Advertisement
  • মা | ঠে-ম | য় | দা | নে
  • জুলাই ২৯, ২০২৬

ব্রিটিশের বিরুদ্ধে খালি পায়ের অসম যুদ্ধ: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক শিল্ড জয়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ব্রিটিশের বিরুদ্ধে খালি পায়ের অসম যুদ্ধ: পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক শিল্ড জয়

সালটা ১৯১১। ২৯শে জুলাই। বর্ষাঘন কলকাতার ময়দানে রচিত হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। গোরা সাহেবদের অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে, বুট-পরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইষ্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে ২-১ গোলে পরাস্ত করে ‘আইএফএ শিল্ড’ ঘরে তুলেছিল বাঙালি তথা ভারতবাসীদের প্রিয় ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’। প্রথম ভারতীয় দল হিসাবে অনন্য বিজয় কেবল ফুটবলের আঙিনায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে পরাধীন ভারতের এক তীব্র চপেটাঘাত।

১৮৯৩ সালে চালু হওয়া ‘আইএফএ শিল্ড’ ছিল সে সময় ভারতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল প্রতিযোগিতাগুলির একটি। টুর্নামেন্টে দীর্ঘদিন ধরেই ব্রিটিশ সেনা ও ইউরোপীয় ক্লাবগুলির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ভারতীয় দলগুলি অংশ নিলেও বিজয় শিরোপা অধরাই থেকে গিয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে ১৯১১ সালে শিবদাস ভাদুড়ির নেতৃত্বে মোহনবাগানের অভিযাত্রা শুধু ফুটবল প্রতিযোগিতার গল্প ছিল না, বরং অসম লড়াইয়ে আত্মবিশ্বাসী ভারতীয়দের উত্থানের কাহিনি।

ফাইনালে ওঠার পথে মোহনবাগান একের পর এক শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে হারায়। প্রথম রাউন্ডে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজকে ৩-০, দ্বিতীয় রাউন্ডে ক্যালকাটা রেঞ্জার্সকে ২-১, তৃতীয় রাউন্ডে রাইফেল ব্রিগেডকে ১-০ গোলে পরাজিত করে তারা। সেমিফাইনালে প্রথম ম্যাচ ড্র হওয়ার পরে রিপ্লে ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে হারায় ফার্স্ট মিডলসেক্স রেজিমেন্টকে। ফাইনালের আগে পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় মোহনবাগান কার্যত দুর্ভেদ্য রক্ষণ গড়ে তুলেছিল। ২৯ জুলাই ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাব মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ঘিরে নজিরবিহীন উৎসাহ দেখা যায়। সমকালীন বিবরণ অনুযায়ী, প্রায় ৮০ হাজার দর্শক মাঠ ও তার আশপাশে ভিড় জমিয়েছিলেন। বাংলার বিভিন্ন জেলা তো বটেই, বিহার ও অসম থেকেও বহু মানুষ কলকাতায় এসেছিলেন ম্যাচ দেখতে। অতিরিক্ত যাত্রী সামলাতে বিশেষ ট্রেন ও স্টিমার চালানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছিল বলেও জানা যায়।

ম্যাচের শুরুতেই ধাক্কা খায় মোহনবাগান। একটি ফ্রি-কিক থেকে সার্জেন্ট জ্যাকসনের গোলে এগিয়ে যায় ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট। কিন্তু সে ব্যবধান বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ি দুরন্ত এক আক্রমণে সমতা ফেরান। এরপর, ম্যাচের যখন আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি, ঠিক তখনই ইতিহাস সৃষ্টির মুহূর্তটি আসে। শিবদাস ভাদুড়ীর নিখুঁত পাস থেকে বল পান অভিলাষ ঘোষ। চলন্ত বলেই এক বুলেট গতির শট, আর তাতেই কেল্লাফতে! দ্বিতীয় গোল করে মোহনবাগানকে জয়ের স্বর্গে পৌঁছে দেন অভিলাষ। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাস রচনা করে মোহনবাগান। গ্যালারিতে তখন উন্মাদনার সুনামি। বাঙালি দলের অধিকাংশ ফুটবলারই সেদিন খালি পায়ে খেলেছিলেন। কেবলমাত্র সুধীর চট্টোপাধ্যায় বুট পরে মাঠে নেমেছিলেন। পেশাদার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও বুট পরা ব্রিটিশ সেনা দলের বিরুদ্ধে খালি পায়ের বাঙালি ফুটবলারদের এ জয় ভারতীয় সমাজে গভীর আবেগের সঞ্চার করেছিল।

১৯১১ সালের সেই কিংবদন্তি দলের সদস্য ছিলেন হীরালাল মুখোপাধ্যায়, ভূতি শুকুল, সুধীর চট্টোপাধ্যায়, মনমোহন মুখোপাধ্যায়, রাজেন সেনগুপ্ত, নীলমাধব ভট্টাচার্য, কানু রায়, হাবুল সরকার, অভিলাষ ঘোষ, বিজয়দাস ভাদুড়ি এবং অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ি। ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে তাঁরা আজও ‘অমর একাদশ’ নামে স্মরণীয়। ক্রীড়াবিদদের মতে, এ জয়কে শুধুমাত্র ফুটবল ম্যাচের ফল হিসেবে দেখলে হবে না। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী স্বদেশি আন্দোলনের আবহে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের মানসিক জয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল মোহনবাগানের সাফল্য। রাস্তায় নেমে মানুষ উল্লাসে সামিল হয়েছিলেন, ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছিল কলকাতা। ফুটবল মাঠের বিজয় জাতীয় চেতনার সঙ্গে একাকার হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক শক্তিকেও নতুন মাত্রা দিয়েছিল বলে বহু গবেষক মনে করেন।

আজও ২৯ জুলাই ‘মোহনবাগান দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। প্রতি বছর এই দিনে ১৯১১ সালের  ঐতিহাসিক জয়ের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানায় সবুজ-মেরুন শিবির। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও খালি পায়ের এগারো বাঙালির সেই বিকেল ভারতীয় ফুটবলের গৌরবগাথা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আত্মবিশ্বাসের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক হয়ে রয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!