- গুচ্ছ কবিতা
- এপ্রিল ১৫, ২০২৫
গুচ্ছ কবিতা
চিত্রকর্ম: চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য
ঘাসেদের সবুজ বদনখানি লাল হয়ে যায়
‘ আমি ঘাসেদের ঈর্ষা করি আমি ঘাসেদের…’ – বলতে বলতে রক্তশয্যায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন কেরানিগঞ্জের জালালুদ্দিন রুমি। তাঁর রোরুদ্যমান স্ত্রীকে এক বিপ্লবী সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন: ‘আচ্ছা, উনি কি কবি ছিলেন ? ছিলেন মাদকাসক্ত ?’
সাত মাসের সন্তানটি জিয়ল মাছের মতো পেটে ঘাই মারে। সদ্যবিবাহিতা বাচ্চা মেয়েটি একবার থ্যাঁতলানো মানুষটিকে দেখে, আরেকবার তাকে ঘিরে থাকা উন্মত্ত পাগুলো দেখে । তার দুই চোখে মৃত ইলিশের মহাশূন্যতা।
ঘাসেরা কি ঘুমোচ্ছে এখন ? – ভোরের বাতাসে ভেসে আসা আজানের শব্দে সদ্য ঘুমভাঙা চোখে তারা একযোগে মাথা নাড়ে। স্বামীহারা সতীর মতো হতবিহ্বল মেয়েটি ঝাঁপ দেয় অজাতশত্রু ঘাসেদের চির হরিৎ বুকে।
তখনই তারা আসে। ঘাসেদের সবুজ বদনখানি লাল হয়ে যায়। সেই লালগালিচায় ঘুমিয়ে যেতে যেতে মেয়েটি বিড়বিড় করে, ‘কও তো তুমি ক্যান ঘাসেদের ঈর্ষা করো…ক্যান করো ?’

চিত্রকর্ম: জয়নুল আবেদিন । ১৯৭০
কিছু ছায়ামূর্তি জেগে থাকে
তুমি মাটিতে দেমাক করে পা ফেলো না। তুমি মাটিও ফাটাতে পারবে না ও পাহাড়ের সমান উঁচুও হতে পারবে না। [ সুরা বনি- ইসরাইল, রুকু: ৪, আয়াত: ৩৭ ]
মাটি ফুঁড়েই তারা আসে। কুণ্ডলীপাকানো আগ্রাসী শুঁড় বিপুল গর্জনে ধেয়ে যায় ধ্যানমগ্ন আকাশের দিকে।পদাঘাতে লণ্ডভণ্ড হয় নগর-জনপদ। প্রবীণেরা দিশেহারা, তারুণ্যের কৌতূহল অপার।
বিপন্ন পিতার গলা আঁকড়ে ধরে সদ্য কথা বলতে শেখা শিশুটি বিড়বিড় করে: ‘শুঁড় তো হাতির মতো, পা যে কেমন ? আর মুখ ? কোথায় তোমার মুখ ? বলো, কোথায় তোমার মুখ ?’ পশ্চিম প্রান্তর থেকে আসা তীব্র এক ধূলির বল্লম ঠগীদের মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় কণ্ঠনালি তার।
ধূলির পাহাড় সরে গেলে অদ্ভুত কিছু ছায়ামূর্তি জেগে থাকে আলেকজান্দ্রিয়ার বিরান সৈকতে। মুখ নেই। বুক নেই। রণপায়ে হাঁটে ! তবু, কী আশ্চর্য, তাদের পদভারে মাটি কাঁপে।

চিত্রকর্ম: ল্যানসেলট রিবেইরো
মাটি ক্যান্ এত কাঁপাকাঁপি করে ?
‘বৃক্ষ তোমার নাম কি ?’
– মেথুশেলাহ ।
‘বয়স ?’
– হবে প্রায় পাঁচ সহস্র বছর । সঙ্গী-সাথীরা সেই কবে হয়েছে উধাও। আমি একাই বেঁচেবর্তে আছি। বলো, ‘এ পরবাসে রবে কে হায় !’
মগডালে বসে লেজঝোলা পাখিটি সস্নেহে হাসে। বলে, ‘ঢের তো দেখা হলো দাদু পৃথিবীর রংঢং ! কও তো দেখি মাটি ক্যান্ এত কাঁপাকাঁপি করে ? সে কি দেখে নাই কিছু ?’
– তিনিই তো আমাদের মা। মহাসমুদ্রেরও তল আছে। মা তো অতল। সর্বংসহাও বটে। অবোধ সন্তানের বিচূর্ণ করোটিও সযত্নে আগলে রাখেন বুকে।

চিত্রকর্ম : নন্দলাল বসু
ভেঙে যায় নীলকণ্ঠের ধ্যান
পার্বতী আর্তনাদ করে । আতঙ্কে ওষ্ঠাগত নন্দিভৃঙ্গির প্রাণ । কৈলাস কেন কাঁপে ? কেন কাঁপে কৈলাস ? দেবালয়ও ঢেকে যায় ঘন উৎকণ্ঠার মেঘে ।
ভেঙে যায় নীলকণ্ঠের ধ্যান । মধ্যাহ্নের সূর্যের তেজে জ্বলে ওঠে রুদ্রের তৃতীয় নয়ন । ‘দশানন !’ মহাকাল আবার তলিয়ে যান আপন সমুদ্রে তাঁর । শুধু তাঁর পায়ের দুই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি জেগে থাকে ।
রুদ্ধশ্বাস কৈলাসের বুকের পাঁজর । স্বর্গ-মর্ত্য তোলপাড় করে দশানন রব করে দশ সহস্র বছর !
♦•♦–♦•♦♦•♦–♦•♦
❤ Support Us









