- ধা | রা | বা | হি | ক রোব-e-বর্ণ
- জুলাই ১৬, ২০২৩
চর >।পর্ব ২।
অলংকরণ: দেব সরকার
ধা রা বা হি ক · উ প ন্যা স
•৩•
এবং ভোর হল।
এ এক অন্য ভোর। আকাশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত কোথাও এক কণাও মেঘ নেই। কে বা কারা যেন ভিজে ন্যাকড়া দিয়ে গোটা আকাশটাকে খুব ভালভাবে ঘসে মেজে চকচকে করে দিয়েছে। পুব দিগন্তে গোল চাকতির মতো লাল হয়ে উদিত হচ্ছে সকালের সূর্য। সুর্যের গা থেকে একটা একটা করে খসে পড়ছে সকালের কিরণমালা। ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের ভাঙা বাড়ি, গাছপালা আর রাস্তায় জমে থাকা থিকথিকে জলের উপর। এই ভোর দেখে কে বলবে সারারাত ধরে আকাশের গায়ে ভর করেছিল মরণ ভূত !
সমিরুদ্দীর বাড়ির চালা উড়ে এসে পড়েছে পরাণের বাড়ির উপর। নাসিরের বাড়ির পাটকাটির টাটি খসে পুরো বাড়িটায় নেমে এসেছে রাস্তায়। ঘরে নতুন টিন লাগিয়েছিল বলাই। খুলে কোথায় উড়ে গেছে জানে না সে। মাঠ জুড়ে জল এখনও গড়িয়ে যাচ্ছে। নালার দিকে তাকিয়ে বোঝায় উপায় নেই কত সরু ছিল! মরা নালা আজ যৌবন ফিরে পেয়েছে। দুকূল ছাপিয়ে নতুন সাজে সে আজ পূর্ণ যুবতী। ঢেউয়ের নব-তরঙ্গ তুলে তার বয়ে যাওয়া দেখে মনে পুলক জাগে।
ফাঁস জাল হাতে নিয়ে বেরিয়েছে পরাণ। পরাণের পেছনে মহিরুদ্দী, হাতে ভুমরি জাল। নালার জলে মাছ ধরবে। বৃষ্টির মিষ্টি জল খেতে সাঁতার কেটে উজানে ভেসে আসে রুই, কাতলা। বড় বড় বোয়ালও আসে কখনও। ছোট ছোট বালিয়া, গড়াই, চ্যাং, পুঁটি তো আছেই।
পরাণ আর মহিরুদ্দীকে জাল হাতে বেরোতে দেখে লাল্টু হাঁক ছাড়ল, “কি রে পরাণ। মাছ ধরতে যাচ্ছিস নাকি?”
“হ্যাঁরে লাল্টু। যাবি নাকি? গেলে চল্যা আয়। দুট্যা কাতলা পালেই ঝোল ভাত হবে।” পরাণ হাঁক ছাড়ল।
“জাল নাই। ইঁদুরে কাট্যা দিয়্যাছে। তুই সাথে লিবি?”
“চল্যা আয়।”
টাটি বাঁধছিল লাল্টু। রাতের ঝোড়ো বাতাসে ছিঁড়ে গেছিল টাটির বাঁধন। পরাণের ডাকে কাজ ফেলে গামছাটা ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
দেখতে দেখতে গোটা গ্রাম ভেঙে পড়ল নালার জলে। মহিরুদ্দি, লাল্টু, পরাণ, সমিরুদ্দি, আনসার, মুকুল, প্রদীপ! কে নেই! সবাই নালার জলে এসে ভিড় করেছে। মাছও পাচ্ছে! বোয়াল, কাতলা, রুই, বালিয়া, ময়া, পুঁটি ! কত রকমের মাছ !
