Advertisement
  • খাস-কলম পা | র্স | পে | ক্টি | ভ রোব-e-বর্ণ
  • এপ্রিল ২৭, ২০২৫

এ আগুন আমাদের নয়

যে মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন, একে অপরের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে যারা অভ্যস্ত, তাঁদের সহবস্থানের সংস্কৃতি জেলার চিরায়ত সংস্কৃতি। ইদের ‘দাওয়াত’-এ সিমাই খেতে বন্ধুর বাড়ি; পুজোর আমন্ত্রণে নারকেল-নাড়ু খেতে প্রতিবেশী সহোদরের বাড়ি। দরগায় শিন্নি দেওয়া, মহরমের মরশুমে ভাটিয়ালি গায়কের শোকগাথায় সজল হয়ে ওঠা সবই শাশ্বত সম্প্রীতির চিহ্ন

সৌরভ হোসেন
এ আগুন আমাদের নয়

চিত্র সংগৃহীত

 
একদা ছিল বাংলা-বিহার-ওড়িষার রাজধানী। নদী বিধৌত জেলা। দুই পারে দুই চরিত্রের মাটি। মাটির সঙ্গে সঙ্গে দুপারের মানুষের স্বভাব-প্রকৃতিও আলাদা। যে জেলার মাটিতে ইতিহাসের চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ। যে কর্ণসুবর্ণ একসময়ের ব্যস্ত বাণিজ্যনগরী। যেখান থেকে রেশম, হাতির দাঁতের জিনিস, মসলিন যেত সুদূর জাভা-সুমাত্রাতে। যে জেলার পাঁচথুপির পুরোনো সিংহবাড়ির দুর্গা পুজো দেখতে কলকাতা থেকে বাস ছাড়ত। যে জেলার মাটিতে ‘অলীক মানুষ ‘ এর চরিত্ররা ঘুরে বেড়াতেন। সে জেলায় এত অন্ধকার, এত হিংসা কোথা থেকে এল ? এ অন্ধকার, এ হিংসা আদৌ কি এ জেলার মানুষদের, না বাইরে থেকে ঢোকানো ? আমাদের দেশে এখন অন্ধকার ফেরি করা হয়। হিংসা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এখানেও কি সেসব কিছু ঘটেছে, এখন ঘটছে। 

 
এই তো ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে জল ছাড়ার শব্দ কানে আসছে। তার উপর দিয়ে ধিক ধিক করে চলা ট্রেনের হুইশেল জলের সে সো সো শব্দের সঙ্গে মিশে আউরিবাউরি হয়ে যাচ্ছে। যে হাওয়ায় আউরিবাউরি হচ্ছে, সে হাওয়াতেই কথাটি ছড়াচ্ছে। যে কথা এ মাটির কখনও আপন ছিল না। যে কথা জলের পাকচক্রের মতো কোথা থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে। এই সুন্দর দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষতি করেছে যে কথাটি, এ কথা সে কথাই। পৃথিবী জুড়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ খুন হয়েছে যে হিংসার জন্য, এ হল সে হিংসা। জেলার ইতিহাস বলে অন্য কথা। সে কথা নদী ও মাটির মতো পবিত্র। স্রোতের মতো বহমান। সে পুণ্যভূমে এ হিংসা কোথা থেকে এল ! এ মাটির মানুষ বদলে গেল, না  তাদের বদলে দেওয়া হল ! হাওয়া যা ছড়াচ্ছে তাই কি সত্যি ? না সে হাওয়ায় কোনও দুষ্টুচক্রী মিশিয়েছে বিষ-বাষ্প ? হাওয়ায় কান পাতার আগে একবার মাটিতে কান পাতি। যে মাটিতে এসব রটছে কিংবা ঘটছে, সে মাটির কথা একবার জানি।
 

ভৌগোলিক অবস্থান এই ঐতিহ্যবাহী জেলার সুন্দরকে অতুলনীয় করে তোলে, সেই অবস্থানই এখন জেলার অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠেছে। ১২৫.৩৫ কিমি আন্তর্জাতিক সীমান্ত আর পড়শি রাজ্যের অবস্থান, এ জেলার অভ্যন্তরে অপরাধ চক্রকে জড়ো করার প্রবণতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাঁটাতার মানুষের শরীরকে আটকে রাখতে পারে, মনকে আটকে রাখতে পারে না। সে মনই যত গণ্ডগোলের গোড়া । মনে হিংসার বিষ ঢুকিয়ে দিতে পারলেই বিভেদকামী মানুষের আনন্দ। 

