- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ১০, ২০২৫
৩১৫ কোটির সাইবার জালিয়াতিতে পবন যোগ ! দায়ের এফআইআর, মিলল অবৈধ টাকার হদিস
ডানলপ ও জেসপ–এর প্রাক্তন কর্ণধার, কলকাতার সুপরিচিত শিল্পপতি পবন কুমার রুইয়া ফের বিতর্কে। এবারে অভিযোগ আরো ভয়ঙ্কর। রাজ্য পুলিশের সাইবার অপরাধ দমন শাখা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ৩১৫ কোটি টাকার সাইবার জালিয়াতির অর্থ পাচারের অভিযোগে এফআইআর দায়ের করেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত একাধিক অনলাইন প্রতারণা মামলার টাকাগুলি রুইয়া পরিবারের মালিকানাধীন শেল কোম্পানিগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা হচ্ছিল। অভিযোগ, এই টাকাগুলি ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে ঘুরে ঘুরে ঢুকেছে পবন রুইয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টাল-এর তথ্যানুসারে, ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রুইয়া পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ১৩৭৯টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এক শতাধিক অভিযোগ এসেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকেই। রাজ্যের উচ্চপদস্থ এক পুলিশ আধিকারিক জানান, ‘তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল অ্যারেস্ট বা বিনিয়োগে মোটা লাভের প্রতিশ্রুতির মতো নানা কৌশলে মানুষকে প্রতারিত করে ওই অর্থ হাতানো হয়েছে।’ পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, এক প্রতারণা মামলার টাকা প্রথমে জমা হয় হুগলি মেশিনারিজ প্রাইভেট লিমিটেড-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। সেখান থেকে তা দু-দফায় একই কোম্পানির অন্য অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তরিত হয়। ওই সংস্থার প্যান নম্বর খতিয়ে দেখে পুলিশ জানতে পারে, ওই অ্যাকাউন্টগুলির বিরুদ্ধে অন্তত ৫৪৪টি সাইবার জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে এবং লেনদেনের অঙ্ক প্রায় ৯৭ কোটি টাকা।
এরপর তদন্তে দেখা যায়, ওই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ১৬টি বেনিফিসিয়ারি ফার্ম, যেগুলির ১১ জন সাধারণ পরিচালক। সংস্থাগুলির মধ্যে রয়েছে— গেইন ই কমার্স, মেলরোজ ক্রিয়েশন, দাহিসার ট্রেডার্স এবং সেটল টেকনোলজিস। তদন্তে আরও জানা যায়, এই ১১ জন পরিচালক সারাদেশে মোট ১৮৬টি কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ১৪৭টি কোম্পানি নিবন্ধিত রেজিস্ট্রার অফ কোম্পানিজ, কলকাতা-তে। এর মধ্যে আবার ৭৩টি কোম্পানির অফিসের ঠিকানা এক— ৯, এজরা স্ট্রিট, কলকাতা–৭০০০০১। পুলিশি যাচাইয়ে দেখা গেছে, সেসব ঠিকানায় কোনো অফিসই বাস্তবে নেই। পুলিশের দাবি, এগুলি কাগজে-কলমে তৈরি ভুয়ো সংস্থা। মূল উদ্দেশ্যই ছিল প্রতারণার টাকা ঘুরিয়ে দেওয়া।
তদন্তে উঠে এসেছে, পবন কুমার রুইয়া, তাঁর স্ত্রী সরিতা রুইয়া, ছেলে রাঘব রুইয়া, মেয়ে পল্লবী রুইয়া ও সাক্ষী রুইয়ার নাম। এই ৫ জনের নামে থাকা একাধিক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অন্তত ২৩টি সাইবার প্রতারণা মামলার টাকা সরাসরি জমা পড়েছে বলে অভিযোগ। পুলিশ বলছে, ওই অ্যাকাউন্টগুলির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে। সে অর্থ কোথায় গিয়েছে, কারা এর সুবিধাভোগী, সেসব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত শুক্রবার রাজ্য পুলিশের একটি বিশেষ দল রুইয়ার আলিপুরের বাসভবনে তল্লাশি চালায়। তবে শিল্পপতির পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি। কিন্তু এ ঘটনার পর থেকেই শহরের শিল্পমহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোড়ন। কারণ, বাংলার শিল্প ইতিহাসে রুইয়া পরিবারের ভূমিকা এক সময় ছিল উল্লেখযোগ্য। বাম আমলে ডানলপ কারখানা রুইয়াদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। পরে কারখানার দরজা বন্ধ হয়, আর আজ তাদের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার সাইবার জালিয়াতির অভিযোগ— যা অনেককেই হতবাক করেছে। তবে এই প্রথম নয়, রুইয়া পরিবারের নাম আর আগেও আইনি বিতর্কে জড়িয়েছে। ২০১৬ সালে জেসপ কারখানা থেকে রেলওয়ে সরঞ্জাম চুরির মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন পবন রুইয়া। সে সময়ও তাঁর মালিকানাধীন জেসপ ও ডানলপ কারখানা নিয়ে রাজ্য সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছিল।
পুলিশের ধারণা, এই তদন্তের সূত্র ধরে দেশজুড়ে বিস্তৃত একটি বিশাল মানি লন্ডারিং র্যাকেটের হদিশ মিলতে পারে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সন্দেহজনক লেনদেনের নথি তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি, রাজ্য পুলিশ যোগাযোগ রাখছে দিল্লি, মুম্বই ও হায়দরাবাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলির সঙ্গে। এক তদন্তকারী আধিকারিক বলেন, ‘যেভাবে একের পর এক শেল কোম্পানির মাধ্যমে টাকা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনো স্বতন্ত্র প্রতারণা নয়— বরং একটি সুসংগঠিত আর্থিক অপরাধচক্র।’ তদন্তকারীদের হাতে আরো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এলে, আবার গ্রেফতার হবেন শিল্পপতি পবন কুমার রুইয়া!
❤ Support Us







