Advertisement
  • খাস-কলম
  • জুলাই ৩, ২০২৫

বঙ্গেই দেশের প্রথম বেসরকারি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়। স্বপ্ন ছুঁয়ে বাড়ছে প্রত্যাশা

আজমল হুসেন
বঙ্গেই দেশের প্রথম বেসরকারি ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়। স্বপ্ন ছুঁয়ে বাড়ছে প্রত্যাশা

নেলসন ম্যান্ডেলার একটি সুপরিচিত, সুললিত উক্তির তরজমা দিয়ে লেখাটা শুরু করছি; ‘খেলাধুলার মধ্যে বিশ্বকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। এর মধ্যে অনুপ্রেরণা জোগানোর ক্ষমতা আছে। এর মধ্যে এমনভাবে মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতা আছে যা অন্য কোনো কিছুর পক্ষেই সম্ভব নয়।’ সব খেলাকে বিশ্বজনীন করতে হলে অন্য যে কোনো বিষয়ের মতো ক্রীড়া ক্ষেত্রেও প্রকৃত শিক্ষা অর্জন জরুরি। এর জন্য দরকার নির্দিষ্ট কাঠামো এবং শিক্ষাদানের অন্যান্য সব রসদ। আর সে উদ্দেশ্যেই জাতীয় স্তরে তথা বিভিন্ন রাজ্যে ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এক্ষেত্রে বঙ্গের সরকারি ও বেসরকারি ভাবনা-চিন্তা দেশকে আশা করি পথ দেখাবে।

সম্প্রতি রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় দ্য নেতাজি সুভাষ ইউনিভার্সিটি অব স্পোর্টস অ্যান্ড অন্ত্রপ্রনরশিপ বিল–২০২৫। চুঁচুড়া নেতাজি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উদ্যোগে এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাথমিকভাবে হুগলি জেলায় তৈরি হবে। পরে আরও অন্য শহরেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, জানিয়েছেন মূল উদ্যোক্তা এস.এন.ইউ-এর আচার্য সত্যম রায় চৌধুরী।

আমার কাছে এ এক অনন্য নস্টালজিয়া ! আমার গবেষণা জীবনের  শুরু স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজিতে। স্পোর্টিস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার অধীনস্থ পাতিয়ালার নেতাজি সুভাষ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব স্পোর্টস-এর কাছে এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। তিন দশক আগে যখন সুযোগটা আসে, এই ব্যাপারটা আমার কাছে যেমন গর্বের, তেমনই ছিল আক্ষেপের। গর্ব এজন্যে কারণ আমার জন্মাঞ্চল অসম তথা গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে প্রথম এ বিষয়ে গবেষণা করার সুযোগ পাই। কিন্তু আক্ষেপ এটা ভেবে, যে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্য কোথাও এ বিষয়ে গবেষণার পরিকাঠামো তখন ছিল না। বহুকাল জুড়ে বাংলা বহু স্বনামধন্য নৃ-তত্ত্ববিদের জন্ম দিয়েছে, দেখছে তাঁদের বিশ্বজয়ের মহিমা। অনেক নামী খেলোয়াড়কেও আমরা পেয়েছি দেশের এই অংশ থেকে, কিন্তু স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজি বিষয়টাকে তেমন করে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

পাতিয়ালায় কাজ করার সময় উপলব্ধি করেছি, জাতীয় স্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে যখনই ট্যালেন্ট সার্চ হয়েছে, দেশের এই অংশটা বরাবর উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ সম্ভাবনার দিক থেকে দেশের এ অংশ কোনোভাবেই পিছিয়ে ছিল না। এতে যে শুধু আমরাই বঞ্চিত হয়েছি বা আমাদের ছেলেমেয়েরাই বঞ্চিত হয়েছে, তা নয় ! ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সারা দেশ। আরো বহু খেলোয়াড় হয়তো বিভিন্ন ক্রীড়া ক্ষেত্রে দেশের নাম গৌরবোজ্জ্বল করার সুযোগ পেতেন। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে ট্যালেন্ট সার্চ ব্যাপারটাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখলে হয়তো আমরা আরো বহু প্রতিভার সন্ধান পেতাম। ঠিক এখানেই স্পোর্টস অ্যানথ্রপলজির মতো বিষয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। নৃ-তত্ত্বের ছাত্র হিসেবে ব্যাপারটা বারবার আমাকে ভাবিয়েছে। আর এই বিষয় নিয়ে প্রায় সর্বস্তরের উদাসীনতা আমাকে বরাবর হতাশ করেছে।