 
মসলিন, হাতির দাঁতের খোদাই আর রেশম পণ্যের বাণিজ্যিক কেন্দ্র মুর্শিদাবাদ ছিল একসময়ের ধনী জনপদ। রবার্ট ক্লাইভ মুর্শিদাবাদ শহরকে লন্ডনের চেয়ে সমৃদ্ধশালী বলেছিলেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রবার্ট ওরমে বলেছিলেন, আঠার শতকের প্রথম এবং মাঝামাঝি সময়ে মুর্শিদাবাদ ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী শহর। জৈন কবি নিহাল সিংহ লিখেছেন; “ বসতী কাসমবাজার, সৈদাবাদ খাগড়া সার/ রহতে লোক গুজরাতিক, টোপিবাল জেতি জাতিক।/ আরব আরমনি আংগরেজ, হবসি হুরমজি উলাংদেজ/ সিদি ফরাসিস আলেমান সৌদাগর মুর্গল পাঠান/ শেঠী কুংপনি কি জোর দমকে লাগে লাখ কিরোর।” অর্থাৎ কবি নিহাল বলেছেন, কাশিমবাজার, সৈয়দাবাদ, খাগড়ার বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতির মানুষের মধ্যে সহাবস্থান ছিল অভূতপূর্ব। ইংরেজ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী উইলিয়াম বোল্টস মুর্শিদাবাদের কথা লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘A variety of merchants of different nations and religions, such as Cashmeerians, Multanys, Patans, Sheikhs, Sunniasys, Paggayahs, Betteas and many others used to resort to Bengal .’ এসব সওদাগরদের অনেকেই মুর্শিদাবাদে তাঁদের বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। জগৎশেঠরা এসেছিলেন মারওয়ারের নাগর থেকে অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে। মুর্শিদকুলির সঙ্গে এসেছিলেন মানিকচাঁদ। এবং মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা হয়ে যান। এরকম নানা জাতি, নানা সম্প্রদায়ের মানুষের জেলায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাসের হাজার হাজার উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে। যে নবাবের নামে মুর্শিদাবাদ জেলার নামকরণ, সে মুর্শিদকুলি বাঙালি অ-মুসলিম ছাড়া আর কাউকে তাঁর রাজস্ববিভাগে নিযুক্ত করতেন না। মুর্শিদকুলির সংস্কারের ফলে যে নতুন ব্যাংকার-ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব হয়, তাঁদের অধিকাংশই অ-মুসলিম। রিয়াজ-উস-সলাতিনের লেখক গোলাম হোসেন লিখেছেন, ‘মুর্শিদকুলি থেকে আলিবর্দি পর্যন্ত বাংলার নবাবদের নীতি ছিল দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিজাতদের আমন্ত্রণ করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে আসা।’ নবাবরা মুর্শিদাবাদের সৌন্দর্যায়নের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন। তাঁরা জাতি-ধর্ম দেখেননি। মানুষের সঙ্গে মানুষের সে সহাবস্থান আজও অটুট যে জেলায়, সেখানে জাতি হিংসার ঘটনা কতটা সত্য ? নাকি সত্যে জলই বেশি ? ফায়দা কার ? ‘নানা ভাষা না মত নানা পরিধান/ বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান’এর ভারতবর্ষে যে হিংসার রাজনীতি প্রতিনিয়ত মানুষের সহাবস্থানকে নষ্ট করছে, কোথাও কি হিংসার রাজনীতি জড়িত ? জেলার আনাচে-কানাচে কান পাতলে সেসব ফিসফিস শোনা যাচ্ছে। 
 

