- দে । শ
- আগস্ট ১১, ২০২৬
ধস, হড়পা বানে বিপর্যস্ত হিমাচল! মৃত ১৫৭, নিখোঁজ ২৫৭, বন্ধ স্কুল, অবরুদ্ধ ২৬০টি রাস্তা
বর্ষার তাণ্ডব থামছেই না হিমাচল প্রদেশে। একের পর এক ধস, হড়পা বান, পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়া আর টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত রাজ্যের জনজীবন। গত ৩০ জুন থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত বর্ষাজনিত বিভিন্ন ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ১৫৭ জনের। এর মধ্যে ধস ও হড়পা বানে ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৮৯ জন। নিখোঁজের সংখ্যাও কম নয়— প্রায় ২৫৭ জন। রাজ্যের ‘স্টেট এমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার’-এর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বৃষ্টির দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৯০০টি বাড়িঘর ও সরকারি সম্পত্তি। পরিকাঠামোগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৮৬ কোটি টাকা। পরিস্থিতি যে এখনই স্বাভাবিক হওয়ার নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসেও। মঙ্গলবার পাঁচ জেলায় ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির জন্য কমলা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বৃষ্টির জেরে রাজ্য জুড়ে বন্ধ ২৬০টি রাস্তা। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মন্ডী-কুলু হাইওয়েও রয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ শুরু করলেও লাগাতার বৃষ্টিতে বার বার নতুন করে ধস নামায় স্বাভাবিক হচ্ছে না যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ এবং পানীয় জল সরবরাহও। ১৬১টি ‘ডিস্ট্রিবিউশন ট্রান্সফরমার’ বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মান্ডিতে, সেখানে ৭৭টি ট্রান্সফরমার অকেজো। শিমলায় ৪৩টি এবং কুল্লুতে ৪০টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৪টি জল সরবরাহ প্রকল্প। তার মধ্যে শিমলায় ৩৩টি, চাম্বায় ১৬টি এবং হামিরপুরে পাঁচটি প্রকল্প রয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ নয়, পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থাতেও ধাক্কা লেগেছে। রাজ্য জুড়ে ৫৪টি জল সরবরাহ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিমলায় ৩৩টি, চম্বায় ১৬টি এবং হামিরপুরে পাঁচটি প্রকল্প এখনো ব্যাহত।
লাগাতার বৃষ্টির কারণে কুল্লুর বিভিন্ন নদী এবং নালায় জলস্তর দ্রুত বাড়ছে। কোথাও কোথাও নদীর জল বিপদসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। মান্ডির পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। পাহাড় থেকে নেমে আসা জল ও ধ্বংসাবশেষের কারণে নদীগুলির জলপ্রবাহ আরও বেড়েছে। জলাধারগুলিতে জলের প্রবাহও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আচমকা নদীর জলস্তর বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের তরফে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। এরইমধ্যে, পার্বতী পাওয়ার স্টেশন-২ জানিয়েছে, পালগা বাঁধ থেকে পার্বতী নদীতে প্রায় ৩০ কিউমেক জল ছাড়া হবে। এর পর আরও প্রায় ৩০ কিউমেক জল ছাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ই-ফ্লো এবং রেডিয়াল গেটের জল যোগ হলে নদীতে মোট জলপ্রবাহ প্রায় ৯০ কিউমেক বা ১০০ কিউসেক পর্যন্ত হতে পারে। জলাধারে জল ঢোকার পরিমাণ আরও বেড়ে গেলে রেডিয়াল গেট দিয়ে অতিরিক্ত জল ছাড়তে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নদীর জলস্তর আচমকা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সতর্কতা হিসাবে হুটার এবং সাইরেন বাজানোর পাশাপাশি আশপাশের এলাকায় ঘোষণা করার জন্য গাড়ি ব্যবহার করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক এবং শ্রমিকদের নদীর পাড় থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মানালির এডি হাইড্রো পাওয়ার লিমিটেডও ১২ আগস্ট অ্যালেন ড্রেনে নিয়ন্ত্রিত ভাবে জল ছাড়ার কথা জানিয়েছে। প্রথমে প্রায় ১৬ কিউমেক জল ছাড়া হবে। পরে ধীরে ধীরে সেই পরিমাণ বাড়ানো হবে। হোটেল, গেস্টহাউস, হোমস্টে এবং ক্যাম্পগ্রাউন্ডের মালিকদের পাশাপাশি ট্যাক্সি চালকদেরও পর্যটকদের জল ছাড়ার বিষয়ে জানাতে বলা হয়েছে। নদী বা নালার কাছে না যাওয়ার জন্য পর্যটকদের সতর্ক করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হিমাচলের পরিস্থিতি যে এখনই স্বাভাবিক হচ্ছে না, তার ইঙ্গিত মিলেছে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসেও। সিমলা, কাংড়া, মান্ডি, হামিরপুর এবং সিরমৌরে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির জন্য কমলা সতর্কতা জারি হয়েছে। ওই জেলাগুলির বিভিন্ন এলাকায় ধস এবং হড়পা বান নামার আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, চম্বা, কুল্লু, সোলান এবং বিলাসপুরে হলুদ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন ভাবে ভারী বৃষ্টি হতে পারে ওই জেলাগুলিতেও। কমলা সতর্কতা, ধস ও হড়পা বানের আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে কুল্লু সাব-ডিভিশনের সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মঙ্গলবার বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন। স্কুলের পাশাপাশি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, কলেজ, আইটিআই, পলিটেকনিক, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং ফার্মেসি কলেজও বন্ধ। তবে চলতি বোর্ড পরীক্ষা নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী চলবে। পরীক্ষার্থী ও কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ধস এবং বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত রাস্তা, বিদ্যুৎ এবং জল সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক করতে পূর্ত দফতর ও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে। রাস্তা থেকে ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া, নতুন করে ধস নামায় সে কাজও সহজ হচ্ছে না। প্রশাসনের তরফে সাধারণ মানুষকে অপ্রয়োজনে পাহাড়ি রাস্তায় না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাত্রার আগে রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী, নালা এবং জলাধারের কাছাকাছি না যাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটকদের সতর্ক করা হয়েছে।
❤ Support Us