সফর আলির ঘুম ভাঙল রূপসীর ডাকাডাকিতে। এর আগে একবার ঘুরে গেছে। এবার এসে সে এক নাগাড়ে দরজার কড়া নেড়েই চলেছে। রাতে ঘরের চালার একটি অংশ খসে পড়েছিল মাটিতে। বাঁশের একটা টুকরো উড়ে এসে পড়েছিল পায়ের উপর। সেই থেকে পা ফুলে আছে তার। ব্যথাও হচ্ছে।
ঘুম থেকে সফর আলি উঠে বসল বিছানায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল বেলা আটটা বেজে গেছে। ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে দরজা খুলে দেখল দাঁড়িয়ে আছে রূপসী।
“এই সকাল বেলায় তুই, রূপসী! তোর আবার কী হল?” সফর আলি একটা হাই তুলে বলল।
“কী হল সে খবর কী নেওয়ার সময় তোমার আছে ডাক্তার বাবু! বড়লোক মানুষ! দরজা বন্ধ করে কত সুখে ঘুমিয়ে আছ। এখন বেলা আট টা বাজে। আর তুমি বলছ সকাল বেলা! এদিকে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেল। গাঁয়ের মানুষ সব মরে গেল। বাড়ি ঘর সব ভেঙে গেল।” অভিমানের সুরে কথাগুলি বলল রূপসী।
সফর আলি মৃদু হেসে বলল, “সব মরে যাক। তুই আর আমি বেঁচে থাকলেই হবে। তোর কী হয়েছে বল।”
রূপসী মুখে সামান্য হাসি টেনে বলল, “তোমার কত ক্ষমতা দেখা আছে। দেখা হলে রাস্তায় কথা বলতে পারেনা। আবার মুখে বড় বড় কথা!”
“ক্ষমতা সময় মতো দেখানো যাবে। তোর কী হয়েছে এখন বল।” সফর আলি আবার হেসে বলল।
রুপসী ডান পায়ের গোড়ালির দিকের শাড়ি সামান্য সরিয়ে বলল, “এই দ্যাখ। রাতে ঝড়ের সময় একটা বাঁশ আমার পায়ে পড়েছিল। তখন থেকে ব্যথায় থাকতে পারছিনা। কত্তাবাবুকে কতদিন থেকে বলছি ঝড় বৃষ্টির দিন আসছে। ঘর বাড়ি ঠিক কর। কত্তা আমার কথায় শুনে না।”
সফর আলি দেখল রূপসীর ডান পায়ের গোড়ালির উপরের দিকটা হালকা ফুলে আছে। তাকে ঘরের ভেতরে চেম্বারে বসতে বলল। তারপর হাত দিয়ে গোড়ালিতে সামান্য চাপ দিয়ে বুঝতে পারল হাড় ভাঙেনি, মাসলে চাপ লেগেছে। বলল, “তোর কিছু হয়নিরে রূপসী। এবার তুই চুপ কর। ঘর তো ভেঙেছে। এবার দেখবি কত্তাবাবু তোর ঘর ঠিক করে দিয়েছে। তোর ঘরে এবার নতুন চালা উঠবে।”
“ঘর ভেঙেছে ভাঙুক। এখন আমার নিজের ঘর ভাঙলে বেঁচে যায় সফর ভাই।”
দুটো ব্যাথার ট্যাবলেট রূপসীর হাতে দিয়ে বলল, “কেন রে? ঘর ভাঙার কথা বলছিস কেন?”
“তুমি তো সবই জান সফর ভাই। কী আর নতুন করে বলব!”
