Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ২০, ২০২৬

ডেঙ্গি টিকার অনুমোদন কেন্দ্রের ! ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সিদের জন্য প্রতিরোধের নতুন অস্ত্র

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ডেঙ্গি টিকার অনুমোদন কেন্দ্রের ! ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সিদের জন্য প্রতিরোধের নতুন অস্ত্র

ডেঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো ভারতে। বহু প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশের প্রথম ডেঙ্গি টিকার অনুমোদন দিল কেন্দ্রীয় সরকার। ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অব ইন্ডিয়া (ডিসিজিআই) জাপানের ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা টাকেডা বায়োফার্মাসিউটিক্যালস’-এর তৈরি কিউডেঙ্গা’ টিকাকে ছাড়পত্র দিয়েছে। এর ফলে এ প্রথম ভারতে ডেঙ্গি প্রতিরোধে কোনো অনুমোদিত টিকা সাধারণ মানুষের জন্য উপলব্ধ হওয়ার পথ খুলে গেল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতেপ্রতি বছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গির প্রকোপে নাজেহাল ভারতের মতো দেশে এ অনুমোদন একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশে কোভিড-১৯ প্রতিরোধের টিকা আগেই এসেছিল। কিন্তু এত দিন পর্যন্ত ডেঙ্গি রুখতে ভরসা ছিল মূলত মশা দমনপ্রজননস্থল ধ্বংসব্যক্তিগত সতর্কতাদ্রুত রোগ নির্ণয় এবং উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার উপর। সে তালিকায় এ বার যুক্ত হলো টিকাকরণও।

ভারত বিশ্বের অন্যতম ডেঙ্গি-আক্রান্ত দেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছেগোটা বিশ্বের মোট ডেঙ্গি সংক্রমণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ভারতে ঘটে। শুধু ২০২৫ সালেই সরকারি হিসাবে ১ লক্ষ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে গবেষকদের মতেপ্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানের তুলনায় বহু গুণ বেশি হতে পারে। তাঁদের অনুমানবছরে ভারতে কয়েক কোটি মানুষ ডেঙ্গি ভাইরাসে আক্রান্ত হনযদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রই নথিভুক্ত হয় না। ডেঙ্গিতে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যাও বিতর্কের বিষয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী২০২৩ সালে ডেঙ্গিতে ৪৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। যদিও বেসরকারি কিছু গবেষণা সংস্থার দাবিপ্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি হতে পারে। সংখ্যার তারতম্য থাকলেও ডেঙ্গি যে প্রাণঘাতী রোগসে বিষয়ে চিকিৎসক মহলে কোনো দ্বিমত নেই। বিশেষ করে দ্বিতীয় সংক্রমণে গুরুতর ডেঙ্গিশক সিনড্রোম কিংবা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সে কারণেই কিউডেঙ্গার অনুমোদনকে দেশের জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি বলে মনে করা হচ্ছে।

কিউডেঙ্গা একটি লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড টেট্রাভ্যালেন্ট ভ্যাকসিন। অর্থাৎডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ— ডিইএনভি-১ডিইএনভি-২ডিইএনভি-৩ এবং ডিইএনভি-৪সব কটির বিরুদ্ধেই শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করার জন্য এটি তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গির চারটি পৃথক  ভাইরাসই দেশে একসঙ্গে সংক্রমণ ছড়ায়। তাই চারটি সেরোটাইপ’-এ বিরুদ্ধেই সুরক্ষা দিতে সক্ষম হওয়াকে এ টিকার সবচেয়ে বড়ো বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলআগে ডেঙ্গি হয়েছিল কি নাতা জানার জন্য টিকা নেওয়ার আগে কোনো রক্ত পরীক্ষা করাতে হবে না। এ দিক থেকে এটি আগের ডেঙ্গি টিকা ডেংভ্যাক্সিয়ার তুলনায় অনেক বেশি সুবিধাজনক। ডেংভ্যাক্সিয়া শুধুমাত্র আগে ডেঙ্গি হয়েছিল এমন ব্যক্তিদের জন্য সুপারিশ করা হতো। কিন্তু কিউডেঙ্গা সে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠেছে। ডিসিজিআইয়ের অনুমোদন অনুযায়ী৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি যে কোনো ব্যক্তি এই টিকা নিতে পারবেন। সাবকিউটেনিয়াস ইনজেকশন’ অর্থাৎ ত্বকের নীচে ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হবে এই টিকা। সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য মোট দুটি ডোজ নিতে হবে। প্রতিটি ডোজের পরিমাণ ০.৫ মিলিলিটার। প্রথম ডোজ নেওয়ার ঠিক তিন মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ নিতে হবে।