বেসরকারি ক্ষেত্রে এটাই দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়। এই উদ্যোগ এক নতুন দিগন্তের দিশারী। যেহেতু ক্রীড়ার সঙ্গে অন্ত্রপ্রনরশিপও জুড়ে এই উদ্যোগ এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে। এতে দুটো বিষয় পরস্পরকে সমৃদ্ধ করবে । দৃঢ় বিশ্বাস, সময়ান্তরে স্পোর্টস বায়োমেকানিক্স, স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজি এবং অন্যান্য সমকালীন প্রাসঙ্গিক বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হবে এখানে। 

যাই হোক, পরে সরকারি উদ্যোগে অসমে শ্রী শ্রী অনিরুদ্ধদেব স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি এবং মণিপুরে ন্যাশনাল স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি স্থাপিত হয়েছে। এবার পশ্চিমবঙ্গেও একটা ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় শুরু হচ্ছে, যা সবার জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর। আমার কর্মজীবনের সিংহভাগ কেটেছে পশ্চিমবঙ্গে, আমি এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা, কাজকর্ম আর গবেষণার বিষয় নৃ-তত্ত্ব, যার সঙ্গে ক্রীড়াও জড়িয়ে আছে। এ কারণেই বাংলার চুঁচুড়ায় নির্মীয়মান ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে আলোড়িত করেছে।

ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠকরা বলেছেন, বেসরকারি ক্ষেত্রে এটাই দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়। আমার বিশ্বাস, এই উদ্যোগ এক নতুন দিগন্তের দিশারী। যেহেতু ক্রীড়ার সঙ্গে অন্ত্রপ্রনরশিপও জুড়ে দেওয়া হয়েছে, সে কারণেই এই উদ্যোগ এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে, তা এখনই বলে দেওয়া সম্ভব। ক্রীড়ার সঙ্গে অন্ত্রপ্রনরশিপ জুড়ে দেওয়াটা এমনিতেই এক অভিনব পরিকল্পনার রূপান্তর। এতে দুটো বিষয় পরস্পরকে সমৃদ্ধ করবে। এই ভাবনা দেশের অন্য ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

কর্তৃপক্ষ বলেছেন, কেবল শারীরশিক্ষা বা নিছক স্পোর্টস কোচিং নয়, কেবল শারীরশিক্ষায় বিপিএড, এমপিএড কিংবা গবেষণা নয়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়া বিজ্ঞান, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, ক্রীড়া প্রযুক্তি, ক্রীড়া আইন-সহ বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হবে। এসব ছাড়াও স্পোর্টস টেকনোলজি, এআই/এমএল, বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বি.টেক, স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট-এ বিবিএ/এমবিএ, স্পোর্টস পারফরম্যান্স অ্যানালিটিক্স, ডেটা সায়েন্স, অ্যানিমেশন এবং গ্রাফিক্স-এ বি.এসসি, আইন (বিএ এলএলবি, বিবিএ এলএলবি) এবং মিডিয়া (ক্রীড়া সাংবাদিকতা, গণযোগাযোগ), মেডিক্যাল এবং পারামেডিক্যাল ইন স্পোর্টস, ডি ফার্মা, বি ফার্মা, এম ফার্মা, মিডিয়া অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্স ইন স্পোর্টস বিষয়ে পড়ুয়াদের শিক্ষাদান করা হবে।