রূপসী আর বসিরের বিয়ে হয়েছে দশ বছরের কাছাকাছি।
রূপসী তখন ফাস্ট ইয়ার। মা মারা গেল। কয়েকমাস পরেই বাবা আরেকটি বিয়ে করলেন। সংসারে সৎ মা ভালো লাগলনা রূপসীর। সফর আলি তখন থার্ড ইয়ার। একই ট্রেনে-বাসে যাওয়া আসা করত দুজনে। মাঝে মাঝে দেখা হত। সেখান থেকে পরিচয়। রূপসী বাড়ির কথা, দুঃখের কথা বলত সফরকে। বাড়িতে রূপসীর বিয়ের জন্য যে তাড়াহুড়ো করছে বাবা। বসির তখন কলেজে পড়া ছেড়ে দিয়েছে। সফর আলিই যোগাযোগ করে বসির আর রূপসীর বিয়েটা দিয়ে দিয়েছিল। সফর আর বসির দুজনে ছোটবেলা থেকে একসাথে পড়ত। তাই দুজনের বন্ধুত্বও ছিল ছোটকাল থেকে।
বিয়ের দশ বছর হতে চলল, এখনও সংসারে কোনও বাচ্চা আসেনি। এ নিয়ে মাঝে মাঝেই দুজনের মধ্যে লেগে যেত। রূপসী বলত সব দোষ বসিরের। আর বসির রূপসীর কথা মানতেই চাইতনা।
সে বলত, “পুরুষের আবার দোষ হয় নাকি? বীজ আমার ঠিক আছে। যত দোষ জমির।”
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত রূপসী, “জমি আমার ঠিক আছেরে মিনস্যা। তোর বীজ তো পুকায় কাটা। পচা বীজ।”
এরপর লেগে যেত ধুন্ধুমার। কথা কাটাকাটি থেকে গালাগাল, গালাগাল থেকে মারামারি। বসির যখন আর কথায় পারতনা, শুরু করত মারধোর।
মারামারিতে রূপসী বসিরকে পারতনা। চুপ করে বসিরের হাতে মার খেত সে। গ্রামের মানুষ এসে দুজনের ঝামেলা মেটাত। মারামারি করে বসির রেগেমেগে বেরিয়ে যেত ঘর থেকে। সারাদিন তার আর পাত্তা পাওয়া যেতনা। ঘরে ফিরত সন্ধ্যার পর। ভালোমানুষের মতো মুখ করে বলত, “দে। দুটো ভাত দে।” যেন সে কিছু জানেনা। যেন কোথাও কোনও ঝগড়া হয়নি। যেন সংসারের কোনও কাজে বাইরে বেরিয়েছিল। কাজ শেষে ঘরে ফিরে খেতে চাইছে।
রূপসীর কোথাও যাবার জায়গা ছিলনা। মারধোর খাবার পর সে ঘরেই বসে থাকত। তারপর দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়িয়ে সেও সবকিছু ভুলে গিয়ে বসিরের ফেরার প্রতীক্ষায় বসে থাকত। তার কেবলই মনে হত, “কোথায় গেল লোকটা। রাগ করে কিছু করে বসলতো!”
সফর আলি একদিন দুজনকে বুঝিয়ে ডাক্তার দেখাতে পাঠিয়েছিল। বহরমপুর শহরে। সয়াফর আলিই ঠিক করে দিয়েছিল ডাক্তার। ডাক্তার দেখিয়েও এসেছিল দুজনে। তারপরও একই সমস্যা থেকে গিয়েছিল।
এ নিয়ে রূপসীকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, “ডাক্তারে বলেছে আমার কোনও দোষ নাই। যত দোষ বসিরের।” বসিরকে জিজ্ঞাসা করলে বলে, “ডাক্তার কি করে বলবে কার দোষ সফর ভাই। একি হাতের জিনিস। হাতে লিয়্যা বলবে এই দ্যাখ কার দোষ। পুরুষের আবার দোষ হয় নাকি? ও মাগীকে বিহ্যা কর্যা আমার জীবনটাই নষ্ট হয়্যা গ্যাল।”
“তাও তো ডাক্তারে কিছু একটা বলেছে বসির ভাই।” ছাড়তে চাইনা সফর।
“ডাক্তারে আবার কী বুলবে? বুলছিল কী সব পরীক্ষা টরীক্ষা করবে। আমি ওসব কত্তে চাইনি। যত্ত সব টাকা লিবার ধান্দা।” বসিরের কথায় বিরক্তির ছাপ।
কয়েকটি ব্যাথার ট্যাবলেট রূপসীর হাতে দিয়ে সফর আলি বলল, “তোর ঘর ভাঙবেনারে রূপসী। আরও মজবুত হবে। দুদিনের ট্যাবলেট দিলাম। সকাল বিকেলে একটা করে খাবি। খাবার পর। আর পারলে ঠান্ডা জলে মাঝে মাঝে দু একবার স্যাক দিবি। ঠিক হয়ে যাবে।”
ট্যাবলেট হাতে নিয়ে রূপসী আর না দাঁড়িয়ে চলে গেল।
ঘড়ির দিকে তাকাল সফর আলি। সাড়ে আটটা পার হয়ে গেছে। ব্যাগে কিছু ওষুধ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে।
আনসার আলির বাড়িতে গিয়ে দেখল একটি টুলের উপর বসে মনের সুখে বিড়ি টানছে আনসার। সফর আলিকে দেখে উঠে বিড়ি টানা বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল সে।
বলল, “সফর ভাই তুমি য়্যাত তাড়াতাড়ি চল্যা আস্যাছ। চলো চলো। ভেতরে চলো।”
সফর আলি জানতে চাইল, “সব ঠিক আছে? আর কোনও অসুবিধা হয়নি তো?”
