট তাৎপর্য তৈরি করেছিল।
তবে গোর্খাল্যান্ডের দাবির ভবিষ্যৎ সমাধানের পথ নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অবস্থান এক নয়। সম্প্রতি ‘গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা’র সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালে দলের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে অমিত শাহ জানিয়েছিলেন যে এ মুহূর্তে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গঠন সম্ভব নয়। বরং ‘বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন’-এর ধাঁচে কোনো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে বলে শাহ জানিয়েছিলেন বলে দাবি তাঁর। মোর্চা সভাপতি বিমল গুরুংও এর আগে ‘বিটিআর’-এর আদলে ‘গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল রিজিয়ন’-এর কথা বলেছিলেন। পাশাপাশি বাদ পড়া ১১টি গোর্খা সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়ার দাবিও তুলেছিলেন তিনি।
সে অবস্থানের বিপরীতে রবিবার ‘এনপিএনএস’-এর সভা থেকে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, ‘বিটিআর’-এর মতো কোনো বিকল্প কাঠামো নয়, তাঁদের দাবি শুধুই পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য। সমাবেশে রাজু বিস্তার বিরুদ্ধে স্লোগানও ওঠে। ২০০৯ সাল থেকে দার্জিলিং লোকসভা আসন বিজেপির দখলে। ফলে পাহাড়ে দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের পরেও গোর্খাল্যান্ডের দাবি কেন বাস্তবায়িত হয়নি, সে প্রশ্নও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। রবিবারের এই কর্মসূচিতে শুধু ‘এনপিএনএস’-এর কর্মীদের পাশাপাশি স্বাধীন পঞ্চায়েত সদস্যদের পাশাপাশি অজয় এডওয়ার্ডসের নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট’-এর সদস্য এবং অরাজনৈতিক সংগঠন ‘গোর্খাল্যান্ড অ্যাক্টিভিস্ট সমূহ’-এর সদস্যরাও যোগ দেন। ‘ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা’-র সভাপতি অনীত থাপাও গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে আয়োজিত সমাবেশকে সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে রবিবারের কর্মসূচির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা সম্ভবত নভেম্বরের সময়সীমা। আপাতত সভা, মিছিল আর জনসংযোগের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে জনসমর্থন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ‘নয়া পার্টি নির্মাণ সমিতি’। নভেম্বরের মধ্যে সরকার কোনো পদক্ষেপ না করলে এ আন্দোলন কোন পথে গড়ায়, পাহাড়ের রাজনীতিতে তার প্রভাব কতটা পড়ে, এখন সেটাই দেখার।
❤ Support Us