নদী ভাঙন যে এ জেলার ক্যানসার ! ট্রেনে বাঁদুরের মতো ঝুলে যে সব পরিযায়ী শ্রমিক বাইরে খাটতে যান, তাঁদের সমস্যাগুলো, অভাব-অনটনগুলো দেখাও। দেশের একদা ধনী জেলা কেন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা হয়ে গেল, তার কারণগুলো অনুসন্ধান করো। আমরা বারুদের আলো চাই না, শিক্ষার আলো চাই। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে যা ইচ্ছে তাই করবে, সেটা গণতন্ত্র নয়। এ বিষয়ে কবেই সাবধান করে গেছেন জ্ঞান তাপস আম্বেদকর

 
যে ভৌগোলিক অবস্থান এই ঐতিহ্যবাহী জেলার সুন্দরকে অতুলনীয় করে তোলে, সেই অবস্থানই এখন জেলার অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠেছে। ১২৫.৩৫ কিমি আন্তর্জাতিক সীমান্ত আর পড়শি রাজ্যের অবস্থান, এ জেলার অভ্যন্তরে অপরাধ চক্রকে জড়ো করার প্রবণতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কাঁটাতার মানুষের শরীরকে আটকে রাখতে পারে, মনকে আটকে রাখতে পারে না। সে মনই যত গণ্ডগোলের গোড়া । মনে হিংসার বিষ ঢুকিয়ে দিতে পারলেই বিভেদকামী মানুষের আনন্দ। এরকম খারাপ মানুষের সংখ্যা কম। কম হলে কী হল ? যুগে যুগে তাদের সংখ্যা কম থাকে, তবুও সে কম সংখ্যক বৃহত্তর ভালো মানুষের খারাপটা ডেকে আনে। এই যে এখন যেমন শুধু এপার-ওপার নয়, এগাঁ ওগাঁ, এপাড়া ওপাড়ার মনে শুধু ‘ওরা’ ‘আমরা’। এও তো সেসব দুর্ভাগার কু-কাজের ফল ? মুর্শিদাবাদের যে অংশে জাতিগত হিংসা ঘটেছে বলে যেটা শোনা যাচ্ছে, সে অংশটির একপাশে বাংলাদেশ, অন্যদিকে পড়শি ঝাড়খণ্ড। আবার এখানকার ভুগোল উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাকি ভারতকে যুক্ত করেছে। ভিন্নতাবাদী মানুষ আর বহিরাগতের নিত্য আনাগোনা। এরকম জায়গা, যে কোনও অপরাধ ঘটানোর পক্ষে অনুকূল। ‘বহিরাগত’ কারণটা ফেলনা নয়। যে কথা এ এলাকার সাধারণ মানুষ বলছেন। যে মানুষ যুগ যুগ ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন, একে অপরের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে যারা অভ্যস্ত, তাঁদের সহবস্থানের সংস্কৃতি জেলার চিরায়ত সংস্কৃতি। ইদের ‘দাওয়াত’-এ সিমাই খেতে বন্ধুর বাড়ি; পুজোর আমন্ত্রণে নারকেল-নাড়ু খেতে প্রতিবেশী সহোদরের বাড়ি। দরগায় শিন্নি দেওয়া, মহরমের মরশুমে ভাটিয়ালি গায়কের শোকগাথায় সজল হয়ে ওঠা সবই শাশ্বত সম্প্রীতির চিহ্ন। দুই ধর্ম আর সংস্কৃতির মিলনের সাধনা থেকেই সত্যপীরের মতো নতুন ‘দেবতা’র জন্ম– যে ‘দেবতা’ গণমনের উপাস্য। সম্প্রীতির এ দৃষ্টান্ত দেখা যায় বরানগরে, যেখানে মন্দিরচত্বর আর মাস্তিরাম আওলিয়ার আখড়া দাঁড়িয়ে আছে সামনাসামনি। মুর্শিদাবাদের সম্প্রীতি আর সমন্বয়ের সবচেয়ে বড় উদাহরণ, ‘বেরা উৎসব’। জলদেবতা ‘খাজা খিজির’কে তুষ্ট করার জন্য বেরা ভাসান উৎসব পালিত হয়। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভাগীরথীতে এলাহি আয়োজনে এরকম উৎসব উদযাপনের কাল-সীমা নেই। সীমান্তও নেই। এইসব সাচ্চা মানুষের ভেতরে যাঁরা হিংসার বিষ চাষ করেছে, মুর্শিদাবাদই তাদের পরাস্ত করবে। সীমান্তবর্তী গ্রামে গ্রামে আমার ঘোরার অভিজ্ঞতা রয়েছে। জন আর গণের সঙ্গে কথা বলেছি। জানতে চেয়েছি, তাঁদের সামাজিক প্রেমের ভিত্ কোথায়, কতটা গভীরে প্রোথিত ? তাঁরা নির্দ্বিধায় বলেছেন, ভেদাভেদ মানি না। আমাদের সম্পর্ক ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের। লালগোলার সীমান্তবর্তী গ্রামের একটি পরিবারের কাছে জানতে চাইলাম, ‘ভয় লাগে না ?’ সে পরিবারের কর্তা হেসেহেসে বললেন, ‘ভয় কীসের ? আমরা এক এবং অভিন্ন। কোনোদিন সমস্যা হয়নি।’ সে মানুষটির খিলখিল হাসি আর মুখটা খুবই মনে পড়ছে। চারধারে যা ঘটছে বা রটছে, তা সেটা শুনে তিনি লজ্জিত, মর্মাহত। তাদের সাকিন, লক্ষ্য, অভিমুখ পরিষ্কার। ব্যর্থতাই ক্ষুদ্রমনাদের ভবিষ্যও।  
 