“না না। কুনু অসুবিধা হয়নি। শুধু ময়নার শরীলটা এখুনও ব্যাথা করছে।”
ঘরের ভেতর ঢুকল সফর আলি। বাচ্চার শরীর পরীক্ষা করে সফর আলি ময়নাকে বলল, “তোমার শরীর এখন ক্যামন আছে ভাবি? বাচ্চা কান্নাকাটি করছে?”
“বাচ্চা খুব কাঁদছে। আমার তলপেটে এখুনও ব্যথা করছে।” পাশে রাখা চাদর খানা বুকের উপর টেনে নিতে নিতে বলল ময়না।
“বাচ্চা কান্না করা খুব ভালো। ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি। আজ খাও। ব্যথা কমে যাবে। একটু সময় লাগবে।”
ময়নার জন্য কয়েকটি ওষুধ দিল সফর আলি। তারপর আনসারের সাথে দু একটা কথা বলে বেরিয়ে গেল।
ঘরে এসে স্নানঘরে ঢুকল সফর। স্নানঘর বলতে সেরকম কিছু নয়। টিউবওয়েলতলাকে বাঁশ আর পাটকাটির বেড়া দিয়ে ঘিরে একটা আলাদা ঘর বানানো হয়েছে।
স্নান সেরে সফর আলি খাবার ঘরে গেল। মা টিফিন বানিয়ে রেখেছিলেন। দুটো রুটি, আলুভাজা, একটা ডিম সেদ্ধ।
টিফিন খেতে খেতে সফর আলি মাকে বলল, “আজ কফি খেতে খুব ইচ্ছে করছে মা। কফি বানিয়ে দাও।”
মা কফি বানাতে বলল, “দিন রাত এত খাটাখাটি করছিস সফর। নিজের শরীলের দিকে নজর রাখিস।”
কফিতে চুমুক দিয়ে সফর আলি বলল, “শরীরের দিকে তাকানোর এখন সময় নেই মা। চারিদিকে মানুষের এত অসুখ বিসুখ। সরকারি চিকিৎসার ব্যবস্থা এখনও এই চরে হলনা। তুমি তো জান মা! আমি বসে থাকতে পারিনা। এই রাতে উঠে যদি না যেতাম, ময়না ভাবির নিশ্চিত মৃত্যু ঘটত।”
“তোর আব্বা ছিল তোর মতোন। পাড়ার কারও কোন বিপদে চুপ করে বসে থাকতে পারতনা। সারাদিন খাওয়া-দাওয়া কিছু নাই। শুধু পরের কাজ করে বেড়াচ্ছে।”
সফর আলির কফি শেষ হয়ে এসেছিল। কাছে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি তো জান মা। আমি তারই ছেলে। কী করে চুপ থাকতে পারি! চিন্তা করোনা মা। আমার কিছু হবেনা। যতদিন শরীর দিবে, আমি মানুষের সেবা করে যাব।”
কথা শেষ করে চেম্বারে গিয়ে বসল সফর আলি।
চেম্বার বলতে আলাদা কিছু নয়। বাইরের শোবার ঘরের সামনের দিকটিকে প্লাইউড দিয়ে আলাদা ঘর বানানো হয়েছে। ঘরের একধারে একটা টেবিল। পাশে একটা খোলা আলমারি। আলমারিতে সার সার ওষুধ সাজানো আছে। প্রথম দিকে ওষুধ খুব বেশি রাখত না সফর। চরের মানুষের হাতে টাকা থাকেনা। সবাই ধারেই ওষুধ নিয়ে যায় বেশি। মাসে ছমাসে ধান পাট বিক্রি করে টাকা দেয়। ভুলেও যায় কেউ কেউ। গরিবের গরিব সব মানুষ। খুব প্রয়োজনীয় দামী ওষুধ চেম্বারে রাখতে পারত না সফর আলি। তার ইচ্ছে করত চেম্বারটিকে আরও ভাল