কিউডেঙ্গার কার্যকারিতা যাচাই করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালিয়েছে টাকেডা। সংস্থার গ্লোবাল ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ফেজ-১ফেজ-২ এবং ফেজ-৩ মিলিয়ে ১৯টি গবেষণায় ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ অংশ নেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল টিডেস নামে ফেজ-৩ গবেষণাযেখানে আটটি ডেঙ্গি-প্রবণ দেশের ২০ হাজারেরও বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়। দ্বিতীয় ডোজের এক বছর পরে গবেষণায় দেখা যায়পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া ডেঙ্গি সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকার কার্যকারিতা ৮০.২ শতাংশ। ১৮ মাস পরে ডেঙ্গিজনিত হাসপাতালে ভর্তি রুখতে কার্যকারিতা ছিল ৯০.৪ শতাংশ। সাড়ে চার বছরের ফলো-আপে হাসপাতালে ভর্তি প্রতিরোধে কার্যকারিতা ৮৪.১ শতাংশ বলে উঠে আসে। সাত বছর পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যেও টিকার নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা বজায় থাকার প্রমাণ মিলেছে। ভারতে পৃথক ‘ডেন-৩০২’ নামে ফেজ-৩ ট্রায়ালেও ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সি ভারতীয়দের উপর টিকাটির নিরাপত্তা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। সেখানে শিশুকিশোর এবং প্রাপ্তবয়স্ক— তিন ক্ষেত্রেই টিকাটি নিরাপদসহনীয় এবং কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ভারতের আগে এশিয়ালাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপ মিলিয়ে ৪২টিরও বেশি দেশে কিউডেঙ্গা অনুমোদন পেয়েছে। ব্রাজিলে জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির আওতায় এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। আর্জেন্টিনাতেও সরকারি টিকাকরণ প্রকল্পে কিউডেঙ্গা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালে বাজারে আসার পর বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ইতিমধ্যেই কিউডেঙ্গার ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। বিশেষ করে যেসব দেশে ডেঙ্গির প্রকোপ অত্যন্ত বেশি অথবা মহামারির আকারে সংক্রমণ ছড়ায়সেখানে বৃহত্তর ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হিসেবে এই টিকা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে হু। একই সঙ্গে গুণমাননিরাপত্তা এবং কার্যকারিতার নিরিখে হু-র প্রি-কোয়ালিফিকেশন’-ও পেয়েছে কিউডেঙ্গা। এর ফলে ইউনিসেফ-সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও এ টিকা সংগ্রহ ও বিতরণ করতে পারবে।

ভারতে টিকাটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ২০১৯ সালের নিউ ড্রাগস অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালস বিধি’ অনুসারে। সে আইনের আওতায় দেশের ওষুধ অনুমোদনের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ডিসিজিআই প্রয়োজনীয় তথ্যআন্তর্জাতিক গবেষণা এবং ভারতীয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে’-এর ফলাফল খতিয়ে দেখেই ছাড়পত্র দিয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘কিউডেঙ্গা ডেঙ্গিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পারবে না। কারণচারটি ভাইরাস সেরোটাইপ’, দ্রুত পরিবর্তিত জলবায়ুনগরায়ণ এবং মশার বিস্তার— এসব কারণ এখনো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পথে বড়ো চ্যালেঞ্জ। তাই টিকার পাশাপাশি মশা দমনজমে থাকা জল পরিষ্কার রাখাজনসচেতনতা বৃদ্ধিদ্রুত রোগ নির্ণয় এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাসব কিছুকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তবুও দেশের প্রথম ডেঙ্গি টিকার অনুমোদনকে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক ঐতিহাসিক মাইলফলক বলেই মনে করছেন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এক বড়ো অংশ।


  • Tags:
❤ Support Us
Advertisement
error: Content is protected !!