তৈলচিত্রে মুর্শিদাবাদ বেরা উৎসব, ১৭৯৫ সালে আঁকা  (চিত্র সৌজন্য বৃটিশ যাদুঘর )

হে, সংবাদমাধ্যম, হিংসার এত খবর ছড়াচ্ছ, একবার নদী ভাঙনের করুণ দৃশ্যগুলো দেখাও। নদী ভাঙন যে এ জেলার ক্যানসার ! ট্রেনে বাঁদুরের মতো ঝুলে যে সব পরিযায়ী শ্রমিক বাইরে খাটতে যান, তাঁদের সমস্যাগুলো, অভাব-অনটনগুলো দেখাও। দেশের একদা ধনী জেলা কেন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র জেলা হয়ে গেল, তার কারণগুলো অনুসন্ধান করো। আমরা বারুদের আলো চাই না, শিক্ষার আলো চাই। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে যা ইচ্ছে তাই করবে, সেটা গণতন্ত্র নয়। এ বিষয়ে কবেই সাবধান করে গেছেন জ্ঞান তাপস আম্বেদকর।    
 

তৈলচিত্রে পলাশির যুদ্ধ । ক্লাইভের সঙ্গে মীর জাফরের বৈঠক  (চিত্র সৌজন্য বৃটিশ যাদুঘর )

দেখতে পাচ্ছি, দুশো সাতষট্টি বছর দশ মাস আগে পলাশির যুদ্ধ জয় করে রবার্ট ক্লাইভ তিন হাজারেরও কম সৈন্য নিয়ে কাশিমবাজারের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর তার অনেক অনেক গুণ বেশি মানুষ হাঁ করে সে উল্লাস দেখছে, এক শাসক হেরে যাচ্ছেন, জিতেছে ভিনদেশি আরেক শাসক। তারা জিতছে বলে কেউ তাদের উপর ঢিল মারেননি; আজও মুর্শিদাবাদের সে মানুষ দাঙ্গাবাজদের উসকানি আর ছককে নীরবে এড়িয়ে যাচ্ছেন। হিংসাকে মনে জায়গা দেবেন না। রাজা যায়, রাজা আসে, ভালো রাজাকে [শাসককে] বরণ করা, গ্রহণ করা তাঁদের অভ্যাস। এ অভ্যাসের স্রষ্টা লোকায়ত সংস্কৃতি, সহাবস্থানের কৃষ্টি। 
 
এই তো ভাদ্র মাস আসছে। ভাগীরথীর তীরে শীঘ্রই দেখতে পাব সে আনন্দময় সহাবস্থানের চিহ্ন। জলের ওপর ভাসবে হাজার হাজার আলো। সে আলো সম্প্রীতির, সৌভ্রাতৃত্বের। সে আলোয় ঘুচে যাবে অতর্কিত যাবতীয় কালো।

♦•♦•♦ ♦•♦•♦ ♦•♦•♦


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!