করে সাজাই। কিন্তু সাহস করতে পারেনা। এমন কিছু ওষুধ আছে চেম্বারে রাখতে গেলে ফ্রিজের দরকার। চরে ইলেকট্রিক আসেনি। ভবিষ্যতে আসবে বলেও মনে হয়না। সোলার ব্যবস্থা আছে বটে, তাতে ফ্রিজ চলেনা। কী করবে বুঝেও উঠতে পারে না সফর আলি। মাঝে মাঝে তার মনে হয়েছে এই চর ছেড়ে চলে যাবে সে। ওপারে গিয়ে অন্য কোনও গ্রামে ডাক্তারি করবে। কিন্তু, যেতে পারেনা। যতবার সে একথা ভেবেছে, ততবার সে তার এই বাড়ি, এই ঘর, এই চেম্বার, এই গ্রামকেই আঁকড়ে ধরেছে। চেম্বারে ওষুধ বাড়িয়েছে। নিতপ্রয়োজনীয় ওষুধের পাশাপাশি কিছু জীবনদায়ী ওষুধও এখন রাখছে সফর আলি। মাঝে মাঝে সে শহরে যায়। নিজের হাতে ওষুধ কিনে নিয়ে আসে।
পদ্মার ঘূর্ণির টান কোথায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল দুজনকে খবর পাওয়া যায়নি। বিশাল পদ্মা। তার ঘূর্ণির টানও বিশাল । পাক খেতে খেতে, ফুলে ফুলে, দুলে দুলে উঠছিল পদ্মার ঘোলা জল। সেই ঘোলাজলের ভেতর থেকে কে যেন ফোঁস ফোঁস করে গুমরে গুমরে উঠছিল, লক লক করে বের করছিল লম্বা কালো জিভ
সকালে যারা মাছ ধরতে গিয়েছিল, ফিরতে শুরু করেছে। ভুমরি জাল, ফাস জাল, পলুই ইত্যাদি সবার কাঁধে। মোটামুটি সবাই মাছ পেয়েছে। কেউ কম, কেউ বেশি। পুঁটি, দাঁড়ক্যা, কাকিল্যা, রুই, কাতলা, মাগুর, গড়াই, চ্যাং সব ধরণের মাছ। লাল্টুর কোমরে একটা বড় কাতলা গামছা দিয়ে বাঁধা। পরাণের হাতের ব্যাগে দুটো রুই। ওদের চোখে মুখে খুশির হাওয়া। পদ্মার কাতলা আর রুই মাছ। বৃষ্টির জলের স্বাদ নিতে উজানে উঠে এসেছিল। শহরে ভাল দাম পাওয়া যাবে। ঘরে গিয়ে সাইকেলে বেঁধে ওপারে আখরিগঞ্জের হাটে আড়তে বিক্রি করতে যাবে পরাণ। আড়তে পৌঁছনোর আগেই অনেকে বেশি দামে কিনে নিতে চায়। সেরকম কাউকে পেলে তাদের কাছেই বিক্রি করে দিবে মাছ।
দুপুর হতে চলল। চেম্বারে রোগী কেউ আসছে না। সফর আলি চেম্বার খোলা রেখেই পাড়া দর্শনে বের হল। কোথাকার কার ঘরের চালা উড়ে এসেছে রাস্তার উপর। রাস্তায় কাদাতে গড়াগড়ি খাচ্ছে কলার গাছ, সজনে গাছের ডাল। গ্রামে খুব বেশি মাটির বাড়ি নেই। প্রায় সবই পাটকাটির টাটির বাড়ি। প্রতি বছর বন্যা হয়। ঘরবাড়ি সব ভেঙে যায়। তাই কেউ মাটির দেয়াল আর তোলেনা। দুই একখানি যা মাটির বাড়ি ছিল, দেয়াল ধ্বসে পড়ে পুরো বাড়িটাই এখন রাস্তায়। বাড়ির কোনও পর্দা নেই, তাই আড়ালও নেই। দেখতে না চাইলেও বাইরে থেকে বাড়ির ভেতরের সবকিছু দেখা যাচ্ছে।
