Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মে ১১, ২০২৬

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের অভিঘাত ! ভোগ্যপণ্য ব্যবহারে সংযমের ডাক প্রধানমন্ত্রী মোদির। ‘সরকার চালাতে ব্যর্থ’ পাল্টা আক্রমণ রাহুলের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের অভিঘাত ! ভোগ্যপণ্য ব্যবহারে সংযমের ডাক প্রধানমন্ত্রী মোদির। ‘সরকার চালাতে ব্যর্থ’ পাল্টা আক্রমণ রাহুলের

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের অভিঘাত এবার সরাসরি ভারতীয় অর্থনীতি ও রাজনীতির কেন্দ্রে। আমদানিনির্ভর পণ্যের দামে চাপ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সরবরাহ শৃঙ্খলেও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জ্বালানিসোনাবিদেশভ্রমণ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্য ব্যবহার— একাধিক ক্ষেত্রে সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বক্তব্যদেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষা করতে হলে এখনই কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। আর সেই আহ্বান ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তরজা। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর অভিযোগঅভিযোগসাধারণ মানুষের উপর দায় চাপিয়ে সরকার নিজের ব্যর্থতা আড়াল করতে চাইছে। তাঁর দাবি, ‘সমঝোতাকারী প্রধানমন্ত্রী আর দেশ চালানোর যোগ্য নন।’

রবিবার তেলঙ্গানার সেকেন্দরাবাদে এক জনসভায় বক্তৃতা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেনগত কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর ধারাবাহিক চাপ তৈরি হয়েছে। প্রথমে অতিমারির সময়ে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। তার পর ইউক্রেন যুদ্ধ খাদ্যজ্বালানি এবং সারের বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করে। সে সঙ্কট কাটার আগেই পশ্চিম এশিয়ায় নতুন সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তিনি বলেন, ‘গত ২ মাস ধরে আমাদের কাছাকাছি অঞ্চলে এত বড়ো যুদ্ধ চলছে। তার প্রভাব গোটা বিশ্বের উপর পড়েছে। ভারতের উপর তার প্রভাব আরও গভীর। কারণআমাদের কাছে বৃহৎ তৈলকূপ নেই। পেট্রলডিজেগ্যাস— আমাদের প্রয়োজনের বেশিরভাগ অংশ বিদেশ থেকে আনতে হয়।’

প্রধানমন্ত্রী জানানযুদ্ধের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রলডিজেগ্যাস এবং রাসায়নিক সারের দাম বেড়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হলে সরকার যতই চেষ্টা করুকসমস্যা বেড়েই চলে। তাই তাঁর আহ্বানএ পরিস্থিতিকে শুধু সরকারের সঙ্কট হিসেবে না দেখে দেশবাসীকেও দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। দেশের জন্য মৃত্যুবরণই শুধু দেশভক্তি নয়দেশের জন্য বাঁচা এবং দেশের প্রতি কর্তব্য পালন করাটাও দেশভক্তি’ বলেন তিনি। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার রক্ষার প্রশ্নে। এক বছরের জন্য সোনা কেনা পিছিয়ে দেওয়াঅপ্রয়োজনীয় বিদেশভ্রমণ এড়িয়ে চলাপেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমানোমেট্রো ও গণপরিবহণে বেশি যাতায়াতকারপুলিংবৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার এবং বাড়ি থেকে কাজের অভ্যাস ফেরানোর কথা বলেছেন তিনি। কোভিড পর্বের অভিজ্ঞতার কথা টেনে মোদির মন্তব্য, ‘আমরা ওয়ার্ক ফ্রম হোমভার্চুয়াল মিটিংভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়েছিলাম। সময়ের দাবিসেই পদ্ধতিগুলি আবার শুরু করা।’ শুধু তা-ই নয়ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমানোরাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা হ্রাসপ্রাকৃতিক কৃষি এবং স্বদেশি পণ্যের প্রসারেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর যুক্তিএতে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবেতেমনই আত্মনির্ভরতার পথও প্রশস্ত হবে।

সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য বলছেএপ্রিলের শেষ সপ্তাহে১ মে পর্যন্তভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ৭৭৯ কোটি ৪০ লক্ষ মার্কিন ডলার কমেছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার নেমে এসেছে ৬৯,০৬৯ কোটি ৩০ লক্ষ মার্কিন ডলারে। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ২৪ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের একাংশ বলছেনপশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সোনা আমদানির খরচও। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে। এই আবহে আপাতত এক বছরের জন্য সোনা কেনা স্থগিত রাখার পরামর্শকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। ভারতে সোনার চাহিদা ঐতিহাসিক এবং সামাজিক— দুই অর্থেই প্রবল। বিয়েঅন্নপ্রাশনউৎসবপারিবারিক অনুষ্ঠানপ্রায় সব ক্ষেত্রেই সোনা কেনা এক স্বীকৃত সামাজিক অভ্যাস। প্রতি বছর ভারতীয়রা গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টন সোনা কেনেন। কিন্তু দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র এক থেকে দুটন। অর্থাৎমোট প্রয়োজনের প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এত বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি হলেও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব শিল্পোৎপাদনে পড়ে না। অর্থাৎএটি এমন এক আমদানিযা দেশের উৎপাদনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ শক্তি দেয় না। উল্টেবিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ তৈরি করে।

২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারত প্রায় ৭,২০০ কোটি ডলারের সোনা আমদানি করেছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই অঙ্ক ছিল ৫,৮০০ কোটি ডলারঅর্থাৎ প্রায় ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। এক বছরে সোনা আমদানির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৪ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের মোট আমদানির প্রায় ৯ শতাংশই সোনা। বিদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় অপরিশোধিত তেল। তার পরেই রয়েছে সোনা। এখন শুল্ক ও লেভি মিলিয়ে সোনা আমদানিতে ৬ শতাংশ কর ধার্য রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই দেশবাসীকে এক বছরের জন্য সোনা কেনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘এক সময়ে সঙ্কটময় পরিস্থিতি বা যুদ্ধের সময় মানুষ দেশহিতে সোনা দান করত। এখন দান করার দরকার নেই। কিন্তু আগামী এক বছর বাড়িতে যে অনুষ্ঠানই হোকআমরা সোনার গয়না কিনব না— দেশহিতে এই সঙ্কল্প করতে হবে। আমরা সোনা কিনব নাবৈদেশিক মুদ্রা বাঁচাব।’ নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতেবর্তমান পরিস্থিতিতে তুলনামূলক ভাবে কম প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমানো গেলে বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপও কিছুটা হালকা হবে।

তবে এখানে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিকও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানানোর আগেই দেশে সোনা আমদানির হার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমতে শুরু করেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ভারত প্রায় ১০০ টন সোনা আমদানি করেছিল। ফেব্রুয়ারিতে তা নেমে আসে ৬৫ থেকে ৬৬ টনে। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই ইরানআমেরিকা এবং ইজরায়েলকে ঘিরে সংঘাত তীব্র হতে শুরু করে। মার্চে সোনা আমদানি কমে দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ টনে। এপ্রিলে সেই অঙ্ক নেমে এসেছে মাত্র ১৫ টনে। অতিমারির সময় বাদ দিলে গত তিন দশকে ভারতের সোনা আমদানি এতটা কমেনি।

শুধু সোনা নয়জ্বালানি সাশ্রয়ের প্রশ্নেও দেশবাসীকে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যপেট্রল-ডিজেলের ব্যবহার সংযত করতে হবে। শহরে মেট্রো পরিষেবা থাকলে মেট্রোয় যাতায়াত বাড়াতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে কারপুল ব্যবহারেরও পরামর্শ দেন তিনি। পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও যতটা সম্ভব রেলপথ ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছেন। যাঁদের বৈদ্যুতিক গাড়ি রয়েছেতাঁদেরও সেই যানবাহন বেশি ব্যবহার করার অনুরোধ জানিয়েছেন। রান্নার গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সংযমী হওয়ার কথা বলেছে মোদি। তাঁর যুক্তিপেট্রলডিজেরান্নার গ্যাস— এসব কিছুর ক্ষেত্রেই আমদানিনির্ভরতা যত কমবেততই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ কমবে। ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও সংযমের ডাক দিয়েছেন মোদী। তিনি দেশবাসীকে অন্তত ১০ শতাংশ কম ভোজ্যতেল ব্যবহারের অনুরোধ জানান। তাঁর বক্তব্য, ‘ভোজ্যতেল আমদানিতেও আমাদের প্রচুর বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়। যদি প্রতিটি পরিবার একটু কম ব্যবহার করেতাতেও দেশসেবা হয়। দেশের স্বাস্থ্য ভাল হবেপরিবারের স্বাস্থ্যও ভাল থাকবে।’

কৃষিক্ষেত্রেও একই রকম সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতেএতে এক দিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবেঅন্য দিকে জমির উর্বরতাও রক্ষা পাবে। রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে ধরিত্রী মায়ের কষ্ট হচ্ছে। আমাদের খেত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজ খেত না বাঁচালে ভবিষ্যতে ফসলও বাঁচবে না।’ বলেন তিনি। প্রাকৃতিক কৃষিসৌরচালিত সেচপাম্প এবং বিকল্প কৃষিপদ্ধতির উপরও জোর দেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেনএক সময় ভারত থেকে তামা বিদেশে রফতানি হতো। কিন্তু এখন তামাও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দীর্ঘ দিন ধরে চলা ধর্মঘট-সংস্কৃতিকেই তিনি এর জন্য দায়ী করেন। শ্রমিক সংগঠনগুলিকেও এ বিষয়ে সতর্ক হওয়ার আবেদন জানান। দেশবাসীকে আগামী এক বছরের জন্য বিদেশভ্রমণও স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর কথায়, ‘আজকাল মধ্যবিত্তের মধ্যে বিদেশে গিয়ে বিয়ে করাবিদেশে ঘুরতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এখন অন্তত এক বছরের জন্য বিদেশে যাওয়ার ভাবনা সরিয়ে রাখতে হবে। ভারতে অনেক জায়গা আছে। সেখানেই ঘুরুন। বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচানোর যত উপায় আছেসব আমাদের করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। সোমবার সমাজমাধ্যমে রাহুল গান্ধী লেখেন, ‘গতকাল মোদীজি জনগণকে বললেনসোনা কিনবেন নাবিদেশে যাবেন নাকম পেট্রোল ব্যবহার করুনসার ও ভোজ্যতেলের ব্যবহার কমানমেট্রোয় যাতায়াত করুনবাড়ি থেকে কাজ করুন। এগুলি কোনো উপদেশ নয়, সরকারের ব্যর্থতার  জ্বলন্ত  প্রমাণ।’  রাহুলের অভিযোগবারো বছরের শাসনে দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেখানে মানুষকে বলে দিতে হচ্ছে কী কিনবেকোথায় যাবেকী ব্যবহার করবে। নিজের দায় এড়াতেই সাধারণ মানুষের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলেও তাঁর দাবি। কংগ্রেসের অভিযোগমার্কিন-ইরান সংঘাতের  মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কেন্দ্র ব্যর্থ। বৈশ্বিক সঙ্কটের মোকাবিলায় বিকল্প পরিকল্পনা না করে সাধারণ মানুষকে সংযমের উপদেশ দেওয়া লজ্জাজনক’, ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং অনৈতিক’ বলেও মন্তব্য করেছে কংগ্রেস

তবে, তীব্র বিতর্কের আবহে উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে কেন্দ্র। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহের নেতৃত্বে অনানুষ্ঠানিক মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠকে জ্বালানি সরবরাহশিপিং রুটমূল্যবৃদ্ধি এবং জরুরি পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সরকারি সূত্রের খবর কর্পোরেট জগতেও শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা। প্রযুক্তি ও পরিষেবা ক্ষেত্রের একাংশের মতেপ্রয়োজনে হাইব্রিড বা দূরবর্তী কাজের ব্যবস্থায় দ্রুত ফেরা সম্ভব। তবে উৎপাদনশিল্প ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের একাংশ মনে করছেসেখানে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। 


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!