- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুলাই ১৬, ২০২৬
ইসরোয় মেধাপলায়ন ! গগনযান-চন্দ্রযান মিশনের শতাধিক বিজ্ঞানীদের পদত্যাগে উদ্বিগ্ন কেন্দ্র, প্রস্থান রুখতে কড়া হচ্ছে নিয়ম
ভারতের মহাকাশ অভিযানের ইতিহাসে একের পর এক সাফল্যের পালক জুড়েছে ‘ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন’ (ইসরো)। ‘চন্দ্রযান-৩’-এর চাঁদে অবতরণ, ‘আদিত্য এল১’-এর সূর্য অভিযাত্রা কিংবা মানব মহাকাশযাত্রা কর্মসূচি ‘গগনযান’— একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে যখন দেশ এগোচ্ছে, ঠিক সে সময়েই সংস্থার ভিতরে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। সাম্প্রতিক মাসগুলিতে শতাধিক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদের পদত্যাগ ও স্বেচ্ছাবসরের আবেদনে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মহাকাশ বিভাগের কপালে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গগনযান-সহ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের ইস্তফা বা আগাম অবসরের আবেদন আর ‘রুটিন’ প্রক্রিয়ায় মঞ্জুর না করার নির্দেশ জারি করেছে কেন্দ্র।
১৪ জুলাইয়ের এক অভ্যন্তরীণ নির্দেশিকায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে, গগনযান বা অন্য জাতীয় গুরুত্বের প্রকল্পে যুক্ত বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কর্মীদের পদত্যাগ কিংবা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলি আর সরাসরি অনুমোদন করতে পারবে না। প্রতিটি আবেদন পাঠাতে হবে দেশের মহাকাশ বিভাগের কাছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে দিল্লির শীর্ষ প্রশাসন। মহাকাশ বিভাগের বক্তব্য, সম্প্রতি ইসরোর বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্বেচ্ছাবসর ও পদত্যাগের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সরকারি ভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ না করা হলেও ‘ইসরো’ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত কয়েক মাসে ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী সংস্থা ছেড়েছেন বা ছাড়ার আবেদন জানিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে বেঙ্গালুরুর ‘ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার’ (ইউআরএসসি) এবং তিরুবনন্তপুরমের ‘বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার’ (ভিএসএসসি)-এ। প্রথম কেন্দ্র থেকে প্রায় ৮০ জন ও দ্বিতীয় কেন্দ্র থেকে অন্তত ২০ জন কর্মী ইসরো ছেড়েছেন বলে সূত্রের দাবি।
তালিকায় রয়েছেন সংস্থার কয়েক জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীও। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ‘এলভিএম-৩’ প্রকল্পের অধিকর্তা ভিক্টর জোসেফ। ‘এলভিএম-৩’-ই ভবিষ্যতের ‘গগনযান’ অভিযানের মূল উৎক্ষেপণযান। পাশাপাশি পদত্যাগ করেছেন ‘স্পেডএক্স’ (স্পেস ডকিং এক্সপেরিমেন্ট) প্রকল্পের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ‘চন্দ্রযান-৩’ অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া বিজ্ঞানী আদিত্য রাল্লাপল্লির নামও উঠে এসেছে। চন্দ্রযানের অবতরণ-পর্বের আগে এক লক্ষেরও বেশি ‘সিমুলেশন’-এর মাধ্যমে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে, যে দল মহাকাশযানের নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করেছিল, তার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। বিজ্ঞানীদের এ প্রস্থানকে নিছক কর্মী বদল হিসেবে দেখছেন না মহাকাশ বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের মতে, ‘ইসরো’র মতো সংস্থায় অভিজ্ঞতার মূল্য শুধুমাত্র পদ বা সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কোনো মহাকাশ প্রকল্পের নকশা, পরীক্ষা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও উৎক্ষেপণ-পরবর্তী মূল্যায়নের পিছনে থাকে বহু বছরের সঞ্চিত জ্ঞান। একজন বিজ্ঞানীর জায়গায় নতুন নিয়োগ করা সম্ভব হলেও সে অভিজ্ঞতা রাতারাতি তৈরি করা যায় না। ফলে প্রকৃত ক্ষতি হচ্ছে ‘ইনস্টিটিউশনাল নলেজ’-এর, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের।
ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন অবশ্য পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি উদ্বেগ দেখাতে নারাজ। তাঁর কথায়, ‘যে কোনো সংস্থাতেই কিছু মানুষ আসেন, কিছু মানুষ চলে যান। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। কেউ চলে গেলে অন্য কেউ দায়িত্ব নেবেন। আমরা বিষয়টি দেখছি।’ তবে তাঁর এ মন্তব্যের মধ্যেও স্পষ্ট যে, সংস্থার কাজ যাতে আচমকা ব্যাহত না হয়, সে কারণেই নতুন বিধিনিষেধ আনা হয়েছে। ‘ইসরো’র বিজ্ঞানীদের এই প্রস্থানকে অনেকেই ভারতের দ্রুত-বর্ধনশীল বেসরকারি মহাকাশ শিল্পের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন। ২০২০ সালে কেন্দ্র মহাকাশ ক্ষেত্র বেসরকারি উদ্যোগের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে, ২০২৩ সালে নতুন মহাকাশ নীতি ঘোষণা হয়েছে, দেশজুড়ে এর পর একের পর এক ‘মহাকাশ স্টার্ট-আপ’ গড়ে উঠেছে। বর্তমানে দেশে ৪০০-রও বেশি নিবন্ধিত মহাকাশ প্রযুক্তি সংস্থা রয়েছে। ‘পিক্সেল’, ‘ধ্রুব স্পেস’, ‘স্কাইরুট অ্যারোস্পেস’, ‘অগ্নিকুল কসমস’ এবং ‘বেলাট্রিক্স অ্যারোস্পেস’-এর মতো সংস্থাগুলি দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগও বাড়ছে। অনেক অভিজ্ঞ ‘ইসরো’ বিজ্ঞানী তুলনামূলক বেশি বেতন, গবেষণার স্বাধীনতা আর ‘স্টার্ট-আপ সংস্কৃতি’র আকর্ষণে বেসরকারি ক্ষেত্রে পা বাড়াচ্ছেন বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।
অবশ্য কর্মী-পদত্যাগ ‘ইসরো’র কাছে একেবারে নতুন ঘটনা নয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭০০ কর্মী সংস্থা ছেড়েছেন। আবার ২০০৪ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া নতুন কর্মীদের প্রায় অর্ধেকই পরে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা। কারণ, এবার সংস্থা ছাড়ছেন এমন সব বিজ্ঞানীরা, যাঁরা সরাসরি দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রযুক্তিগত ভাবে জটিল প্রকল্পগুলির সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি, এমন এক সময়ে এ সঙ্কট সামনে এসেছে, যখন ‘ইসরো’ গগনযান কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন গড়ে তোলা, ‘চন্দ্রযান-৪’-এর মাধ্যমে চাঁদ থেকে নমুনা সংগ্রহ, এমনকি ‘মঙ্গলযান-২’-এর মতো উচ্চাভিলাষী প্রকল্পও পরিকল্পনার স্তরে রয়েছে। ফলে শুধু নতুন প্রযুক্তি নয়, সে প্রযুক্তির নেপথ্যে থাকা মানবসম্পদ ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মহাকাশ বিভাগের সাম্প্রতিক নির্দেশ তাই শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ইসরোর ভিতরে ক্রমশ বাড়তে থাকা ‘মেধাপলায়ন’-এর বিরুদ্ধে এক ধরনের সতর্ক সংকেত বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। ভারতের মহাকাশ স্বপ্ন যত বৃহৎ হচ্ছে, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের কারিগরদের ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও ততটাই বড়ো হয়ে উঠছে।
❤ Support Us