সফর আলি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল সামনের দিকে। দূর থেকে তাকিয়ে দেখল বসির মিঞা ঘরের উঠোনে বসে নতুন চালা বাঁধছে। পাশে একটা টুলে বসে আছে রূপসী।
সফর আলি দাঁড়িয়ে পড়ল। তার আর সামনে যাবার ইচ্ছে হলনা। চেম্বারে ফিরে এল সে। উঠোনে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে একমনে তাকিয়ে থাকল আশেপাশের ভাঙা গাছপালা, বাড়ি ঘরের দিকে। তার মনে আসতে শুরু করল কত সব কথা। কত কত সব ঘটনা।
•৪•
সফর আলির পিতা গফুর আলি ছিলেন বাবপুর গ্রামের বড় চাষী। বিঘে চল্লিশ মতো জমি ছিল তাঁর। দু জোড়া বলদ গোরু, এক জোড়া লাঙল, একজোড়া জোয়াল, একজোড়া মই, দুখানি গোরুর গাড়ি, দুটি গাই গোরু, তিনজন রাখাল আর প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাতজন মজুর। চাষী তো নয়, যেন কোনও এক কারখানার মালিক। ভোররাত থেকে কাজ শুরু হত। গোরু খাওয়ানো, লাঙল বাওয়া, চাষ করা, ফসল বোনা, জমি নিড়ানি দেওয়া, ফসল কাটা, গাড়ি নিয়ে মাঠে যাওয়া, খাবার নিয়ে যাওয়া, ফসল ঘরে তোলা – সব মিলিয়ে সারাদিন ধরে একটা মহাযজ্ঞ চলত। আর ছিল অতিথিদের নিত্য যাওয়া আসা। প্রায় প্রতিদিন গড়ে তিন –চারজন কুটম্ব অতিথির আসা যাওয়া লেগেই থাকত। সারাদিন হৈ হৈ রৈ রৈ ব্যাপার লেগে থাকত বাড়িতে। বাড়ির মেয়েরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্নার কাজেই ব্যস্ত থাকত তখন। কোনো কোনোদিন ঠিক সময়ে খেতেই পেত না তারা। কতজন মানুষের খাবার করতে হবে সে হিসেবই থাকত না অনেক সময়। কোনোদিন দেখা যেত ভাত রান্না করা হয়ে গেছে, এই সময় পাঁচজন অতিথি এসে হাজির। তাদের খেতে দিয়ে আবার নতুন করে ভাত রান্না করতে হত। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল।
তারপর একদিন দুকূল ছাপিয়ে পদ্মা হয়ে উঠল বিধ্বংসী, রাক্ষসী! তার স্থূল পেটে আশেপাশের সব জমি খেয়ে একরাতে বাড়ির দরজায় এসে হাজির হল সে।
সেদিনও সন্ধ্যার আগেই আকাশ নেমে এসেছিল মাটিতে। তাকিয়ে মনে হয়েছিল গোটা আকাশটা যেন একটা যুদ্ধক্ষেত্র। বিদ্যুতের তলোয়ার দিয়ে গোটা আকাশটাকে যেন কেউ ফলা ফলা করে চিরে দিচ্ছে। দূর থেকে হুড় হুড় করে পাড় ভাঙার শব্দ ভেসে আসছিল। বিদ্যুতের আলোয় দূরের বাড়িগুলোর আধ ভাঙা প্রান্তর ঝলসে ঝলসে উঠছিল সেদিন। প্রাণ বাঁচাতে, গবাদি পশু আর জিনিসপত্র নিয়ে চলে গিয়েছিল গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ। দু একজন থেকে গিয়েছিল ভিটে মাটি ভাঙার