- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- মার্চ ১৭, ২০২৬
কাবুলের হাসপাতালে বিমান হামলা। পাকিস্তানকে দায়ী করল তালিবান সরকার, অস্বীকার ইসলামাবাদের
রমজানের শেষ পর্যায়ে বিভীষিকাময় রাতের সাক্ষী থাকল কাবুল। ধ্বংসস্তূপের মাঝে আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠল বাতাস। আফগানিস্তানের রাজধানীর একটি বৃহৎ পুনর্বাসন হাসপাতালের উপর বিমান হামলার অভিযোগ ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র আন্তর্জাতিক বিতর্ক। তালিবান প্রশাসনের দাবি, হামলায় ৪০০-রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, আহত অন্তত ২৫০। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তুলছে তালিবান সরকার। যদিও, ইসলামাবাদ সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে।
তালিবান সরকারের ডেপুটি মুখপাত্র হামদুল্লাহ ফিতরাত জানান, স্থানীয় সময় সোমবার রাত প্রায় ৯টা নাগাদ কাবুলের ‘অমিদ অ্যাডিকশন ট্রিটমেন্ট হাসপাতাল’-এ আকাশপথে হামলা চালানো হয়। প্রায় ২০০০ শয্যার এই বিশাল হাসপাতালটিতে মূলত মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছিল। রাতের অন্ধকারে আচমকা আছড়ে পড়া হামলায় মুহূর্তের মধ্যে হাসপাতালের বড়ো অংশ ভেঙে পড়ে। বিস্ফোরণের অভিঘাতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে গোটা চত্বরে। দ্রুতই আগুন গ্রাস করে ফেলে হাসপাতালের বিস্তীর্ণ এলাকা।
হামলার পরপরই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একাধিক ছবি ও ভিডিয়ো। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতাল কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে ভবনের অংশবিশেষ। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ভাঙাচোরা কংক্রিট, লোহার কাঠামো। ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই টর্চের ক্ষীণ আলোয় উদ্ধারকারীরা খুঁজে চলেছেন আটকে পড়া মানুষদের। কোথাও আহতদের আর্তনাদ, কোথাও নিথর দেহ। দমকলকর্মীরা প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার।
প্রথমে আফগানিস্তানের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের মুখপাত্র শারাফাত জামান জানিয়েছিলেন, এই হামলায় অন্তত ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পরে হামদুল্লা ফিতরাত জানান, মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ৪০০ ছাড়িয়েছে এবং অন্তত ২৫০ জন আহত হয়েছেন। তবে উদ্ধারকাজ এখনো শেষ হয়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও বহু মানুষ চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ভয়াবহ এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগেই আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে সংঘর্ষের খবর সামনে আসে। দুই দেশের মধ্যে গুলির লড়াইয়ে ৪ আফগান নাগরিকের মৃত্যু হয়। সে উত্তেজনার আবহেই কাবুলে এই হামলার অভিযোগ নতুন করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তালিবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদিন সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, আফগানিস্তানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেই ইসলামাবাদ এই হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি, নিহতদের অধিকাংশই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসামরিক মানুষ। এই হামলাকে তিনি ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ এবং ‘নীতিবিরুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবেই হাসপাতাল এবং অন্যান্য অসামরিক স্থাপনাকে নিশানা করছে। অন্যদিকে, কাবুলের সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে ইসলামাবাদ । পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ-এর মুখপাত্র মোশরেফা জাইদি জানিয়েছেন, আফগানিস্তানে থাকা জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটি লক্ষ্য করে সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, কোনো সাধারণ নাগরিক বা লোকালয়কে লক্ষ্য করে হামলা করা হয়নি। আফগানিস্তানের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘বিভ্রান্তিকর’ বলেই উল্লেখ করেছে ইসলামাবাদ।
এই ঘটনার জেরে কেবল রাজনৈতিক স্তরেই নয়, আবেগের বিস্ফোরণ ঘটেছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। বিশেষ করে রমজানের পবিত্র সময়ের মধ্যে এই হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। আফগানিস্তানের ক্রীড়াজগতও এই ঘটনায় সরব হয়েছে। রশিদ খান সমাজমাধ্যমে হামলার কিছু ছবি শেয়ার করে লেখেন, সাধারণ মানুষের বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালে হামলা— ইচ্ছাকৃত হোক বা অনিচ্ছাকৃত সবই অপরাধ। রমজানের মধ্যে এই ধরনের ঘটনা গভীর উদ্বেগজনক এবং তা হিংসা ও ঘৃণাকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির কাছে হস্তক্ষেপের আর্জি জানান।
আবেগঘন প্রতিক্রিয়া আসে আফগান অলরাউন্ডার মুহাম্মদ নবীর কাছ থেকেও। তিনি একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, কাবুলের হাসপাতালে যেন ‘আশার মৃত্যু’ ঘটেছে। চিকিৎসারত তরুণদের এইভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে, এটাই সবচেয়ে মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেন তিনি। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নবিন-উল হক। তাঁর বক্তব্য, পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের সঙ্গে ইজরায়েলের সামরিক অভিযানের কোনো তফাৎ নেই। তাঁর মতে, এ ধরনের হামলা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে এবং ভবিষ্যতে তার প্রভাব পড়তে পারে ক্রীড়াক্ষেত্রেও।
❤ Support Us