নতুন এই বিশ্ববিদ্যালয় যে পঠনপাঠনের পাশাপাশি পেশাদার ক্রীড়াবিদ এবং স্পোর্টস টেকনিক্যাল এক্সপার্ট তৈরি করবে, এই প্রত্যাশাও অমূলক নয়। কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, ক্রীড়া বিষয়ে পড়াশোনা ছাড়া পেশাদার ক্রীড়াবিদের মানসিকতা গঠন এবং একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের হাত ধরেই শুরু হবে। এতে রাজ্যের ক্রীড়া জগতে খুলে যাবে নতুন সম্ভাবনার প্রাঙ্গন।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সময়ান্তরে স্পোর্টস বায়োমেকানিক্স, স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজি এবং অন্যান্য সমকালীন প্রাসঙ্গিক বিষয়কেও গুরুত্ব দেওয়া হবে এখানে। সবকিছু মিলে স্পোর্টস কাউন্সেলিং ব্যাপারটাকে পূর্ব ভারতে পাকাপোক্ত করে তুলতে পারে এই উদ্যোগ। বিশেষ করে স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজির মতো বিষয় প্রান্তিক জনগোষ্ঠির আরো গভীরে প্রবেশ করে প্রতিভার সন্ধান করতে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারে। স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজিতে ক্রীড়া সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যয়ন করা হয়। স্পোর্টস অ্যানথ্রোপলজির অন্তর্গত বেশ কিছু আনুসঙ্গিক বিষয় যেমন স্পোর্টস এথনোগ্রাফি, স্পোর্টস ডেমোগ্রাফী, স্পোর্টস নিউট্রিশন ইত্যাদি সার্বিকভাবে ক্রীড়া বিষয়ক শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করে।

প্রসঙ্গত, মূল স্রোতের বাইরেও অন্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বহু ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া রয়েছে। এসব আমাদের পরম্পরার অংশ, সংস্কৃতির ধারক-বাহক। এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা একান্ত জরুরি। কিন্তু বাঁচিয়ে রাখব বললেই তো আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আমাদের সংস্কৃতির এমন অমূল্য উপাদানগুলোর অনেকটাই এখন বিলুপ্তির সুম্মুখীন। বাঁচানো তখনই সম্ভব হবে, যখন সার্বিক প্রচেষ্টায় এগুলোকে পেশাদারী রূপ দিয়ে ক্রীড়া ক্ষেত্রের মূল স্রোতে নিয়ে আসা হবে। সদিচ্ছা থাকলে এ কাজ অবশ্যই সম্ভব। এই ব্যাপারে আমি অত্যন্ত আশাবাদী। এর প্রধান কারণ রাজ্যের নতুন ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা সত্যম রায়চৌধুরী একজন বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক কর্মী, দক্ষ শিক্ষা সংগঠক, যাঁর কৃতিত্ব সর্বজন বিদিত। অনেক শিক্ষাকর্মীর মতো তাঁর প্রতি আমারও আস্থা প্রগাঢ়।

তিনি এমনই একজন সংস্কৃতিমনস্ক মানুষ যাঁর কাজে প্রান্তজনের উত্থানের মতো ইতিবাচক ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়। বিশেষ করে তাঁর অলাভজনক উদ্যোগ — সত্যম রায়চৌধুরী ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বহু ইতিবাচক ভাবনারই রূপান্তর । বলা বাহুল্য, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমূহের মধ্যেও এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলা রয়েছে, যার সংরক্ষণ করা একান্ত প্রয়োজন। এসব খেলাকেও মূল স্রোতে নিয়ে আসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করি। এটাও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যে এরকম ভাবনা আমার একার নয়, আরো অনেকের। সরকারি, বেসরকারি কিংবা যৌথ উদ্যোগে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্মীয়মান ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতিতে এসব ভাবনা, এসব স্বপ্ন বাস্তবের মুখ দেখবে বলেই বিশ্বাস করি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!