শেষ দৃশ্য দেখে যাওয়ার জন্য। সেইরাতে সফর আলিকে নিয়ে মা গিয়েছিল অন্য গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে। গাই দুটোকে আগেই বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। জলের দামে। বিক্রি করে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিলনা। বাড়িতে ছিল বাবা আর বড় ভাই জামসেদ। দুটো বলদ গোরুও ছিল। সে রাতে বিশাল বড় ফাটল তৈরি করেছিল রাক্ষসী পদ্মা। ভেতরে ভেতরে বাড়ির নিচের মাটিকে কখন যে সে খেয়ে ফেলেছিল বোঝা যায়নি। বাড়িতে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল তখন। মাঝরাতে অতবড় বাড়িটা হুড়মুড়িয়ে ঢুঁকে পড়েছিল পদ্মার পেটে। ঘূর্ণির পাকে তলিয়র গিয়েছিল বড় ভাই জামসেদ, পিতা গফুর আলি। পদ্মার ঘূর্ণির টান কোথায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল দুজনকে আজও খবর পাওয়া যায়নি। বিশাল পদ্মা। তার ঘূর্ণির টানও বিশাল গভীর। পাক খেতে খেতে, ফুলে ফুলে, দুলে দুলে উঠছিল পদ্মার ঘোলা জল। সেই ঘোলাজলের ভেতর থেকে কে যেন ফোঁস ফোঁস করে গুমরে গুমরে উঠছিল, লক লক করে বের করছিল লম্বা কালো জিভ। সেই জিভে সমুদ্রের নোনা জলের ঘ্রাণ। গোটা মাঠ, ঘাট আর গ্রামকে খেয়ে সে যেন সমুদ্র বানাতে চায়। লোকে বলত, সেই রাতে পদ্মা নিজে নেমে এসেছিল তার সর্বনাশী সর্বগ্রাসী রুপ নিয়ে। কী ভয়ংকর সেই রূপ। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বিশাল বড় কালীমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকে সবকিছু দুমড়ে, মুচড়ে আর খেয়ে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল সে। সেই রাতে একসাথে পাশের দুটি গ্রামও সবকিছু ধুয়ে মুছে চলে গিয়েছিল পদ্মার পেটে। পদ্মার পেট কতবড় হতে পারে! লোকে বলে তার কোনও সীমা নেই। দৈর্ঘ্য নেই, প্রস্থ নেই, উচ্চতাও নেই। কোনও মাপেই তাকে ধরা যায়না। গ্রামের পর গ্রাম, ঘরের পর ঘর, হাজার হাজার বিঘে জমি, তার ফসল, গবাদি পশু, গাছপালা অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে তার পেটে। অত্যন্ত অবহেলার সাথে সবকিছুকে হজম করে নেয় পদ্মা। কোনোকিছুতেই তার পেট ভরেনা। সে আরও খেতে চায়। আরও কিছু।
গোটা গোটা দশ বারোটি গ্রামকে পেটে পুরে নিয়েও পদ্মা গর্জন করতে থাকল। ভিটেমাটি আর স্বজন হারানো মানুষ গোরুর গাড়ি চেপে, কেউ বা পায়ে হেঁটে, দূরে-অনেক দূরে, পাকা রাস্তার ধারে, রেল লাইনের আশেপাশে, কলোনি করে থাকতে শুরু করল। এককালের গৃহস্থ মালিক, যার বাড়িতে দিনে পনের কুড়িজন শ্রমিক কাজ করত – সে হয়ে পড়ল সর্বহারা, ভিখিরি। কোনোমতে চেয়েচিন্তে জীবন চালাতে শুরু করল তারা।
সে সব প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। তবু সফরের মনে হয়, এই তো সেদিন। এই তো সেদিন পিতার হাত ধরে হেঁটে হেঁটে মাঠে যেত সে। মাঠে মাঠে চাষীরা লাঙল বাইত। বেশির ভাগ চাষীর ছিল নিজের গোরু। নিজের লাঙল। নিজের গাড়ি। ভোররাতে তারা লাঙল নিয়ে যেত মাঠে। দশ কাঠা, পনের কাঠা জমি চাষ করে মাঠের কিছু ফসল কেটে গাড়ি ভর্তি করে বাড়ির দিকে রওনা দিত। বাড়ির ছোট ছেলেরা খাবার নিয়ে যেত মাঠে। বাড়ির মেয়েরাও যেত। খাবার দিয়ে ঘরে ফেরার পথে অল্প অল্প ঘাস বোঝার মতো করে মাথায় নিয়ে ঘরে ফিরত তারা। সফর আলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পায় এখনও।
তারপর রাক্ষুসী পদ্মা ধীরে ধীরে একদিন শান্ত হল। স্থির হল। এখন যেন সে শিশু। কিছুই জানেনা, কিছুই বোঝেনা। শান্ত স্থির তার জল। হালকা মৃদুমন্দ হাওয়ায় ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ ওঠে জলে। সেই ঢেইয়ের মাথায় চুমো খায় মৃদুল হাওয়া। সেই হাওয়ায় প্রাণ জুড়োয়, কিন্তু মন জুড়োয়না। পদ্মার পেটের জল সরে গিয়ে তার বুকের জন্ম নিল ছোট্ট চড়া। সেই চড়া ধীরে ধীরে বড় হয়ে জন্ম নিল চর। সেই চরে আবার ধীরে ধীরে এসে ঠাঁই নিতে থাকল ভিটে হারানও সব মানুষ। তবে সবাই এলনা। যারা ভিটে মাটি বিক্রি করে দিয়ে চলে গিয়েছিল, যারা বাইরে শহরের কাছে বা রেল ষ্টেশনের পাশে বাড়ি করে নিয়েছিল, তারা আর এলনা। সফর আলি মাঝে মাঝে চড়ায় ঘুরতে আসত পিতার স্মৃতিকে ছুঁয়ে দেখতে, তাদের হারিয়ে যাওয়া জমিগুলির দেখা পেতে। জেগে ওঠা চরে ঘুরতে এসে জড়ের স্পর্শ পেত সে। তারপর একদিন মাকে নিয়ে এসে এই শুকিয়ে যাওয়া চড়ার উঁচু যায়গায় পাটকাটির টাটি দিয়ে দু খানা ঘর তুলল সফর আলি। কিন্তু পদ্মা সব জমি ফেরত দিলনা। সব জমি এখনও পদ্মার পেটে জমা হয়ে আছে। কবে যে পদ্মা উগরে ফেরত দিবে কে জানে!
ভাবতে ভাবতে কখন দুপুর গড়িয়ে গেছে সফর আলি বুঝতে পারল না। ঘোর ভাঙল মায়ের ডাকে, “ভাত খাবিনা সফর?”
সফর আলি ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘড়ির কাঁটা দুটোর ঘর অতিক্রম করেছে। চোখে মুখে জল দিয়ে মায়ের পাশে খেতে বসল সফর আলি।
ক্রমশ…
আরো পড়ুন : চর (প্রথম পর্ব)
❤ Support Us








